লালন সাঁইজি তাঁর জীবনভর গানের সুর দিয়ে যে কথাগুলো বলে গেছেন, তা কোনো অলৌকিক জগতের বার্তা নয়; বরং এই মাটির মানুষ আর তার ভেতরের অসীম সম্ভাবনার গল্প। তিনি খুব সহজ ভাষায় আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, রক্ত-মাংসের চেহারা আর হাত-পায়ের গড়ন পেলেই সত্যিকারের মানুষ হওয়া যায় না। দৈহিক অবয়বে আমরা সবাই হয়তো মানুষ, কিন্তু অন্তরের গভীরে সেই সত্যিকারের ‘মানুষ’ সত্তা কয়জনের মাঝে বেঁচে আছে? লালনের পুরো জীবনসাধনা ছিল এই বাইরের অবয়বের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আসল সোনার মানুষকে চেনা। আমরা যখন মানুষ হয়েও হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার আর লোভের আগুনে সমাজকে পোড়াতে থাকি, তখন সাঁইজির প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে সামনে দাঁড়ায়— আমরা কি তবে কেবল চেহারাতেই মানুষ, নাকি মননেও মানুষ?
লালনের গানে বারবার ধ্বনিত হয়েছে “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি” কিংবা “মানুষের মাঝে বাস করে অচিন পাখি”। সাঁইজি বিশ্বাস করতেন, জগতের সবচেয়ে বড় সত্য লুকিয়ে আছে এই মানুষের ভেতরেই। কিন্তু এই সত্যে পৌঁছানোর পথে বড় বাধা হলো মানুষের বাহ্যিক রূপ আর ভেতরের অহংকার। একটি প্রদীপ বাইরে থেকে দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেন, তার ভেতরে যদি তেল ও সলতে না থাকে আর তা থেকে যদি আলো না ছড়ায়, তবে সে প্রদীপের বাহ্যিক রূপ যেমন নিরর্থক, মানুষের এই বাইরের চেহারাও তেমনই। অবয়ব বা গঠন কেবল মাটির একটি পোশাক মাত্র, কিন্তু মানুষের আসল পরিচয় তার আচরণ, দয়া, প্রেম ও বিবেকের গভীরে।
আজকের এই যান্ত্রিক সময়ে চারপাশের সমাজ আর মানুষের আচরণের দিকে তাকালে লালনের আক্ষেপ আরও বেশি সত্য মনে হয়। আমরা নিজেদের আধুনিক, শিক্ষিত ও সভ্য বলে দাবি করি। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের অন্তরের অন্ধকার কি দূর করতে পেরেছে? প্রতিদিন সংবাদে যেসব হিংসা, স্বার্থপরতা, ক্ষমতার দম্ভ আর প্রতারণার খবর পাওয়া যায়, তা দেখে প্রশ্ন জাগে— এই মানুষগুলো কি সত্যিই মানুষ, নাকি এরা মানুষের পোশাক পরা কোনো হিংস্র চরিত্র? লালন তাঁর ধারালো বাণীতে আমাদের সেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তিনি যখন গেয়েছিলেন “সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে”, তখন তিনি সমাজের তৈরি কৃত্রিম বিভাজনকে তুচ্ছ করেছিলেন। কারণ, জাতের অহংকার কেবল বাইরের অবয়বের সঙ্গেই যুক্ত; ভেতরের যে মানবিক গুণাবলী, সেখানে উঁচু নীচের কোনো পার্থক্য থাকে না।
বাউল দর্শনে মানবদেহের এই গঠনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে দেখা হয়। লালন শাহ কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় বসে যে সাধনার বিস্তার ঘটিয়েছিলেন, তার মূল ভিত্তিই ছিল মানবতা ও আত্মশুদ্ধি। তিনি দেহতত্ত্ব ও মন নিয়ে সহজ অথচ গভীর জীবনদর্শনের কথা বলেছেন। এটি কোনো প্রথাগত বা কঠিন বইয়ের পড়া নয়, এটি হলো নিজের মনকে চেনার ও খাঁটি মানুষ হওয়ার এক নিবিড় অনুশীলন। কাঠ দিয়ে যেমন যত্ন করে মজবুত আসবাব তৈরি করতে হয়, তেমনই এই দেহকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে সৎ কাজের মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিত্বকে গড়ে তুলতে হয়। নদী বহমান না থাকলে যেমন তার পানি জমে পচে যায়, তেমনই মানুষ যদি নিয়মিত ভালোবাসা ও মানবিকতার চর্চা না করে, তবে তার জীবনও নীতিহীনতায় ভরে ওঠে।
লালনের ভাষায়, নিজের ভেতরের মনকে চেনাই হলো মূল সত্যকে চেনা। যে নিজের চরিত্রকে চিনল না, তার পুরো জীবনটাই থেকে গেল এক বড় ধোঁকা বা রূপক গোলকধাঁধার মধ্যে। তাঁর বিখ্যাত রূপক ‘আরশিনগর’ হলো আমাদের মন বা বিবেক, যেখানে প্রতি মুহূর্তে আমাদের আসল চেহারার প্রতিফলন ঘটে। তিনি গেয়েছিলেন, “বাড়ির কাছে আরশিনগর, সেথা এক পড়শী বসত করে/ আমি একদিন না দেখিলাম তারে।” এখানে এই ‘পড়শী’ মূলত আমাদের ভেতরেরই পবিত্র আত্মা বা বিবেকপ্রসূত মানুষ। কিন্তু অহংকার আর লোকদেখানো স্বভাবের পুরু ধুলো জমে আমাদের সেই ভেতরের আয়না আজ ঝাপসা হয়ে গেছে। ফলে আমরা কেবল বাইরের শারীরিক রূপটাই দেখি, ভেতরের বিবেকবান মানুষটিকে চিনতে পারি না।
লালনের দর্শনে লোভ, লালসা ও অহংকার হলো গভীর অন্ধকারের মতো। আলোর প্রদীপ যেমন ঘরের ভেতরের অন্ধকার দূর করে দেয়, তেমনই সত্যের অন্বেষণ মানুষের মনের খারাপ প্রবৃত্তিগুলোকে দমন করে। আমরা প্রতিদিন বাইরের সৌন্দর্য বাড়াতে কত সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় করি, নিজেকে সুন্দর ও অভিজাতভাবে সাজাই। কিন্তু আমাদের ভেতরের রূপক ‘অচিন পাখি’ বা জাগ্রত বিবেক কি খাঁচায় বন্দি হয়ে না খেয়ে ছটফট করছে না? খাঁচা যতই মজবুত আর চকচকে হোক না কেন, ভেতরের পাখিটি যদি অনাহারে মরে যায় বা উড়ে চলে যায়, তবে সেই শূন্য খাঁচার মূল্য আর কতটুকু? সাঁইজির কথা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, এই ক্ষণস্থায়ী দেহ একদিন মাটিতে মিশে যাবে, রয়ে যাবে কেবল মানুষের ভালো কাজ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার দাগ। অথচ আমরা বাইরের রূপ ও ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হয়ে পুরো জীবন পার করে দেই মিথ্যা প্রতিপত্তির পেছনে ছুটে।
লালন শাহের জীবদ্দশায় ছেউড়িয়ার আখড়ায় যখন নানা বর্ণ ও শ্রেণির মানুষের সমাগম ঘটত, তখন তিনি কোনো সামাজিক বৈষম্য বা জটিল শাস্ত্রীয় বিতর্কের সুযোগ রাখতেন না। তিনি জোর দিতেন সহজিয়া জীবনবোধ আর হৃদয়ের মানবিক অনুভূতির ওপর। তাঁর কাছে পুথিগত বিদ্যা বা শুষ্ক জ্ঞান ছিল পানির ওপর আঁকা দাগের মতো, যা বাতাসের সামান্য দোলাতেই মুছে যায়; কিন্তু হৃদয়ের নৈতিক শিক্ষার ছাপ পাথরে খোদাই করা বাণীর মতো চিরন্তন।
আজকের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের বড় বড় ডিগ্রি দিচ্ছে, বৈষয়িক জগতে সফল হওয়ার কৌশল শেখাচ্ছে, কিন্তু একজন ভালো ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কি পুরোপুরি পারছে? যদি পারত, তবে সমাজের উঁচুতলায় বসেও মানুষ অন্যকে ঠকাত না কিংবা নিজের ক্ষমতার জোরে দুর্বল মানুষের অধিকার কেড়ে নিত না। সাঁইজি তাই সোজা ভাষায় চিরন্তন বার্তা দিয়ে সতর্ক করেছিলেন— “সত্য বল সুপথে চল”। অর্থাৎ কেবল মুখে সত্যের ভান করা বা বাহ্যিক রূপ দেখানো নয়, দৈনন্দিন চলায়-বলায় ও কাজে সত্যকে ধারণ করাই হলো আসল মানুষের একমাত্র লক্ষণ।
মানুষের বাহ্যিক চেহারার পেছনে লুকিয়ে থাকা সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার দয়া, সহমর্মিতা ও ভালোবাসা। লালনের দর্শনে ভালোবাসা কোনো ক্ষণিকের আবেগ বা জাগতিক আকর্ষণ নয়; এটি হলো জগতের সব সৃষ্টির প্রতি সমান অনুভূতি ও গভীর দায়িত্ববোধ। যে মানুষ একটি ছোট্ট ফুলকে ভালোবাসতে পারে না, যে মানুষ অন্যের কষ্টে সমব্যথী হয়ে পাশে দাঁড়ায় না, যে মানুষ পরিবেশ ও প্রকৃতিকে নিজের অংশ মনে করে না— তার মানুষের আকৃতি ও অবয়ব থাকলেও সে মূলত এক প্রাণহীন যন্ত্র। বাতাস যেমন চোখে দেখা না গেলেও সব প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখে, ঠিক তেমনই ভালোবাসা ও দয়া চোখে আঙুল দিয়ে না দেখা গেলেও তা সমাজকে বাঁচিয়ে রাখার আসল রসদ যোগায়। লালন তাঁর সারা জীবনে এই নিরবচ্ছিন্ন ভালোবাসার কথাই বলে গেছেন। মানুষকে সেবা করা আর মানুষের অধিকারকে সম্মান জানানোকেই তিনি মানবজীবনের পরম লক্ষ্য মনে করতেন।
এখানেই লালনের দূরদৃষ্টি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের বড় পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি কোনো ভবিষ্যৎ বক্তা বা জ্যোতিষী ছিলেন না, কিন্তু তিনি মানুষের চিরন্তন মনস্তত্ত্ব গভীরভাবে বুঝতেন। তিনি জানতেন, যুগের পরিবর্তন হলেও মানুষের লোভ, হিংসা, অহংকার আর বাহ্যিক রূপ দেখানোর রোগ সহজে দূর হয় না। তাই শত বছর আগে কুষ্টিয়ার মাটিকে কেন্দ্র করে উচ্চারিত তাঁর বাণীগুলো আজও আমাদের আধুনিক প্রযুক্তিচালিত যান্ত্রিক সমাজের সামনে এক নির্মম আয়না হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাসের দীর্ঘ পটের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুগে যুগে যাঁরা মানুষের মুক্তির পথ দেখিয়েছেন, তাঁরা বাইরের আড়ম্বর নয়, অন্তরের আত্মশুদ্ধিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। লালন ফকিরও ছিলেন সেই কালজয়ী পথের পথ প্রদর্শক। তিনি কুসংস্কার ও সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে কোনো অস্ত্র তোলেননি; তুলেছিলেন সুর, নীতি ও গভীর জীবনবোধের বাণী।
আজকের এই অস্থির ও বৈষয়িক পৃথিবীতে যখন আমরা চরম নৈতিক সংকটে ভুগছি, চারপাশের কৃত্রিম দেয়ালগুলো যখন আমাদের আরও একাকী করে দিচ্ছে, তখন সাঁইজির বাণী হতে পারে আমাদের সঠিক পথের দিশা। আমাদের সর্বাগ্রে মনে রাখতে হবে, কেবল সোজা হয়ে হাঁটতে পারা, কথা বলতে পারা কিংবা যন্ত্রের মতো চিন্তা করতে পারাই মানুষ হওয়ার একমাত্র প্রমাণ নয়; আসল পরীক্ষা হলো অন্যের দুঃখে নিজের হৃদয়কে প্রসারিত করা। কাঠ বা পাথরের তৈরি সুন্দর মূর্তি হাজার বছর নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তা কাউকে সামান্যতম উষ্ণতা বা সহানুভূতি দিতে পারে না। আমরাও যদি ভালোবাসাহীন ও সংবেদনহীন হয়ে কেবল দিন যাপন করি, তবে সেই নির্জীব মূর্তির সঙ্গে আমাদের রক্ত-মাংসের চেহারার কোনো মূলগত তফাত থাকে না।
লালন সাঁইজির বাণীর অমলিন সুর আজও আমাদের থমকে দাঁড়িয়ে ভাবতে শেখায়— আমাদের এই জীবনযাত্রার মূল গন্তব্য আসলে কোথায়? আমরা কি সারা জীবন কেবল মাটির পুতুলের মতো সুদৃশ্য দেহ বয়ে বেড়িয়েই শেষ হয়ে যাব, নাকি তার ভেতরে মানুষের সেই নৈতিক ও মানবিক আলোকে জ্বালিয়ে তুলব? অবয়ব তো ক্ষণস্থায়ী রূপক মাত্র, আসল সত্তা হলো ভেতরের সেই সোনার মানুষ। যদি আমরা সাঁইজির বাণীকে কেবল সুরের বিলাসিতা না ভেবে সত্যি সত্যি অনুধাবন করতে পারি, তবেই আমাদের এই মানব রূপ সার্থক ও ধন্য হবে। তা না হলে, চেহারায় মানুষ হিসেবে আমরা হয়তো পৃথিবীর খাতায় নাম লিখিয়ে যাব, কিন্তু লালনের সার্বিক দৃষ্টিতে থেকে যাব সেই অচিন পাখির এক শূন্য খাঁচা হয়ে— যার ভেতরে কাঠামোটুকু থাকলেও জীবনের মূল সুরটাই কখনো বাজেনি।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









