উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই অবকাঠামো কতটা জনস্বার্থ পূরণ করছে, অর্থনীতিতে কী অবদান রাখছে এবং বিনিয়োগের বিপরীতে কতটা সুফল দিচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করে প্রকৃত সাফল্য। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল এ বাস্তবতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই টানেল ঘিরে যে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার সঙ্গে অর্জনের ব্যবধান এখন উদ্বেগজনক। প্রতিদিনের পরিচালন ব্যয় মেটানোর মতো আয়ও যখন হচ্ছে না, তখন প্রকল্পটির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। অথচ চালুর পর থেকে প্রতিবেদনে উল্লেখিত সময় পর্যন্ত টানেলটি ব্যবহার করেছে মোট ৪১ লাখ ৭২ হাজার যানবাহন, দৈনিক গড় মাত্র ৩ হাজার ৮৬৫টি। অর্থাৎ প্রত্যাশিত যানবাহনের তুলনায় বাস্তব ব্যবহার অনেক কম। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আয়-ব্যয়ের হিসাবে। বর্তমানে টানেলটির পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিদিন গড়ে ২৩ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে, বিপরীতে আয় মাত্র ১১ লাখ টাকা। ফলে, প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ টাকা ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতি দীর্ঘ মেয়াদে সরকারি অর্থের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে, যা কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি ব্যয়বহুল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে এত বড় ব্যবধান কেন তৈরি হলো? প্রতিবেদনে চিহ্নিত ১৪টি কারণের মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত সড়ক সংযোগের অভাব, সংযোগ সড়কের সক্ষমতার ঘাটতি, প্রত্যাশিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণ না হওয়া, প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়িত না হওয়া এবং মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত না হওয়া। এ ছাড়া বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, ভারী যান চলাচলে বিধিনিষেধ এবং স্ক্যানিং নিয়ে চালকদের ভীতিও যানবাহন কম হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব কারণ থেকে স্পষ্ট, টানেল নির্মাণের পরিকল্পনায় অবকাঠামোটিকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। একটি টানেল নির্মাণ করলেই সেখানে যানবাহনের প্রবাহ তৈরি হবে না। এর জন্য প্রয়োজন উন্নত সংযোগ সড়ক, কার্যকর বন্দরব্যবস্থা, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড এবং দুই প্রান্তে পরিকল্পিত নগরায়ণ। এসবের বাস্তবায়ন নিশ্চিত না করে শুধু ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে এত বড় বিনিয়োগ করা হলে লোকসানের ঝুঁকি থেকেই যায়।
এখানে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মান নিয়েও গভীর প্রশ্ন রয়েছে। যানবাহনের চাহিদা নিরূপণে কী ধরনের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল, পূর্বাভাস তৈরিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট সহায়ক প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে কী ধরনের নিশ্চয়তা ছিল- এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাস্তবসম্মত চাহিদা নিরূপণ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের ব্যয়বহুল ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
টানেলের আয় বাড়াতে সার্ভিস এরিয়া ইজারা, পরিচালন ব্যয় কমানো এবং দূরপাল্লার যানবাহনকে টানেলমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কর্ণফুলী ড্রাইডকের জেটি চালু এবং চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের কার্যক্রম শুরু হলে যানবাহন চলাচল বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে। সম্ভাব্য আয় বৃদ্ধির পূর্বাভাসকে নিশ্চিত অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। প্রতিটি উদ্যোগের বাস্তবায়ন, ব্যয় ও প্রত্যাশিত সুফল নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
এ অবস্থায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির তদন্তের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। তবে, তদন্ত যেন কেবল লোকসানের কারণ চিহ্নিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সম্ভাব্যতা যাচাই থেকে শুরু করে প্রকল্প অনুমোদন, ব্যয় নির্ধারণ, নির্মাণ এবং পরিচালনা- প্রতিটি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যৌক্তিকতা পরীক্ষা করতে হবে। কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ অবকাঠামো প্রকল্পে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের স্বাধীনতা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ নিশ্চিত করতে হবে। কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে এখন প্রয়োজন আবেগনির্ভর আশ্বাস নয়, বরং তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর জবাবদিহি। জনগণের অর্থে নির্মিত অবকাঠামো যেন জনগণের বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটিই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









