বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বিদেশের মাটিতে লাখো শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে দেশে আসে এই বৈদেশিক মুদ্রা। রেমিট্যান্সে শক্তিশালী হয় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য, সচল থাকে অর্থনীতির চাকা, স্বস্তি ফেরে অসংখ্য পরিবারে। কিন্তু প্রবাসীদের কষ্টার্জিত এই অর্থের বড় অংশ যদি দৈনন্দিন ভোগব্যয়েই শেষ হয়ে যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের যে সম্ভাবনা, তা অপূর্ণ থেকে যায়। তাই রেমিট্যান্সের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, প্রবাসী আয় পাওয়া পরিবারগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো বিনিয়োগ করে না। সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। তবে, এই বাস্তবতার জন্য পরিবারগুলোকে একতরফাভাবে দায়ী করা সমীচীন নয়। দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা অনেক পরিবারের কাছে রেমিট্যান্সই খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, বাসস্থান ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রধান অবলম্বন। মাসে গড়ে ৩৩ হাজার টাকা আয় করা একটি পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর সঞ্চয়ের সুযোগ খুব বেশি থাকে না। অতএব, ভোগব্যয় মানেই অপচয়- এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মৌলিক চাহিদা পূরণও অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টি করে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করে।
তবে, প্রয়োজনীয় ব্যয় ও অপরিকল্পিত খরচের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়ে বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা কিংবা গৃহস্থালি সামগ্রী সংগ্রহ অনেক পরিবারের কাছে নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতীক। কিন্তু এসব ব্যয়ের পাশাপাশি সঞ্চয় এবং আয় সৃষ্টিকারী উদ্যোগে বিনিয়োগ না হলে প্রবাসী সদস্যের আয় বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারটি আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে। প্রবাসে কর্মরত ব্যক্তির শ্রমের মেয়াদ সীমিত; অসুস্থতা, চাকরি হারানো কিংবা দেশে ফিরে আসার কারণে আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে যে কোনো সময়। তখন দীর্ঘদিনের উপার্জন যদি স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করতে না পারে, তবে পরিবারের ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী আয়ের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সহজবোধ্য বিনিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়মুখী আর্থিক পণ্য, কৃষি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে প্রতারণামূলক প্রকল্পের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অধিক মুনাফার প্রলোভনে প্রবাসীদের সঞ্চিত অর্থ ঝুঁকিতে না পড়ে। সহজ শর্তে ঋণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে রেমিট্যান্সের একটি অংশ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রবাসী আয়ের ব্যবহারকে কেবল ব্যক্তিগত পরিবারের হিসাবরূপে না দেখে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। তবে, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পরিবারের বাস্তব প্রয়োজন, সামর্থ্য ও ঝুঁকি বিবেচনা করেই নিতে হবে। জোর করে সঞ্চয় নয়, বরং সঞ্চয়ের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করাই কার্যকর পথ।
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবেন, আর তাঁদের পরিবার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সংগ্রাম করবে- এমন বাস্তবতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। রেমিট্যান্সের অর্থে আজকের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি আগামী দিনের আয়ের পথও তৈরি করতে হবে। ভোগ ও বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ শুধু বর্তমানের স্বস্তি নয়, ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির ভিত্তিও হয়ে উঠবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









