আমাদের দেশে শিল্প কারখানা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বীমা শিল্পের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বীমা শিল্পের এ গুরুত্বের কারণে ১৯৮৫ সালে তৎকালীন সরকার দেশে বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানি খোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর দেশের একমাত্র সরকারি বীমা কোম্পানি ‘সাধারণ বীমা কর্পোরেশন’ বীমা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত। এতে ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের ভীষণ দুর্ভোগ পোহাতে হতো।
ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের দুর্ভোগ লাঘবের উদ্যোগে বেসরকারি বীমা কোম্পানি খোলার উদ্যোগ নিলে ১৯৮৫ সালের দিকে প্রাথমিকভাবে ১১টি কোম্পানি দেশের বীমা শিল্পে আত্মপ্রকাশ করে। এতে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। বীমা ব্যবসা লাভজনক হওয়ার কারণে পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে আরো নতুন কোম্পানি বাজারে আসে। বর্তমানে দেশে ৪৬টি বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানি ব্যবসা করছে।
বাংলাদেশের মতো ছোট একটি দেশে এতগুলো বীমা কোম্পানির প্রয়োজনীয়তা কী- তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। সীমিত ব্যবসা নিয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে চলে তীব্র প্রতিযোগিতা। বীমা কোম্পানিগুলো বীমা গ্রাহকদেরকে বিভিন্নভাবে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। বীমা কোম্পানিগুলো বিশেষ করে বীমা প্রিমিয়ামের উপর কমিশন প্রদান নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতায় নামে। কে কার চেয়ে বেশি কমিশন দিতে পারবে তা নিয়ে চলে নোংরা প্রতিযোগিতা। এই নোংরা প্রতিযোগিতা বীমা শিল্পের সুনাম একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। বীমা প্রিমিয়াম-এর উপর কমিশন নিয়ে যখন এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছিল ঠিক তখনই বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এক কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করে।
আইডিআরএ বীমা প্রিমিয়ামের উপর কমিশন প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এভাবে বহুবার আইডিআরএ উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু সেই উদ্যোগ কখনো সফল হয়নি। কিছুদিন কমিশন বন্ধ থাকার পর পুনরায় কমিশন প্রদান শুরু হয়ে যায়। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলে কমিশন প্রদান প্রতিযোগিতা। উল্লেখ্য, দেশের বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় বীমা কোম্পানি আইডিআরএ’র নির্দেশ মানলেও কতিপয় বীমা কোম্পানি কমিশন প্রদান প্রথা চালিয়ে যেতে থাকে। আইডিআরএ কমিশন প্রদান বন্ধের লক্ষ্যে একটি কঠোর সার্কুলার জারি করে।
সার্কুলার নং- নন লাইফ ৮৪/২০২১ জারির মাধ্যমে কমিশন প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই সার্কুলার জারির পর বীমা কোম্পানিগুলো কমিশন প্রদানে কিছুদিন বিরত থাকে। কিন্তু পরবর্তীকালে আবার ধীরে ধীরে বীমা কোম্পানিগুলো কমিশন প্রদান করা শুরু করে। এ নিয়ে পুনরায় শুরু হয় নোংরা প্রতিযোগিতা। কমিশন প্রথা চালু হওয়াতে দেশের স্বনামধন্য বীমা কোম্পানিগুলো সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
কারণ, যেসব সাধারণ মানের বীমা কোম্পানি কমিশন দিচ্ছে তারাই সব ব্যবসা পেয়ে যাচ্ছে। আর যারা কোনো কমিশন দিচ্ছে না, তারা কোনো ব্যবসা পাচ্ছে না। এতে তারা ব্যবসা হারিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক নামী কোম্পানি ব্যবসা করতে না পেরে তাদের অস্তিত্ব রক্ষা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। দেশের বীমাশিল্পে পুনরায় কমিশন প্রদান প্রথা চালু হওয়ার ব্যাপারে আইডিআরএ’র কাছে বহু অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু আইডিআরএ’র পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কঠোর কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। যদিও আইডিআরএ কমিশন প্রথা বন্ধের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে আছে, তারপরও কতিপয় কোম্পানি কীভাবে বীমা গ্রাহকদের কমিশন দিয়ে যাচ্ছে? এসব তথ্য আইডিআরএ’র কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
আইডিআরএ যদি বীমা কমিশন প্রদানের দায়ে বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করত এবং তাদের ব্যবসায়ী কার্যক্রম বন্ধ করে দিত তাহলে অন্যান্য বীমা কোম্পানিগুলো সতর্ক হতো। দেশের বীমাশিল্পে শৃঙ্খলা ফিরে আসত। বর্তমানে বীমাশিল্পে কমিশন প্রথা নিয়ে বিভিন্ন বীমা কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, দেশের বীমা ব্যবসা এখন স্থবির অবস্থায় আছে।
তারা বলেন, ‘বাজারে প্রচলিত কমিশনের কারণে আমরা ব্যবসা হারাচ্ছি। বীমা গ্রাহকরা যেখানে কমিশন পাচ্ছে সেখানে ছুটে যাচ্ছে। যে কারণে আমরা আমাদের নিয়মিত ব্যবসা হারাচ্ছি। নিয়মিত ব্যবসা করতে না পারায় বীমা কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাচ্ছে। যার প্রভাব কোম্পানির কর্মরতদের উপর পড়ছে।’
জানা যায়, ইতোমধ্যে অনেক বীমা কোম্পানি তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে বীমা কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের বেতন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে করে দেশে স্বনামধন্য বীমা কোম্পানিগুলোতে কর্মরতদের অবস্থা খুবই শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বেতন না পেয়ে তারা আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বর্তমানে দেশের বেসরকারি সাধারণ বীমা শিল্পের অবস্থা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তার লাগাম টেনে ধরতে হবে।
সম্ভাবনাময় বীমাশিল্পকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য আইডিআরএ-কে আরো কঠোর হতে হবে। বীমা কোম্পানিগুলো কীভাবে কমিশন প্রদান করে তা খতিয়ে দেখতে হবে, কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে অনিয়মগুলো ধরতে হবে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগুলো কার্যকর করতে হবে। আইডিআরএ চাইলে সবকিছু সম্ভব করতে পারে। দেশের বীমা শিল্পের সার্থে আইডিআরএ-কে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
আমরা চাই, দেশের বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো নিজ নিজ কোম্পানির নীতিতে স্বস্তিতে ব্যবসা করে যাক। কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি যেন বীমা শিল্পকে গ্রাস করতে না পারে সেটাই প্রত্যাশা করি।
লেখক : প্রাবন্ধিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









