খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপকরণ। অথচ সেই খাদ্যই যখন বিষে পরিণত হয়, তখন জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় ভবিষ্যৎ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের বিস্তার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট। শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, দুধ, ফলমূল, শাকসবজি ও মসলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভেজাল এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহারের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের কারণে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গবেষণায় খাদ্য নমুনার উল্লেখযোগ্য অংশ দূষিত হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। ক্ষতিকর রাসায়নিক, নিষিদ্ধ রং, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের ওপর। ফলে, খাদ্যে ভেজালকে কেবল ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি মানুষের জীবন, সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রশ্ন হচ্ছে, এত আইন, অভিযান, জরিমানা ও প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার পরও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না কেন? এর অন্যতম কারণ হতে পারে আইনের দুর্বল প্রয়োগ, তদারকির সীমাবদ্ধতা, অপরাধীদের জবাবদিহির অভাব এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি। সাময়িক অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। জরিমানার পর একই প্রতিষ্ঠান আবার ভেজাল উৎপাদনে জড়িয়ে পড়লে সেই অভিযান কার্যত অর্থহীন হয়ে যায়। অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে পরীক্ষাগারে কোনো পণ্য অনিরাপদ প্রমাণিত হলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম, পণ্যের পরিচয় ও পরীক্ষার ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। এতে ভোক্তারা সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাবেন এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে। তবে, এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাপদ্ধতি এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নিয়মিত বাজার তদারকির ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কৃষিপণ্যে কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা, খাদ্য উৎপাদন ও পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং খাদ্যের মোড়কে উপাদান ও উৎপাদনসংক্রান্ত সঠিক তথ্য উল্লেখ করাও বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে, নিরাপদ খাদ্যের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং নিরাপদ পণ্য সরবরাহ করা উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের আইনগত ও নৈতিক কর্তব্য।
মুনাফার লোভে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই। খাদ্যে ভেজাল রোধে প্রয়োজন লোকদেখানো অভিযান নয়, বরং ধারাবাহিক, স্বচ্ছ ও কঠোর পদক্ষেপ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, নিরাপদ খাদ্য কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে তার মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









