বিশ্বখ্যাত পপ তারকা ম্যাডোনা শুধু সংগীতশিল্পী নন, তিনি একজন শিল্পসংগ্রাহকও। তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে মেক্সিকোর কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলো–এর দুটি মূল্যবান চিত্রকর্ম। বহু বছর ধরেই ম্যাডোনা প্রকাশ্যে কাহলোর শিল্পকর্মের প্রতি নিজের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা প্রকাশ করে আসছেন। তবে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি কাহলোর জীবন ও তার ছবির ইতিহাস নিয়ে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা ইতিহাসবিদ ও শিল্পবিশেষজ্ঞদের মতে একদমই সঠিক নয়।
লন্ডনের নিজের বাড়িতে ভোগ (Vogue) ম্যাগাজিনের একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে ম্যাডোনা তার সংগ্রহে থাকা 'সেলফ-পোর্ট্রেট উইথ মানকি' (Self-Portrait with Monkey) চিত্রকর্মটি দেখান। এ সময় তিনি দাবি করেন, ফ্রিদা কাহলো অনেক বানর পোষতেন, কারণ সেগুলো তাকে জানিয়ে দিত, তার স্বামী ও বিখ্যাত চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিভেরা অন্য কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করে বাড়ি ফিরেছেন। ম্যাডোনার ভাষ্য অনুযায়ী, রিভেরা বাড়ি ফিরলেই বানরগুলো অস্বাভাবিক আচরণ করত, আর সেখান থেকেই কাহলো স্বামীর অবিশ্বস্ততার খবর জানতে পারতেন।
শিল্পবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গল্পের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। বরং 'সেলফ-পোর্ট্রেট উইথ মানকি' ছবিতে থাকা বানরটির নাম ছিল ‘ফুলাং-চাং’। এটি ফ্রিদা কাহলোকে উপহার দিয়েছিলেন তার প্রেমিক ও স্বামী স্দিয়েগো রিভেরা নিজেই।
গবেষকদের মতে, ফ্রিদার জীবনে বানরগুলোর গুরুত্ব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছোটবেলায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণে তিনি কখনও মা হতে পারেননি। ফলে তার পোষা প্রাণীগুলো—বিশেষ করে বানর—তার কাছে অনেকটা সন্তানের মতোই ছিল। বানর ছাড়াও তিনি কুকুর, বিড়াল, টিয়া পাখি এমনকি একটি হরিণও পুষতেন। এসব প্রাণী তাকে মানসিক সান্ত্বনা দিত এবং একাকিত্ব কাটাতে সাহায্য করত।
ভিডিওটির আরেক অংশে ম্যাডোনা তার সংগ্রহে থাকা আরেকটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম 'মাই বার্থ' (My Birth) নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, ছবিটি তিনি এক পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে কিনেছিলেন, যিনি দীর্ঘদিন এটি নিজের আলমারিতে রেখে দিয়েছিলেন।
ম্যাডোনার দাবি, এই ছবিটি ফ্রিদা কাহলো ও তার মা মাতিলদে কালদেরোন–এর জটিল সম্পর্কের প্রতিফলন। তিনি বলেন, কাহলো নাকি জীবনের বড় একটি সময় মায়ের অবহেলার শিকার হয়েছিলেন। নিজের মাকে অল্প বয়সে হারানোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজে নিয়েই তিনি এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ফ্রিদা কাহলোর লেখা চিঠিপত্রে দেখা যায়, তিনি মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করতেন। বিদেশ সফরে থাকাকালে মাকে লেখা এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “প্রিয় মা, আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখো। তোমার চিঠি আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মাই বার্থ’ চিত্রকর্মটি আঁকা হয়েছিল ফ্রিদার মায়ের মৃত্যুর কিছুদিন পর। মায়ের মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। ধারণা করা হয়, এই ছবির মাধ্যমে তিনি নিজের শোক ও মানসিক কষ্ট প্রকাশ করার চেষ্টা করেছিলেন।
যদিও ফ্রিদা কাহলোর জীবন নিয়ে ম্যাডোনার কিছু ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে, তবুও তিনি বহুবার কাহলোকে নিজের ‘চিরন্তন অনুপ্রেরণা’ এবং ‘রক্ষাকর্তা দেবদূত’ বলে উল্লেখ করেছেন। ম্যাডোনার ভাষায়, সংগীতজীবনের শুরুর কঠিন সময় থেকেই কাহলোর জীবন ও শিল্প তাকে সাহস জুগিয়েছে।
ম্যাডোনার কাছে কাহলোর দুটি আসল চিত্রকর্ম থাকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কারণ মেক্সিকোর আইনে ফ্রিদা কাহলোর শিল্পকর্ম বিশেষভাবে সুরক্ষিত। ১৯৮৪ সালে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিগেল দে লা মাদ্রিদ এক ডিক্রির মাধ্যমে কাহলোর সব শিল্পকর্মকে জাতীয় শিল্প ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই আইনে সরকারি অনুমতি ছাড়া এসব শিল্পকর্ম স্থায়ীভাবে দেশের বাইরে নেওয়া যায় না। পাশাপাশি মেক্সিকোর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস অ্যান্ড লিটারেচার (INBAL)–এর অনুমোদন ও তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো শিল্পকর্ম বিদেশে পাঠানোও সম্ভব নয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









