ইবন আরাবির ‘রূহ আল-কুদস ও আদ-দুররাত আল-ফাখিরাহ’র ইংরেজি ভার্সন ‘আন্দালুসের সুফি’, আর. ডব্লিউ. জে. অস্টিনের অনুবাদ, ভূমিকা ও টীকায় গড়ে ওঠা একটি অসাধারণ সংকলন। বইটি ইবন আরাবির সময়কার সাধকদের জীবন, সাধনা, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত এক দুলর্ভ ঐতিহাসিক সুফি অভিজ্ঞতা।
ইবন আরাবি তার সুফি সাধনার পথে যে সকল সাধকদের স্মরণ পেয়েছেন; দিক্ষা নিয়েছেন এই বইয়ে তিনি তাদের সম্পর্কে লিখেছেন। যা সুফি সাধনার এক ঐতিহাসিক দলিল। দৈনিক এদিন অনলাইন-এর পাঠকের জন্য আমরা সেই সকল পবিত্র আত্মাদের নিয়ে লেখা ইবন আরাবির জীবনীর ভাষান্তর ধারবাহিকভাবে প্রকাশ করব।
আবু জাফর আল-উরইয়ানি: হৃদয়ের গোপন পথ
আমি যখন আল্লাহর পথে চলার প্রথম দিনগুলো অতিক্রম করছি, তখন সেভিয়ায় এলেন আবু জাফর আল-উরইয়ানি। তার মধ্যে এমন এক নীরবতা ছিল, যা শব্দের চেয়ে গহীন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি সত্যিই আল্লাহর পথে চলার সংকল্প করেছ?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
তিনি বললেন, ‘তাহলে পৃথিবীকে তোমার হৃদয় থেকে সরিয়ে দাও। তার সঙ্গে তোমার যে বন্ধন, তা ছিন্ন করো। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সঙ্গী কোরো না। যে তার দিকে যেতে চায়, সে পথের প্রথম কাজ হলো নিজের চারপাশের ভিড় থেকে সরে আসা।’
তিনি ছিলেন নিরক্ষর; কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল এমন জ্ঞান, যার সামনে অক্ষরের জ্ঞান অনেক সময় শিশুর মতো মনে হয়। তাওহিদের জ্ঞান তার মধ্যে ছিল গভীর ও প্রত্যক্ষ। তিনি যখন কোনো বিষয়ে মন স্থির করতেন, তার মন যেন সেই বিষয়ের অন্তঃস্থলে পৌঁছে যেত। মানুষের চিন্তার ওপরও তার এক অদ্ভুত প্রভাব ছিল। তিনি সর্বদা পবিত্র অবস্থায় থাকতেন, কিবলার দিকে মুখ করে আল্লাহর নাম স্মরণ করতেন। তার জিকির ছিল নিঃশব্দ, অথচ তার উপস্থিতি অনুভব করা যেত।
একবার খ্রিষ্টানরা তাকে বন্দী করল। কিন্তু বন্দী হওয়ার আগেই তিনি যেন জানতেন, কী ঘটতে যাচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, যে কাফেলার সঙ্গে তিনি ছিলেন, সেটি ধরা পড়বে। পরে ঠিক তাই হলো। আশ্চর্যের বিষয়, যারা তাকে বন্দী করেছিল, তারাও তার প্রতি সম্মান দেখিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পাঁচশ দিনারের বিনিময়ে তার মুক্তির ব্যবস্থা হলো।
তিনি বললেন, এই অর্থ যত বেশি মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা যায়, ততই ভালো। কারণ মানুষের প্রত্যেকটি প্রাণের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার যোগ্য। একজন মানুষের মুক্তি কেবল তার নিজের মুক্তি নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরও অনেক হৃদয়ের মুক্তির সম্ভাবনা।
আরেকবার আমরা কুতাল দুর্গের দিকে গেলাম। সেখানে বৃষ্টি হচ্ছিল না। লোকেরা তাকে বলল, তিনি যেন আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেন। তিনি প্রার্থনা করলেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই বৃষ্টি নামল।
কিন্তু আমাদের ওপর বৃষ্টি পড়ল না।
তার শিষ্য মুহাম্মদ তাকে বলল, ‘হুজুর, চারদিকে বৃষ্টি হচ্ছে, অথচ আমাদের ওপর এক ফোঁটাও পড়ছে না।’ আল-উরইয়ানি বললেন, ‘আমি যদি মনে রাখতাম যে বৃষ্টি চাইতে এসেছি, তবে আমাদের ওপরও পড়ত।’
আমি বুঝলাম, তার কাছে দোয়া ছিল কেবল শব্দ নয়। দোয়া তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন বান্দা নিজের চাওয়াকেও ভুলে যায় এবং যার কাছে চাওয়া হচ্ছে, তার মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়।
একসময় তিনি অন্ধ হয়ে গেলেন। সেই সময় তিনি এমন এক বালকের সঙ্গে দেখা পেলেন, যে সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করেছিল। তিনি বললেন, ‘চিরস্থায়ী সত্তাই ক্ষণস্থায়ীকে বহন করেন। তাই কোরআনই আমাদের ধারণ করে, আমাদের রক্ষা করে; আর তোমার পুত্রও তার স্মৃতিতে কোরআনকে ধারণ করে।’
এ কথার মধ্যে যেন একটি গভীর রহস্য ছিল। আমরা মনে করি, আমরা কোনো কিছুকে ধারণ করি। অথচ সত্য হলো—যাকে আমরা ধারণ করছি বলে ভাবি, অনেক সময় সে-ই আমাদের ধারণ করে।
তিনি আমাকে প্রথম দেখেই আপনজনের মতো গ্রহণ করেছিলেন। আমাকে তিনি ‘পুত্র’ বলে ডাকতেন। তার পরিবারের মানুষ তার বরকতকে গ্রহণ করেনি; কিন্তু আমি তার সান্নিধ্য থেকে সরে যাইনি। তার জীবনের প্রথম দিকের একটি ঘটনা তিনি আমাকে বলেছিলেন। তার পরিবার প্রতি বছর তাকে আট বস্তা ডুমুর দিত। তিনি যখন নির্জনে সাধনায় থাকতেন, তার স্ত্রী একদিন বিরক্ত হয়ে তাকে তিরস্কার করলেন। তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলেন।

তখন তার অন্তরে একটি বাণী উদিত হলো—বিশ বোজা ডুমুর তার কাছে আসবে। দিন তখন শেষ হতে চলেছে। সূর্য ডোবার আগেই বিশ বোজা ডুমুর তার কাছে এসে পৌঁছাল। যে হৃদয় আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, তার কাছে পৃথিবীর ঘটনাগুলো আর কেবল ঘটনা থাকে না। প্রতিটি ঘটনা হয়ে ওঠে একটি ইশারা। রুটি, বৃষ্টি, ডুমুর, অন্ধকার, বন্দিত্ব—সবকিছুই তখন একই দরজার দিকে নির্দেশ করে।
আল-উরইয়ানি ধ্যান করতেন। তার ধ্যানের মধ্যে আনন্দ ছিল, আবার প্রত্যাশাও ছিল। কিন্তু তার প্রত্যাশা ছিল না পৃথিবীর কোনো বস্তু পাওয়ার; তার প্রত্যাশা ছিল সেই উপস্থিতির, যাকে পাওয়া মানে নিজের ‘আমি’-কে হারিয়ে ফেলা।
শেষবার যখন তার কাছে গেলাম, তাকে আবু আল-আব্বাস ইবন আল-আরিফের একটি উক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম ‘যা কখনো ছিল না, তা বিলীন হয়ে যায়; আর যিনি চিরকাল আছেন, তিনি অবশিষ্ট থাকেন।’
আমি উত্তর জানতাম। তবু নীরব রইলাম। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখে দিলে তার অর্থ ছোট হয়ে যায়। কখনো নীরবতাই উত্তরের সবচেয়ে পূর্ণ রূপ। আল-উরইয়ানি আধ্যাত্মিক সামায় অংশ নিতেন। সেখানে তার আচরণ ছিল শান্ত, স্থির। কিন্তু যখন কোরআন পাঠ করা হতো, তার মধ্যে অন্য এক অবস্থা দেখা দিত। তখন তার হৃদয় যেন শব্দের পেছনে লুকিয়ে থাকা অর্থের দিকে ছুটে যেত।
একবার নামাজে তিনি কোরআনের সেই আয়াত শুনলেন—‘আমি কি পৃথিবীকে বিশ্রামের স্থান করিনি এবং পর্বতগুলোকে খুঁটির মতো স্থাপন করিনি?’
এই আয়াতের মধ্যে তিনি একের পর এক স্তর দেখতে পেলেন। বিশ্রামের স্থান হলো এই পৃথিবী; আর তার খুঁটি হলো মুমিনেরা। আবার বিশ্রামের স্থান হলো উম্মত; তার খুঁটি হলো আরিফগণ—যারা আল্লাহকে জেনেছেন। আবার আরিফগণই হয়ে গেলেন বিশ্রামের স্থান, আর নবীরা হলেন তাদের খুঁটি। আবার নবীরাই বিশ্রামের স্থান, আর রাসুলগণ তাঁদের খুঁটি।
তারপর তিনি থামলেন। আর বললেন—‘এরপর কী?’
এই ‘এরপর কী’—এর মধ্যেই ছিল অসীমের দরজা। কারণ জ্ঞান যত গভীরে যায়, ততই বোঝা যায় যে প্রতিটি উত্তর আরেকটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত জ্ঞান মানুষকে এমন এক প্রান্তে নিয়ে যায়, যেখানে প্রশ্ন ও উত্তর উভয়েই নীরব হয়ে যায়। একদিন এক ব্যক্তি তাকে ছুরি দিয়ে হত্যা করতে উদ্যত হলো। আল-উরইয়ানি পালালেন না। তিনি শান্তভাবে নিজের গলা এগিয়ে দিলেন।
লোকটি ছুরি চালাতে গেল। কিন্তু ছুরিটি তার হাতেই বেঁকে গেল। লোকটি তখন ভেঙে পড়ল এবং তওবা করল। যে হৃদয় নিজের জীবনকে নিজের বলে ধরে রাখে, তার কাছে মৃত্যু ভয়। কিন্তু যে হৃদয় জীবনকে আমানত বলে জানে, তার কাছে মৃত্যু আরেকটি দরজা মাত্র।
অনেক সময় আল-উরইয়ানি আবু আবদুল্লাহ ইবন আল-হাওয়াসের মজলিসে যেতেন। সেখানেই তিনি আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে গেলেন। তার সম্পর্কে বলা হতো, তিনি জাগ্রত অবস্থায় যেমন আল্লাহকে স্মরণ করতেন, ঘুমের মধ্যেও তার জিকির থামত না।
কিন্তু শহরের লোকেরা তাকে বুঝতে পারেনি। তারা তাকে সেখান থেকে বের করে দিল। এরপর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। খালাফ নামের এক জিন শহরের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়িতে এসে বাসা বাঁধল। সে মানুষের গোপন পাপ ও লুকানো কাজ প্রকাশ করতে লাগল। লোকেরা জিজ্ঞেস করলে সে বলত, ‘আল-উরইয়ানিই আমাকে পাঠিয়েছেন।’
ছয় মাস এভাবে চলল। শেষ পর্যন্ত লোকেরা বুঝল, তারা যে মানুষটিকে তাড়িয়ে দিয়েছে, তার অনুপস্থিতিই তাদের জন্য শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা আল-উরইয়ানির কাছে ফিরে গেল। ক্ষমা চাইল। তাকে আবার শহরে ফিরিয়ে আসার অনুরোধ জানাল।
তিনি ফিরে এলেন এবং সেই জিনকে সরিয়ে দিলেন। কিন্তু সাধকের কাছে অলৌকিক ঘটনাও আসলে অলৌকিক নয়। কারণ তিনি জানেন, দৃশ্যমান জগতের আড়ালেও আরেকটি জগত কাজ করছে। আমরা যাকে আকস্মিকতা বলি, তার মধ্যেও কখনো কখনো একটি অদৃশ্য বিধান কাজ করে।
একদিন তিনি পান করার জন্য কিছু চাইলেন। তার এক নারী শিষ্যা তামার একটি পাত্রে পানি এনে দিলেন। পাত্রটির মুখও ছিল তামার ঢাকনায় ঢাকা। তিনি পাত্রটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি এমন কিছু পান করতে চাই না, যা দুই অশুভ জিনিসের মাঝখানে রয়েছে।’ আমি তখন আরেকটি পাত্র এনে তাকে পানি দিলাম। এই সামান্য ঘটনাটিও আমার কাছে শিক্ষা হয়ে রইল।
কারণ আল্লাহ মানুষের কাছে জ্ঞান কেবল গ্রন্থের মাধ্যমে প্রকাশ করেন না। কখনো একটি পাত্র, কখনো এক ফোঁটা পানি, কখনো বৃষ্টিহীন আকাশ, কখনো একটি শিশুর মুখে মুখস্থ কোরআন—সবই হয়ে ওঠে তার ইশারা।
মানুষ ভাবে, সে পৃথিবীর বস্তুগুলোকে দেখে। কিন্তু আরিফ জানেন, আসলে বস্তুগুলোও তাকে দেখছে—তার হৃদয়ের দিকে, তার অজ্ঞতার দিকে, তার আকাঙ্ক্ষার দিকে।
এই কারণেই আল-উরইয়ানির কাছে কোনো ঘটনা নিছক ঘটনা ছিল না। প্রতিটি দৃশ্য ছিল একটি আয়না। আর সেই আয়নায় তিনি পৃথিবীকে নয়, পৃথিবীর মধ্য দিয়ে একমাত্র সত্যকে দেখতে চাইতেন।
যে মানুষ সত্যিই পথের যাত্রী, তার জন্য শেষ পর্যন্ত পথও থাকে না, পথিকও থাকে না। থাকে কেবল সেই সত্তা, যার দিকে যাওয়ার জন্য পথের জন্ম।

পরিচিতি
আবু জাফর আল-উরইয়ানি’, লুলের আবু জাফর আল-উরইয়ানি নামেও পরিচিত। পর্তুগালের আলগার্ভ অঞ্চলের লুলে একসময় পরিচিত ছিল আল-উলিয়া নামে। ইসলামী শাসনামলে এটি ছিল একটি সমৃদ্ধ ও সুরক্ষিত নগরকেন্দ্র; আজও তার প্রমাণ মেলে দুর্গের প্রাচীর, সরু পুরোনো নগরপথ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে। দ্বাদশ শতকের আলমোহাদ আমলের হাম্মামটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—২০০৬ সালে আবিষ্কৃত এই স্থাপনাকে ২০২৩ সালে পর্তুগাল ‘জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আবু জাফর আল-উরিয়ানি ছিলেন দ্বাদশ শতকের আন্দালুসিয়ার (বর্তমান পর্তুগাল ও স্পেন) একজন বিখ্যাত সুফি সাধক এবং মহান সুফি দার্শনিক ইবনে আরাবির প্রথম আধ্যাত্মিক গুরু। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন বা নিরক্ষর ছিলেন, কিন্তু খোদার প্রেমে ও আত্মশুদ্ধিতে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন। ১১৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তরুণ ইবনে আরাবি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। আল-উরিয়ানি সবসময় আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকতেন, এমনকি ঘুমের মধ্যেও তার জিকির চলত। তাঁর সান্নিধ্যেই ইবনে আরাবির আধ্যাত্মিক জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও খোদার একত্ববাদের (তওহিদ) ওপর তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি ছিল অতুলনীয়। ১১৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এই মহান সাধক মৃত্যুবরণ করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









