সন্তানকে হারানোর পর তার স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকা বাবা-মায়ের কাছে যদি একদিন কেউ এসে বলে—আপনাদের সন্তানকে আবার ফিরিয়ে দিতে পারি, তবে কী করবেন?
প্রশ্নটি শুনতে যতটা কল্পবিজ্ঞানের, তার ভেতরের আবেগ ততটাই বাস্তব। প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক, তাকে আবার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রযুক্তি সেই আকাঙ্ক্ষাকে কত দূর পর্যন্ত পূরণ করতে পারে—জাপানি নির্মাতা হিরোকাজু কোরে-এদার নতুন ছবি ‘শিপ ইন দ্য বক্স’ মূলত এই প্রশ্নগুলোর কাছাকাছি যেতে চায়।
গল্পের কেন্দ্রে স্থপতি ওতোনে ও তার স্বামী কেনসুকে। দুই বছর আগে এক দুর্ঘটনায় তাদের সাত বছরের ছেলে কাকেরু মারা গেছে। সময় পেরিয়ে গেলেও সন্তান হারানোর ক্ষত শুকায়নি। এমন সময় ‘রিবার্থ’ নামের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের সামনে হাজির করে এক অদ্ভুত প্রস্তাব—জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির সাহায্যে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের আদলে তৈরি করা যায় মানবাকৃতি প্রতিরূপ।
দম্পতি শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। তাদের ঘরে ফিরে আসে কাকেরুর মতো দেখতে, কাকেরুর মতো কথা বলা একটি সাত বছরের এআই মানবাকৃতি।
কিন্তু সে কি সত্যিই কাকেরু?
ছবিটির আসল প্রশ্ন এখানেই। চেহারা, কণ্ঠ, স্মৃতি ও আচরণ—সবকিছু যদি একজন মৃত শিশুর সঙ্গে মিলে যায়, তবু কি তাকে সেই শিশুই বলা যায়? নাকি সে কেবল একটি অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি, যা মানুষের শোককে সাময়িকভাবে সান্ত্বনা দিতে পারে?
কোরে-এদা এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজভাবে দেন না। বরং অত্যন্ত নরম, ধীর এবং সংযত ভঙ্গিতে গল্পটি এগিয়ে নেন। এটাই ছবিটির শক্তি, আবার দুর্বলতাও।
কাকেরু ধীরে ধীরে নিজের বুদ্ধিমত্তা ও স্বাধীনতার পরিচয় দিতে শুরু করে। সে স্থানীয় ট্রেনের সব স্টেশনের নাম অনায়াসে বলতে পারে। তার আচরণ কখনো শিশুসুলভ, কখনো অস্বাভাবিকভাবে বুদ্ধিদীপ্ত। দর্শকের মনে তখন প্রশ্ন জাগে—এই যন্ত্রের ভেতরে কি কোনো অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে? তার কি নিজস্ব সত্তা তৈরি হচ্ছে?
সায়েন্স ফিকশন সিনেমায় এই প্রশ্ন নতুন নয়। ‘২০০১: আ স্পেস ওডিসি’, ‘ব্লেড রানার’ কিংবা ‘আফটার ইয়াং’-এর মতো ছবিতে মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক, পরিচয় এবং অনুভূতির প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণভাবে উঠে এসেছে। ‘শিপ ইন দ্য বক্স’ও সেই পথে হাঁটার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ছবিটি বারবার সম্ভাবনার দরজা খুলে আবার সেখান থেকে সরে যায়।
ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক এসেছে আন্তোয়ান দ্য সেন্ট-একজুপেরির ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ থেকে। কাকেরু যে বইটি পড়ে, তার ‘বাক্সের ভেতরের ভেড়া’ যেন এখানে আত্মার প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে প্রশ্নটি প্রযুক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে দর্শনের দিকে চলে যায়—একটি যন্ত্রের কি আত্মা থাকতে পারে?

গাছের সঙ্গে কাকেরুর সম্পর্কও এই ভাবনাকে আরও গভীর করে। জীবন্ত গাছের সঙ্গে তার এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়। যেন নির্মাতা জানতে চান—জীবন কি শুধু জৈব শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি অনুভূতি ও সম্পর্কের মধ্যেও জীবনের কোনো সংজ্ঞা লুকিয়ে আছে?
তবে ছবির সবচেয়ে বড় সমস্যা এর ঢিলেঢালা কাঠামো। একদিকে এটি হারানো সন্তানের শোকের গল্প, অন্যদিকে এআই নিয়ে ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা; আবার কোথাও কোথাও এটি রহস্য ও অস্বস্তির দিকেও যেতে চায়। কিন্তু কোনো দিকেই যথেষ্ট গভীরতা তৈরি হয় না।
ফলে ‘শিপ ইন দ্য বক্স’ বড় কোনো প্রযুক্তি-থ্রিলার হয়ে উঠতে পারে না। এটি বরং এক কোমল, বিষণ্ন প্রযুক্তি-রূপকথা—যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়ে মানুষের শোকই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তি হয়তো মৃত মানুষটির চেহারা ফিরিয়ে দিতে পারে, তার কণ্ঠও নকল করতে পারে। কিন্তু একজন মানুষকে সত্যিই ফিরিয়ে আনা যায় কি? ‘শিপ ইন দ্য বক্স’ সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বরং দর্শককে নীরবে প্রশ্নটির সামনে দাঁড় করিয়ে রাখে—মানুষ হওয়ার জন্য শরীর, স্মৃতি আর বুদ্ধির বাইরে আর কী দরকার?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









