কলোরাডোর পাহাড়ে সেপ্টেম্বরের শুরুতে একটি ছোট শহর হঠাৎ বদলে যায়। রাস্তাগুলোতে মানুষ বাড়ে। হোটেলগুলো ভরে যায়। ক্যাফেতে অপরিচিত মানুষ পাশাপাশি বসে। কেউ একজন কোনো সিনেমার কথা বলছে। আরেকজন বলছে, সে জানে না সিনেমাটি কী—কিন্তু তবু সে এসেছে।
শহরটির নাম টেলুরাইড।
২০২৬ সালের ৪ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর বসছে ‘৫৩তম টেলুরাইডে ফ্লিম ফ্যাস্টিভাল’। চার দিনের এই উৎসবটি অন্য অনেক বড় চলচ্চিত্র উৎসবের মতো নয়। এখানে দর্শককে আগেই বলা হয় না, কোন সিনেমা দেখানো হবে। উৎসবের আয়োজকেরা ইচ্ছা করেই অনুষ্ঠানসূচি গোপন রাখেন। দর্শককে প্রথমে পাহাড়ে আসতে হয়, তারপর জানতে হয় সে কী দেখতে এসেছে।
এটি এক ধরনের পুরোনো বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা উৎসব। আপনি টিকিট কিনবেন। ভ্রমণের ব্যবস্থা করবেন। পাহাড় পেরিয়ে টেলুরাইডে পৌঁছাবেন। তারপর অপেক্ষা করবেন। সিনেমার নাম জানার জন্য।
টেলুরাইড যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমে, সান জুয়ান পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত। শহরটি ছোট। কিন্তু প্রতিবছর লেবার ডে উইকএন্ডে চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হলে তার জনসংখ্যা সাময়িকভাবে প্রায় তিন গুণ হয়ে যায়। উৎসবের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এখানে ৭,৮০০-এর বেশি চলচ্চিত্রপ্রেমী আসেন এবং সে সংখ্যা বেড়ে ৬০ হাজারের বেশি হতে পারে। ২০২৬ সালের উৎসবে ১১টি স্ক্রিন থাকবে; এর মধ্যে দুটি উন্মুক্ত আকাশের নিচে এবং ছয়টি উৎসবের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত।
কিন্তু সংখ্যাগুলো টেলুরাইডকে জানতে আপনাকে তেম সাহায্য করবে না। টেলুরাইডকে বোঝার জন্য বরং একটি পথ কল্পনা করতে হয়। সকালের ঠান্ডা। দূরে পাহাড়। হাতে কফি। সামনে কোনো সিনেমার নাম নেই। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি হয়তো একজন চলচ্চিত্র সমালোচক, হয়তো পরিচালক, হয়তো এমন একজন দর্শক যিনি বছরে একবার এই শহরে আসেন শুধু সিনেমার জন্য।
তারপর হঠাৎ দরজা খুলে যায়। সবাই ভেতরে যায়। আলো নিভে যায়। সিনেমা শুরু হয়।
টেলুরাইডের সবচেয়ে অদ্ভুত নিয়মই তার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ—‘উৎসবের মূল অনুষ্ঠানসূচি উদ্বোধনের ঠিক আগে পর্যন্ত সবকিছু গোপন থাকে।’
২০২৬ সালে এসেও সেই নিয়ম বদলাচ্ছে না। উৎসবের অফিসিয়াল প্রোগ্রাম গাইডে এখনো সরাসরি বলা হচ্ছে, ‘ইটস এ সিক্রেট’। কোন সিনেমা থাকবে, কারা সম্মানিত হবেন—এসব তথ্য দর্শককে পাহাড়ে পৌঁছানোর আগে জানানো হয় না।
আজকের চলচ্চিত্র দুনিয়ায় এটি প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার।
সাধারণত একটি বড় উৎসবের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই আমরা জানি—কোন পরিচালক আসছেন, কোন সিনেমার ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হবে, কোন অভিনেতা পুরস্কারের দৌড়ে আছেন। ট্রেলার আসে। পোস্টার আসে। সাক্ষাৎকার আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। টেলুরাইড সেই শব্দের ভেতর থেকে একটু সরে; দূরেই দাঁড়ায়।
এখানে আগে থেকে জানার বদলে ‘আবিষ্কারের’ আনন্দ সকলে উদযাপন করতে আসনে।
উৎসবের ইতিহাসে ‘ব্লু ভেলভে’, ‘স্ট্রেঞ্জার দ্যান প্যারাডাইস’, ‘কাউচিং টাইগার, হিডেন ড্রাগন’, ‘টক টু হা’, ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’, ‘ক্যাপোট’, ‘জুনো’, ‘স্লামডগ মিলিয়নেয়ার’ এবং ‘দ্য কিংস স্পিচ’–এর মতো চলচ্চিত্র দর্শকের সামনে প্রথম দেখার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। তাই টেলুরাইডে কোনো সিনেমা দেখার অর্থ শুধু সিনেমাটি দেখা নয়। এটি হলো—সিনেমাটি আবিষ্কার করার মুহূর্তটির অংশ হয়ে ওঠাও।
এবারের উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম ‘রেবেকা হল’।
ব্রিটিশ-আমেরিকান অভিনেত্রী, লেখক ও পরিচালক রেবেকা হলকে ২০২৬ সালের ‘গেস্ট ডিরেক্টর’ করা হয়েছে। তিনি উৎসবের জন্য ছয়টি সিনেমা নির্বাচন করবেন। তবে সেই ছয়টি সিনেমার নামও আগেভাগে জানানো হবে না।
‘গেস্ট ডিরেক্টর’ টেলুরাইডের একটি পুরোনো ঐতিহ্য। প্রতিবছর একজন চলচ্চিত্রপ্রেমী শিল্পীকে উৎসবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তিনি নিজের পছন্দের সিনেমা নিয়ে আসেন। ফলে উৎসবের নতুন সিনেমাগুলোর পাশাপাশি একটি ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র-ইতিহাসও তৈরি হয়। রেবেকা হলের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয়।
তিনি নিজে অভিনেত্রী। ‘দ্য প্রেস্টিজ’, ‘ভিকি ক্রিস্টিনা বার্সেলোন’, ‘ক্রিস্টিন’ কিংবা ‘প্যাসি’–এর মতো কাজের মধ্য দিয়ে তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণ ও করেছেন। ফলে তার নির্বাচিত ছয়টি সিনেমার মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি হবে—অভিনয়, স্মৃতি, নারী-অভিজ্ঞতা, নির্মাণশৈলী, নাকি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ—তা জানার জন্য অপেক্ষা থাকছে সবার মধ্যে। টেলুরাইডের ভাষায়, ‘গেস্ট ডিরেক্টর’ শুধু অতিথি নন। তিনি উৎসবের অনুষ্ঠান পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।
২০২৬ সালের উৎসবের আরেকটি দৃশ্যমান পরিচয় তৈরি করেছেন ব্রিটিশ ডিজাইনার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক কিউরেটর ‘বেলা ফ্রয়েড’। তিনি এবারের উৎসবের পোস্টার শিল্পী।
ফ্যাশন, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা ফ্রয়েড তার পোশাকের ডিজাইনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ‘গিন্সবার্গ ইজ গড’ ও ‘১৯৭০’–এর মতো শব্দ-নির্ভর ডিজাইন তার কাজকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।টেলুরাইডের জন্য তিনি যে পোস্টার তৈরি করেছেন, সেটিও কেবল একটি উৎসবের বিজ্ঞাপন নয়। এর মধ্যে উৎসবটির নিজস্ব ধারণা—কৌতূহল, রহস্য, সংস্কৃতি ও গল্পের প্রতি আকর্ষণ—ধরার চেষ্টা রয়েছে।
ফ্রয়েডের নিজের ভাষায়, চলচ্চিত্র আধুনিক পুরাণের মতো; আর টেলুরাইড এমন একটি জায়গা, যেখানে একটি কথোপকথন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। এখানে আবার সেই একই বিষয় ফিরে আসে। অপেক্ষা।
টেলুরাইড নিজেকে প্রতিযোগিতামূলক উৎসব হিসেবে দেখে না। এখানে মূল লক্ষ্য পুরস্কার দেওয়া নয়; বরং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকে পাশাপাশি নিয়ে আসা। এ কারণেই উৎসবের ভেতরে নতুন সিনেমার সঙ্গে পুরোনো সিনেমারও দেখা হয়। একদিকে নতুন পরিচালক। অন্যদিকে বহু বছর আগে তৈরি কোনো সিনেমা, যা হয়তো দর্শকের চোখের আড়ালে চলে গিয়েছিল।
একটি পুনরুদ্ধার করা নীরব চলচ্চিত্র। তার পাশে সদ্য নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি। একজন তরুণ চলচ্চিত্রকার। তার কয়েক সারি দূরে বসে থাকা এমন একজন পরিচালক, যিনি কয়েক দশক ধরে সিনেমা বানাচ্ছেন। টেলুরাইডের সৌন্দর্য সম্ভবত এই পাশাপাশি বসার মধ্যেই।
উৎসবের অফিসিয়াল বর্ণনাতেও বলা হয়েছে, এখানে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মানুষ গুরুত্বপূর্ণ—পরিচালক, অভিনেতা, গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং দর্শক। নির্ধারিত আলোচনার বাইরে রাস্তায়, লাইনে দাঁড়িয়ে, সিনেমা হলের সামনে তাদের কথোপকথনও উৎসবের অংশ হয়ে ওঠে।
টেলুরাইডের আরেকটি অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। এটি নিজে বড় প্রতিযোগিতামূলক পুরস্কারের উৎসব না হয়েও পুরস্কারের মৌসুমে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এখানে সিনেমা প্রথমে দর্শকের কাছে যায়। কোনো ছবি দেখে হল থেকে বেরিয়ে কয়েকজন মানুষ কথা বলতে শুরু করল। তারপর সেই কথায় আরও মানুষ যোগ দিল। পরের দিন সাংবাদিকেরা লিখলেন। পরের সপ্তাহে টরন্টোতে সিনেমাটি নিয়ে আরও আলোচনা হলো। তারপর শুরু হলো পুরস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুমান।
এইভাবে একটি ছোট পাহাড়ি শহর থেকে কোনো চলচ্চিত্রের যাত্রা অনেক দূরের পথ চলার শুরু হয়।
২০২৬ সালেও টেলুরাইড, ভেনিস ও টরন্টো—সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকের চলচ্চিত্র মৌসুমে পরপর আসা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। স্ক্রিন-এর ২০২৬ উৎসব ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ভেনিস ২–১২ সেপ্টেম্বর, টেলুরাইড ৩–৭ সেপ্টেম্বর এবং টরন্টো ১০–২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে; টেলুরাইডের নিজস্ব সাইট অবশ্য ৪–৭ সেপ্টেম্বরকে ৫৩তম উৎসবের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ক্যালেন্ডারই বলে দেয়, টেলুরাইড কেন গুরুত্বপূর্ণ। ভেনিসের পর্দা উঠবে। টেলুরাইড তার দরজা খুলবে। তারপর টরন্টো আসবে। তিনটি শহর। তিন ধরনের দর্শক। তিন ধরনের চলচ্চিত্র-পরিবেশ। আর মাঝখানে একটি ছোট পাহাড়ি শহর, যে তার সিনেমার তালিকা কাউকে বলে না।
কেন এই গোপনীয়তা? প্রশ্নটি সহজ। কিন্তু উত্তরটি একটু অদ্ভুত। সম্ভবত টেলুরাইড মনে করে, সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা শুরু হওয়ার আগেই যদি আমরা সিনেমা সম্পর্কে অতিরিক্ত কিছু জেনে যাই, তাহলে দেখার অভিজ্ঞতার অনুভূতিটি হারিয়ে যায়। আমরা তখন চরিত্রের চেয়ে অভিনেতাকে দেখি। দৃশ্যের চেয়ে ট্রেলার মনে রাখি। গল্পের বদলে আগের সমালোচনা মাথায় রাখি। টেলুরাইড সেই প্রস্তুত দৃষ্টিটাকে একটু সরিয়ে দিতে চায়।
আপনি জানেন না। তাই আপনি দেখেন। এই অজ্ঞতা এখানে দুর্বলতা নয়। এটি অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৪ সেপ্টেম্বর উৎসব শুরু হবে। ৭ সেপ্টেম্বর শেষ হবে। তারপর মানুষ চলে যাবে। স্ক্রিনগুলো খুলে ফেলা হবে। অস্থায়ী কাঠামো সরবে। শহর আবার ছোট হয়ে যাবে। যে রাস্তায় কয়েক দিন ধরে সিনেমা নিয়ে কথা হচ্ছিল, সেখানে আবার পাহাড়ের বাতাস থাকবে। কিন্তু কিছু জিনিস থেকে যাবে। কোনো সিনেমার দৃশ্য। কোনো পরিচালকের একটি বাক্য। কোনো পুরোনো চলচ্চিত্রের পুনরাবিষ্কার।
কিংবা এমন একটি সিনেমা, যার নাম উৎসবে ঢোকার আগে কেউ জানত না। টেলুরাইডের নিজস্ব দর্শন এখানেই। চলচ্চিত্র উৎসব মানে শুধু একটি তালিকা নয়। এটি একটি জায়গা। একটি সময়। একটি অপেক্ষা। আর কখনো কখনো, একটি অন্ধকার ঘরে বসে হঠাৎ বুঝতে পারা—এই ছবিটি দেখার জন্যই হয়তো এত দূর আসা।
২০২৬ সালের টেলুরাইড সেই অপেক্ষাটিই আবার তৈরি করতে যাচ্ছে। পাহাড় থাকবে। শহর থাকবে। দর্শক আসবে।রেবেকা হল তার ছয়টি গোপন সিনেমা নিয়ে আসবেন। বেলা ফ্রয়েডের পোস্টার শহরের কোথাও ঝুলবে। আর সিনেমার তালিকা? সেটি তখনও বলা হবে না। কারণ টেলুরাইডে প্রথমে আপনাকে যেতে হবে। তারপর সিনেমা আপনাকে খুঁজে নিবে।
আরো বিস্তারিত জানতে ঘুরে আসুন: https://www.telluridefilmfestival.org/


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









