হয়তো কাঁপছে। লিডোর সমুদ্রের হাওয়ায়, পুরোনো প্রাসাদের দেয়ালে, পালাজ্জো দেল সিনেমার অন্ধকার হলঘরে—কোথাও না কোথাও সেই শব্দ এখনো আটকে আছে। সিনেমা শেষ হয়, পর্দা কালো হয়ে আসে, নামগুলো একে একে ভেসে ওঠে, আর মানুষ হাততালি দিতে থাকে। এক মিনিট, দুই মিনিট, দশ মিনিট। কখনো তারও বেশি। অভিনেতারা দাঁড়িয়ে থাকেন। পরিচালকও। হাসেন, হাত নাড়েন, মাথা ঝোঁকান। তারপর একটু অস্বস্তিতে পড়েন—এতক্ষণ ধরে এই ভালোবাসার সঙ্গে কী করা যায়?
এও এক ধরনের বিপদ। সুখের বিপদ। ইতালির ভাষায় হয়তো তাকে অ্যাপেরল স্প্রিৎসের মতো হালকা করে বলা যায়।
জন মালকোভিচ, স্যাম রকওয়েল আর পরিচালক মার্টিন ম্যাকডোনা সেই বিপদের মধ্যে পড়েছিলেন। তাদের ডার্ক কমেডি ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’ দেখানোর পর ১৩ মিনিট ধরে করতালি চলেছে। লিডোর বিখ্যাত সিনেমা প্রাসাদের ভেতর দাঁড়িয়ে সবাই হাততালি দিয়েছে।
কিন্তু ভেনিসে হাততালিরও যেন নিজস্ব প্রতিযোগিতা আছে। পরে পেনেলোপে ক্রুজ ও হাভিয়ের বারদেমের দাম্পত্য সংকটের গল্প ‘বাঙ্কার’ পেয়েছে ১৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের অভ্যর্থনা। আর গাজা নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘নাজা’—তার জন্য করতালি থামেনি ২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত। এত দীর্ঘ করতালি আগে কখনো শোনা যায়নি, অন্তত যতদিন সাংবাদিকেরা তার হিসাব রাখতে শুরু করেছেন।
হলিউড চলচ্চিত্র উৎসব থেকে দূরে সরে গেছে—এই কথাও শোনা যায়। কিন্তু ভেনিসে তারকার অভাব ছিল না। রবার্ট প্যাটিনসন, ক্রুজ, বারদেম, ওয়েসিসের লিয়াম ও নোয়েল গ্যালাঘার—সবাই এসেছিলেন। কেউ পুরস্কারের আশায়, কেউ দর্শকের ভালোবাসার জন্য, কেউবা শুধু সিনেমার আলোয় নিজের মুখটিকে আরেকবার দেখতে।
এখন উৎসব শেষ। শেষ পাস্তা, শেষ অ্যাপেরল স্প্রিৎস, শেষ রাতের ভিড়। ভেনিস থেকে ফিরে তাকালে কয়েকটি ছবি বারবার মনে পড়ে।
জর্জ ক্লুনি, সিনেমা ছাড়াই সিনেমার কেন্দ্রে
জর্জ ক্লুনি কোনো নতুন সিনেমা নিয়ে ভেনিসে আসেননি। তবু উৎসবের প্রায় প্রতিটি কথোপকথনে তার উপস্থিতি ছিল। যেন সিনেমা না থাকলেও একজন তারকা নিজের আলো নিয়ে চলতে পারেন। তিনি এসেছিলেন গোল্ডেন লায়ন ফর লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট নিতে—জীবনভর কাজের সম্মাননা। ঘটনাটি খানিকটা কৌতুকময়ও। গত বছরের ‘জে কেলি’ সিনেমায় ক্লুনি অভিনয় করেছিলেন এমন এক চলচ্চিত্র তারকার চরিত্রে, যিনি ইতালিতে ক্যারিয়ারের সম্মান নিতে আসেন। এবার বাস্তবের ক্লুনি যেন নিজের সিনেমারই একটি দৃশ্যের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন।
প্রেস কনফারেন্সে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, মাস্টারক্লাসে—তাকে দেখা গেল। তিনি বললেন শিল্পের শক্তির কথা, অস্থির সময়ে শিল্পের প্রয়োজনের কথা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা। বললেন গণতন্ত্রের ভঙ্গুর হয়ে পড়ার কথাও। আর একটি শব্দ উপহার দিলেন দর্শকদের—‘কাকিস্টোক্রেসি’। এমন এক দেশ, যেখানে সবচেয়ে অযোগ্য মানুষগুলো শাসন করে।
ক্লুনি বললেন, “আমার মনে হয়, আমরা হয়তো এখন এমন এক কাকিস্টোক্রেসির মধ্যেই আছি। তবে আমরা এর মধ্য দিয়েও বেরিয়ে আসব।” কথাটি শুনে মনে হয়, সিনেমা শেষ হয়ে গেলেও অভিনেতারা কখনো কখনো চরিত্রের বাইরে এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলেন।
জন মালকোভিচের দিকে এবার অস্কারের আলো
জন মালকোভিচকে আবার দেখা যাবে। শুধু সিনেমার পর্দায় নয়, পুরস্কারের আলোচনাতেও। ‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’–এ তিনি অভিনয় করেছেন এক অদ্ভুত স্বভাবের সিআইএ এজেন্টের চরিত্রে। লোকটি নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকায়। কত কিছু পেরিয়ে এসেছে মানুষটি, কত কিছু হারিয়েছে, কত কিছু হয়তো কখনো বুঝতেই পারেনি।
মার্টিন ম্যাকডোনার সঙ্গে কাজ করলে অভিনেতাদের ভাগ্যে অস্কারের দরজা খুলে যেতে পারে—এমন ইতিহাস আছে। ‘থ্রি বিলবোর্ডস আউটসাইড এবিং, মিসৌরি’–র জন্য স্যাম রকওয়েল ও ফ্রান্সেস ম্যাকডরম্যান্ড অস্কার পেয়েছিলেন। ‘দ্য বানশিজ অব ইনিশেরিন’–এর জন্য কলিন ফ্যারেল ও ব্রেন্ডন গ্লিসন মনোনীত হয়েছিলেন।
দুটো সিনেমার শুরুই হয়েছিল ভেনিসে। মালকোভিচের শেষ অস্কার মনোনয়ন এসেছিল ১৯৯৩ সালে, ‘ইন দ্য লাইন অব ফায়ার’ সিনেমার জন্য। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এতদিনে মানুষের চোখে তার অভিনয় যেন আরও গভীর হয়েছে, অথবা আমরা তাকে নতুন করে দেখতে শিখেছি। ম্যাট ডেমন, টম ক্রুজ—তাদের জন্যও এবার হয়তো দৌড়টা সহজ হবে না।
সিনেমা যখন রাজনীতির দিকে ফিরে তাকায়
এবারের ভেনিসকে উৎসবের শৈল্পিক পরিচালক আলবের্তো বারবেরা বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে রাজনৈতিক’ উৎসব। কথাটি বাড়িয়ে বলা মনে হয়নি। সিনেমাগুলো যেন পৃথিবীর দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমের ক্ষমতাবান মালিকদের নিয়ে ‘ইঙ্ক’, ডানপন্থী অনলাইন ট্রোলদের নিয়ে ‘মাস্ক’, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সংঘাত নিয়ে ‘নাজা’, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও সীমান্তরক্ষী সংস্থা আইসিইকে ঘিরে ‘দে আর হিয়ার’। পর্দায় যা ঘটেছে, হলের বাইরেও তার প্রতিধ্বনি ছিল।
অভিনেতা ও পরিচালকদের কাছে এখন আর শুধু সিনেমার গল্প জানতে চাওয়া হয় না। পৃথিবীর খবরও জানতে চাওয়া হয়। যুদ্ধ, রাষ্ট্র, ক্ষমতা, নীরবতা—সবকিছুর উত্তর যেন তাদের কাছেও চাওয়া হয়। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি সভাপতি ভিম ভেন্ডার্স নির্মাতাদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ভেনিস জুরির সভাপতি ম্যাগি জিলেনহাল তাতে একমত নন।
তিনি বললেন, সিনেমা ‘মৌলিকভাবেই এবং অনিবার্যভাবেই রাজনৈতিক।’ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত, সবচেয়ে বিকৃত মানুষদের গল্পও বলা দরকার—তার যুক্তি। কারণ, সেই গল্পের ভেতর দিয়েই হয়তো আমরা অন্য কাউকে বুঝতে শিখি। এমন কাউকে, যাকে বুঝতে চাই না, যার দিকে তাকানোও অস্বস্তিকর। সিনেমা কখনো কখনো সেই অস্বস্তির দরজাই খুলে দেয়।
নাজা এবং করতালির দীর্ঘতম রাত
দর্শকেরা রাজনীতি নিয়ে সিনেমা দেখতে আপত্তি করেননি। বরং তাদের হাততালিই তার প্রমাণ। ‘নাজা’ গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষদের হত্যার পেছনে থাকা ব্যবস্থাগুলো নিয়ে নির্মিত এক গভীর অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দূরনিয়ন্ত্রিত হত্যাকাণ্ড, তার প্রযুক্তি, তার কাঠামো—সিনেমাটি সেই অন্ধকারের দিকে তাকায়। প্রদর্শনী শেষে ২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড ধরে করতালি চলেছে।
গত বছরের গাজাভিত্তিক সিনেমা ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’–এর অভ্যর্থনাকেও ছাড়িয়ে গেছে এই সময়। ২০০৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘প্যান’স ল্যাবিরিন্থ’ও ২২ মিনিটের করতালি পেয়েছিল। ‘নাজা’র চার নির্মাতার মধ্যে আছেন ইসরায়েলি পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর। ২০২৫ সালে ‘নো আদার ল্যান্ড’ সিনেমার জন্য তাঁরা অস্কার জিতেছিলেন।
এবার কি তারা আবার পুরস্কারের আলোচনায় ফিরবেন?
প্রশ্নটির উত্তর এখনো অজানা। কিন্তু ভেনিসের দর্শকের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দিয়েছে, এই সিনেমা কেবল একটি সিনেমা হয়ে থাকেনি। তার ভেতর দিয়ে দর্শকেরা নিজেদের সময়কে চিনতে চেয়েছেন।
নারীরা কোথায়?
উৎসবের জুরি সভাপতি একজন নারী। কিন্তু মূল প্রতিযোগিতায় নারী পরিচালকদের উপস্থিতি খুবই কম। গোল্ডেন লায়নের প্রতিযোগিতায় থাকা সিনেমাগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি নারী পরিচালিত—মে এল-তুকরির ‘ওম্যান আননোন’ এবং র্যাচেল সোরের সহ-পরিচালিত ‘নাজা’।
ম্যাগি জিলেনহালও বিষয়টি নিয়ে বিস্মিত। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, “মনে হচ্ছে অবশেষে সবাই বুঝে গেছে, পুরুষেরাই নারীদের চেয়ে ভালো সিনেমা বানায়।” তারপর হাসির আড়াল সরিয়ে তিনি বললেন আসল কথাটি।
সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগত। নারীদের জন্য চলচ্চিত্রের অর্থায়ন পাওয়া কঠিন। তাঁদের কাজ শুরু করার আগেই অনেক দরজা বন্ধ হয়ে থাকে। একটি উৎসবের তালিকায় নারী কম—এটি শুধু একটি সংখ্যার সমস্যা নয়। এর পেছনে আছে ক্ষমতা, অর্থ, সুযোগ এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
ল্যান্স ওপেনহাইমের নতুন সকাল
ল্যান্স ওপেনহাইমের বয়স মাত্র ৩০। তথ্যভিত্তিক কাজ ‘সাম কাইন্ড অব হেভেন’ ও এইচবিওর ‘রেন ফেয়ার’–এর জন্য পরিচিত এই পরিচালক এবার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা নিয়ে ভেনিসে এসেছেন। এ২৪ প্রযোজিত ‘প্রাইমটাইম’ ছিল উৎসবের অন্যতম আলোচিত ছবি।
রবার্ট প্যাটিনসনের অভিনয় দর্শকদের টেনে নিয়েছে। তিনি অভিনয় করেছেন ‘টু ক্যাচ আ প্রিডেটর’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ক্রিস হ্যানসেনের চরিত্রে। চরিত্রটির ভেতরে ঢুকে যাওয়ার সেই অভিনয় দেখে দর্শকেরা সাত মিনিট ধরে হাততালি দিয়েছেন।
কিন্তু ওপেনহাইমের সপ্তাহটি সেখানেই শেষ হয়নি। পরদিন কলোরাডোতে নাথান ফিল্ডারের সঙ্গে তিনি প্রকাশ করেন গোপন রাখা তথ্যচিত্র ‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’। থেরানোস প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ হোমসকে নিয়ে তৈরি সিনেমাটি টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসবেও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, তরুণ পরিচালকের জন্য এটি কেবল শুরু। সামনে আরও অনেক লালগালিচা, আরও অনেক উৎসব, আরও অনেক আলো। টাক্সেডোটি তাই হয়তো আগামী কয়েক মাস আলমারিতে পড়ে থাকবে না।
এবার তারকাদের হাতে সিনেমার চেয়েও জরুরি ছিল হাতপাখা
ভেনিসের গরম এবার সবাইকে সমান করে দিয়েছিল। তারকারা, পরিচালক, দর্শক—সবাই ঘামছিলেন। লালগালিচায় দাঁড়িয়ে থাকা পোশাকের জৌলুসের নিচে শরীরের অস্বস্তি লুকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই বছরের সবচেয়ে দরকারি অনুষঙ্গ তাই দামি গয়না নয়, হাতপাখা। ‘ইঙ্ক’ সিনেমার প্রদর্শনীতে জ্যাক ও’কনেল তার ভারী ডানহিল কোট খুলে ফেলতে বাধ্য হন। মুখ ও জামার ঘাম মুছতে দেখা যায় তাকে।
‘ওয়াইল্ড হর্স নাইন’–এর দীর্ঘ করতালির সময় পার্কার পোসি একটি নকশাদার হাতপাখা নাড়তে নাড়তে নিজেকে ঠান্ডা রাখছিলেন। তার ঠোঁটের নড়াচড়ায় যেন বোঝা যাচ্ছিল—গরমটা সত্যিই অসহ্য। আর রবার্ট প্যাটিনসন? সাদা পোশাকে, পরিপাটি, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর আগে ন্যাপকিন দিয়ে কপালের ঘাম মুছছিলেন।
তারকারাও শেষ পর্যন্ত মানুষ। তাদেরও ঘাম হয়, গরম লাগে, দীর্ঘ করতালির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয়। ভেনিসের শেষ ছবিটা তাই হয়তো খুব বড় কোনো তারকার নয়। বরং একজন অভিনেতার কপালে জমে থাকা ঘামের ছোট্ট রেখা। সিনেমা যতই দূরের পৃথিবীর কথা বলুক, তার শেষে মানুষই থেকে যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









