একটি বই প্রকাশিত হওয়ার আগেই তার ভাগ্য কখনো কখনো নির্ধারিত হয়ে যায়। বইটি ভালো কি না, সেটি এক প্রশ্ন। কিন্তু বইটি প্রকাশের সময় রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক কি না, সেটি আরেক প্রশ্ন। জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’–এর ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছিল।
১৯৪৪ সালের ১৩ জুলাই। সে সময় টি. এস. এলিয়ট ছিলেন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ফ্যাবার অ্যান্ড ফ্যাবারের পরিচালক। তিনি জর্জ অরওয়েলকে চিঠি লিখে জানালেন, তার প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ প্রকাশ করবে না। চিঠির শুরুটা ছিল ভদ্র— ডিয়ার অরওয়েল’। এলিয়ট বইটির গুণও স্বীকার করেছিলেন। তার মতে, এটি ‘উল্লেখযোগ্য একটি লেখা’; রূপককাহিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নির্মিত, আর গল্পটি নিজস্ব গতিতে পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখে। গার্লিভারস ট্রাভেলস–এর পর এতটা দক্ষতার সঙ্গে এমন কাজ খুব কম লেখকই করতে পেরেছেন বলেও তিনি মনে করেছিলেন।
কিন্তু ভালো লেখা হলেই তো প্রকাশ করা যায় না। বিশেষ করে বইয়ের বিষয় যখন রাজনীতি। ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ ছিল একটি পশুকেন্দ্রিক রূপককাহিনি। খামারের পশুরা মানুষের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তারা এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখে, যেখানে শোষণ থাকবে না। কিন্তু ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত চলে যায় শূকরদের হাতে। তাদের নেতা নেপোলিয়ন ধীরে ধীরে সেই একই নিপীড়ন ও বৈষম্য ফিরিয়ে আনে, যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়েছিল। অরওয়েলের রূপকটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের স্তালিনবাদী ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা।

কিন্তু ১৯৪৪ সালে ব্রিটেন তখন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র। ফলে সোভিয়েত শাসনের সমালোচনা করা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর ছিল। এলিয়টের আপত্তি ছিল শুধু রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নয়। তিনি মনে করেছিলেন, অরওয়েলের গল্পটি মূলত নেতিবাচক। এতে যে ব্যবস্থার সমালোচনা করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আপত্তি আছে; কিন্তু তার বদলে কী চাওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে যথেষ্ট ইতিবাচক ধারণা নেই। এলিয়ট লিখেছিলেন, বইটি পাঠকের মধ্যে শুধু কোনো কিছুর বিরুদ্ধে আপত্তি তৈরি করলে হবে না; লেখক যে সমাজব্যবস্থা চান, তার প্রতিও পাঠকের কিছুটা সহানুভূতি তৈরি হওয়া দরকার। তার চোখে অরওয়েলের ইতিবাচক রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অনেকটা ট্রটস্কিবাদী, কিন্তু সেটি তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। এরপর এলিয়ট একটি অদ্ভুত যুক্তি দেন। খামারের শূকরগুলো অন্য পশুদের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। ফলে খামার চালানোর জন্য তারাই সবচেয়ে যোগ্য—এমন যুক্তি তো দেওয়া যেত। তাহলে সমস্যার সমাধান আরও বেশি কমিউনিজম নয়; বরং দরকার ছিল ‘আরও জনকল্যাণমুখী শূকর’।
বাক্যটি আজ পড়লে ব্যঙ্গাত্মক মনে হতে পারে। কিন্তু তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর তাৎপর্য ছিল অন্য রকম। অরওয়েল যে প্রশ্ন তুলেছিলেন—ক্ষমতা হাতে পেলে বিপ্লবীরাও কীভাবে শাসকে পরিণত হয়—এলিয়ট সেই প্রশ্নের অন্য উত্তর খুঁজছিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ প্রকাশ করে সেকার অ্যান্ড ওয়ারবার্গ, ১৯৪৫ সালের আগস্টে। বইটি প্রকাশের একেবারে শুরুতে অরওয়েল নিজেই জানতেন, এটি ছাপা সহজ হবে না। ১৯৪৩ সালে বইটি লেখার সময় তিনি বুঝেছিলেন, এটি প্রকাশ করাতে বড় ধরনের সমস্যা হবে। পরে লেখা এক ভূমিকায় তিনি আরও সরাসরি বলেছিলেন, লেখক ও সাংবাদিকের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ সব সময় রাষ্ট্রের মামলা নয়; অনেক সময় সমাজের প্রচলিত মতই শক্তিশালী বাধা। অরওয়েলের অভিযোগ ছিল, প্রকাশক ও সম্পাদকরা অনেক বিষয় ছাপতে ভয় পান শুধু আইনের ভয়ে নয়, জনমতের ভয়ে। তার ভাষায়, একটি সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক কাপুরুষতাই লেখকের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠতে পারে।
তখনকার ব্রিটেনে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি এক ধরনের প্রচলিত সহানুভূতি ছিল। অরওয়েলের মতে, সেই পরিবেশে সোভিয়েত শাসনের গুরুতর সমালোচনা প্রায় অপ্রকাশযোগ্য হয়ে উঠেছিল। সরকার যে তথ্য গোপন রাখতে চায়, তা প্রকাশ করা কিংবা সেই ব্যবস্থার সমালোচনা করা—দুটিই বিপজ্জনক ছিল। আজ ব্রিটিশ লাইব্রেরি সেই সময়ের কিছু নথি ডিজিটাল করে সবার জন্য উন্মুক্ত করেছে। এর মধ্যে এলিয়টের অরওয়েলকে লেখা চিঠিও রয়েছে। ফলে এখন শুধু ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ পড়াই সম্ভব নয়; বইটি প্রকাশের আগে যে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, তার দলিলও দেখা যাচ্ছে। এই সংগ্রহে রয়েছে ২০ শতকের তিন শতাধিক সাহিত্যিক নথি—খসড়া, ডায়েরি, চিঠি ও নোটবুক।
লেখকদের মধ্যে আছেন ভার্জিনিয়া উলফ, অ্যাঞ্জেলা কার্টার ও টেড হিউজ। অরওয়েল একমাত্র বড় লেখক ছিলেন না, যাকে প্রকাশের দরজায় বারবার ফিরতে হয়েছিল। জেমস জয়েসের ‘এ পোর্ট্রেট অব দি আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়াং ম্যান’–এর ক্ষেত্রেও ছিল একই সমস্যা। জয়েসের উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ‘দি ইগোয়িস্ট’ পত্রিকায়। পরে তার পৃষ্ঠপোষক হারিয়েট শ’ উইভার বইটি মুদ্রণের জন্য একজন ছাপাখানার মালিকের পর একজনের কাছে গিয়েছেন। কেউ বলেছেন, বইটি হয়তো ধ্রুপদি সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু তার “সন্দেহজনক” অংশের কারণে তারা এটি ছাপবেন না। অন্য একজন পরামর্শ দিয়েছিলেন, আপত্তিকর বলে বিবেচিত কিছু অনুচ্ছেদ বাদ দিলে হয়তো বইটি ছাপা সম্ভব।

তখনকার ব্রিটিশ আইনে কোনো বই আপত্তিকর বলে বিবেচিত হলে শুধু প্রকাশক নয়, ছাপাখানাকেও দায়ী করা যেত। ফলে ছাপাখানার মালিকদের ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রকাশক বি. ডব্লিউ. হিউবশ জয়েসের বইটি ছাপতে রাজি হন। ভার্জিনিয়া উলফের একটি চিঠিও এই সংগ্রহে রয়েছে। ১৯১৮ সালে তিনি ‘ইউলিসিস’ প্রকাশের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, বইটির দৈর্ঘ্য তাদের জন্য বড় সমস্যা। তাদের প্রকাশনার গতি এত ধীর ছিল যে ৩০০ পৃষ্ঠার একটি বই ছাপতেই অন্তত দুই বছর লেগে যেত। ফলে জয়েসের বই প্রকাশ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
এই চিঠিগুলো আমাদের সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কে একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়। বড় বই সব সময় বড় হয়ে জন্মায় না। অনেক সময় তার সামনে থাকে প্রকাশকের ভয়, সমাজের চাপ, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং প্রচলিত মতের অদৃশ্য দেয়াল।
‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু তার আগে এলিয়টের ‘না’ তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। সেই প্রত্যাখ্যান আজ ইতিহাসের একটি ছোট দলিল। আর সেই দলিল আমাদের দেখায়—একটি সমাজে শুধু সেন্সরশিপই লেখাকে থামায় না; কখনো কখনো ভদ্রতা, ভয় এবং প্রচলিত মতও একই কাজ করে। ব্রিটিশ লাইব্রেরির ডিজিটাল আর্কাইভে এসব নথি এখন সারা বিশ্বের পাঠকের জন্য উন্মুক্ত। একসময় যেসব চিঠি দেখতে হলে লাইব্রেরির পাঠকক্ষে যেতে হতো, এখন সেগুলো ইন্টারনেটেই পড়া যায়। সাহিত্যের ইতিহাস তাই আর শুধু বইয়ের ইতিহাস নয়; এটি প্রত্যাখ্যাত বই, ভীত প্রকাশক এবং এমন সব চিঠির ইতিহাসও—যেগুলো প্রকাশের আগে একটি বইকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









