পাকিস্তানি ধারাবাহিক ‘দার-ই-নাজাত’-এ জামিল চরিত্রে অভিনয় করে আলোচনায় এসেছেন নামির খান। প্রেমিকার প্রতি ঈর্ষা, প্রতিশোধপরায়ণতা আর সম্পর্কের প্রতি অসম্মান—সব মিলিয়ে জামিল দর্শকের অপছন্দের এক চরিত্র। অথচ বাস্তবে নামিরকে দেখে তার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।
করাচির একটি হোটেলকক্ষে তার সঙ্গে দেখা। ধারাবাহিকটির জনপ্রিয়তার কারণে বাইরে বের হলে অনাকাঙ্ক্ষিত মনোযোগের মুখে পড়তে হতে পারে, তাই এই আয়োজন। সংযত কথাবার্তা, চিন্তাশীল উত্তর আর সহজাত আকর্ষণে নামির পর্দার জামিলের চেয়ে অনেক আলাদা।
জামিলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক জারিয়াবের (দুরে ফিশান সেলিম)। কিন্তু জারিয়াব যখন ধর্মপরায়ণ আবু বকরের (শেহরিয়ার মুনাওয়ার) সঙ্গে পরিচিত হয় এবং পরে তাকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, জামিল প্রতিশোধ নিতে আবু বকরের মনে জারিয়াবের বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরি করতে চায়। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সফল হয় না।
নামিরের অভিনয়জীবনের চরিত্রগুলোতে এমন নৈতিক দ্বন্দ্বের উপস্থিতি লক্ষণীয়। ২০২৩ সালে ‘ম্যায়’ দিয়ে টেলিভিশনে অভিষেকের পর তিনি অভিনয় করেছেন ‘কারজ-এ-জান’, ‘ম্যায় মান্টো নেহি হুঁ’ ও ‘এইক অউর পাকিজা’-তে। কখনো পার্শ্বচরিত্রে, কখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়—প্রতিবারই চরিত্রের জটিলতা তাকে আলাদা করে চিনিয়েছে।
‘কারজ-এ-জান’-এ আম্মার বখতিয়ার ছিল বখে যাওয়া এক তরুণ, যে শেষ পর্যন্ত কারাগারে যায়। তার একটি স্বগতোক্তি দর্শকের মনে দাগ কাটে। ‘ম্যায় মান্টো নেহি হুঁ’-তে অভিনয় করেছেন বড় তারকাদের পাশে। সেখানে সাজাল আলীর বড় ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করায় তার কিছু ভক্ত হতাশ হয়েছিলেন। তবে নামিরের মতে, সেই অভিজ্ঞতা তাকে বিনোদনজগতের বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করেছে।

নামির বলেন, ‘যেসব চরিত্রের ভেতরে দ্বন্দ্ব আছে, তাদের সঙ্গে আমি সহজে সংযোগ তৈরি করতে পারি। বাস্তবে কেউই পুরোপুরি ভালো বা মন্দ নয়—আমরা সবাই ধূসর। এ ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ বেশি, চ্যালেঞ্জও বেশি। আমি চাই, এই শিল্প আমাকে একজন শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী হিসেবে চিনুক।’
তার অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে নিজের সবচেয়ে কাছের মনে হয় ‘এইক অউর পাকিজা’-র ফারাজকে। ‘এটি আমার অভিনয়জীবনের সবচেয়ে কঠিন চরিত্রও ছিল,’ বলেন তিনি। ফারাজের সঙ্গে নামিরের জীবনের মিল আছে। দুজনই লাহোরে বড় হয়েছেন, দুজনকেই নিজের জায়গা তৈরি করতে প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে যেতে হয়েছে।
জামিলকে ঘিরে দর্শকের প্রতিক্রিয়া অবশ্য ভিন্ন। চরিত্রটির আচরণ নিয়ে নামির নিজেও প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষদের শ্রদ্ধাশীল, সৎ ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সমালোচনা তাকে বিচলিত করে না। তার ভাষায়, ‘জনপ্রিয়তা কিংবা সমালোচনা—কোনোটাই আমাকে খুব একটা প্রভাবিত করে না। নিজের শক্তি ও দুর্বলতা দুটোই জানি। আমার জীবনের মূলমন্ত্র সহজ— কোনো কিছু যদি মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়, সেটাকে ছেড়ে দিন।’
প্রকৌশল থেকে অভিনয়ে
অভিনেতা হওয়ার পরিকল্পনা শুরুতে ছিল না নামিরের। তিনি সফটওয়্যার প্রকৌশল নিয়ে পড়েছেন। কানাডায় প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর পড়ার প্রথম সেমিস্টারে একা থাকতে থাকতে বুঝতে পারেন, বাঁধাধরা চাকরির জীবন তার জন্য নয়।
‘পড়াশোনা আর উবার চালানো ছাড়া বেশির ভাগ সময় একা কাটত। তখন নিজেকে নতুন করে চিনতে পারি। আমি স্বাধীনচেতা, বৈচিত্র্য ভালোবাসি। অভিনয় আমাকে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে বলে মনে হয়েছিল,’ বলেন তিনি।
২০২০ সালে পাকিস্তানে ফিরে বিনোদনজগতে কাজের চেষ্টা শুরু করেন। প্রথম তিন বছর অডিশনের সুযোগ খুব কম পেয়েছেন। ফ্যাশন ফটোশুট ও র্যাম্পে মডেলিং করে কিছুটা পরিচিতি পান। ২০২২ সালে হুম টিভি অ্যাওয়ার্ডস উপস্থাপনার পর সুযোগ বাড়তে থাকে। পরের বছর আসে প্রথম ধারাবাহিক ম্যায়। ফলে অনেকে তার ক্যারিয়ারকে তিন বছরের মনে করলেও, তার হিসাবে যাত্রাটি ছয় বছরের।
সফটওয়্যার প্রকৌশলের পড়াশোনা সরাসরি অভিনয়ে কাজে না লাগলেও কানাডায় থাকা এবং নানা সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে চরিত্র বুঝতে সাহায্য করেছে। আর্থিক স্বাবলম্বিতাও দিয়েছে নিজের পছন্দের বাইরে কোনো কাজ প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা।
পরিবারের সমর্থনও ছিল তার বড় শক্তি। নামির বলেন, ‘বাবা সব সময় বলতেন, আমি জানি নামির বোকামি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। পরিবারের এই আস্থা আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে সাহায্য করেছে।’
প্রাতিষ্ঠানিক অভিনয়-প্রশিক্ষণ নেই তার। অভিজ্ঞতা ও পরিচালকদের কাছ থেকেই শিখেছেন। বিশেষ করে ‘এইক অউর পাকিজা’-র পরিচালক কাশিফ নিসারের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার কথা জানান তিনি।
চরিত্রের প্রস্তুতিতে নামির পুরো চিত্রনাট্য পড়েন, চরিত্রের ব্যক্তিত্ব নিয়ে নোট নেন, এমনকি চরিত্রটি কী ধরনের গান শুনতে পারে, সেই অনুযায়ী গানের তালিকাও তৈরি করেন। চরিত্রের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে বেছে নেন সুগন্ধি—গরিব চরিত্রে সস্তা, ধনী চরিত্রে দামি।
‘দৃশ্যে সংলাপ আমার কাছে দ্বিতীয় বিষয়। চরিত্রটি কী ভাবছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তার চিন্তা বুঝতে পারলে তা চোখে ও প্রতিক্রিয়ায় ফুটে ওঠে। মানুষের কথার সঙ্গে চোখের ভাষার পার্থক্যও তাই স্বাভাবিক,’ বলেন তিনি।
জনপ্রিয়তার হিসাব
আয়েজা খান, ইয়ুমনা জায়েদি, সাজাল আলী, সেহর খান ও দুরে ফিশান সেলিমের মতো অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করেছেন নামির। তবে সহশিল্পী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো পরিকল্পনা ছিল না বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, ভালো পরিচালক ও চিত্রনাট্যই কাজ নির্বাচনের প্রধান বিবেচনা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব অবশ্য তিনি অস্বীকার করেন না। তার ভাষায়, বড় বাজেটের বা সৃজনশীল প্রকল্পে দক্ষতাই প্রধান; কিন্তু বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডের প্রচারণায় অনুসারীর সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিনয়ের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি অনলাইন উপস্থিতিও এখন ক্যারিয়ারের অংশ।
কাজের বাইরে প্রযুক্তিজগতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন নামির। ভবিষ্যতে ব্যবসায় নামার ইচ্ছাও আছে। পাকিস্তান ও কানাডার মধ্যে যাতায়াত করেন। আপাতত অভিনয়েই বেশি সময় দিচ্ছেন। একসময় কাজের সুযোগ ছিল না, তাই এখন সুযোগগুলো কাজে লাগাতে চান। দীর্ঘ মেয়াদে তাঁর লক্ষ্য আর্থিক নিরাপত্তা অর্জন, সুস্থ থাকা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।
নামির খাবারপ্রিয়; ইতালীয় খাবার, বার্গার, পিৎজা ও পাস্তা তার পছন্দের। ভ্রমণ ভালোবাসেন, একা কিংবা মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে। অবসরে গাড়ি চালানো, ক্রিকেট, স্নুকার এবং ধীরেসুস্থে সকাল শুরু করতে ভালো লাগে। শরীরচর্চাকে তিনি শুধু শারীরিক পরিবর্তনের জন্য নয়, মানসিক শক্তি বাড়ানোর উপায় হিসেবেও দেখেন।
অভিনেতা হিসেবে রণবীর কাপুর তার প্রিয়, বিশেষ করে চোখের অভিব্যক্তির জন্য। পরিচালক ইমতিয়াজ আলীর সঙ্গে কাজ করারও ইচ্ছা আছে। নিয়মিত বই পড়েন না, তবে আত্মোন্নয়নমূলক বইয়ের প্রতি আগ্রহ রয়েছে; সাধারণত ইউটিউবে সেসব বইয়ের সারসংক্ষেপ শোনেন।
নতুন চরিত্রের অপেক্ষায়
পরবর্তী কাজে নামিরকে দেখা যাবে হানিয়া আমিরের সঙ্গে। বদর মাহমুদ পরিচালিত এই প্রকল্পে তার চরিত্রটি আগের ভূমিকাগুলোর চেয়ে আলাদা। নামির বলেন, ‘এমন চরিত্র আগে করিনি। দর্শক তাকে কীভাবে গ্রহণ করেন, তা দেখার অপেক্ষায় আছি।’
একই ধরনের চরিত্রে আটকে না থাকতে তার কৌশলও সহজ—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রের সুযোগ আছে, এমন চিত্রনাট্য বেছে নেওয়া।
সাক্ষাৎকারের শেষে নামির নিজের ব্যক্তিত্বের এমন একটি দিকের কথা বলেন, যা পর্দার চরিত্রগুলোতে সব সময় দেখা যায় না। ‘আমার ভেতরে সহমর্মিতা আছে। আমি গভীরভাবে অনুভব করি এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করি—এমনকি তার সঙ্গে একমত না হলেও। হয়তো অভিনীত চরিত্রগুলোতে আমার এই দিকটা সব সময় প্রকাশ পায় না।’
পর্দায় জটিল, দ্বন্দ্বে ভরা পুরুষদের চরিত্রে পরিচিতি পাওয়া নামির খানের বাস্তব ব্যক্তিত্বের এই স্বীকারোক্তিই হয়তো তার সবচেয়ে আগ্রহজাগানিয়া দিক।
সূত্র: ডন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









