সমাজে মতাদর্শিক মেরুকরণ যত গভীর হচ্ছে, অন্যের জীবনযাপন, বিশ্বাস ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাও যেন তত প্রবল হয়ে উঠছে। প্রতিবেশীর সন্তান কীভাবে বড় হচ্ছে, পরিবারে ধর্মের ভূমিকা কতটা, কিংবা কোন মূল্যবোধে একজন মানুষ বিশ্বাস করবেন—এসব প্রশ্ন ক্রমেই ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে চলে আসছে। রোমানীয় চলচ্চিত্রকার ক্রিস্তিয়ান মুঙ্গিউর নতুন ছবি ‘ফিয়র্ড’ এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করতে যাচ্ছেন দর্শককে।
‘ফোর মান্থস, থ্রি উইকস অ্যান্ড টু ডেজ’ ছবির জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপামজয়ী মুঙ্গিউ এবার বেছে নিয়েছেন নরওয়ের প্রত্যন্ত এক জনপদকে। সেখানে বসবাস শুরু করে রোমানিয়া থেকে আসা একটি পরিবার। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সন্তান প্রতিপালনের ধরন এবং সামাজিক মূল্যবোধ স্থানীয় মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে মেলে না। ক্রমে এই সাংস্কৃতিক দূরত্ব রূপ নেয় আইনি সংঘাতে। পরিবারের সন্তানদের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায়। ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিশুর অধিকার, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সীমা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক।
মুঙ্গিউর সিনেমাটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন ভিন্নমত সহ্য করার সামাজিক পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সিনেমাটি দর্শকের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রাখে— যে মানুষের বিশ্বাস ও জীবনদর্শনের সঙ্গে আপনার মৌলিক মতবিরোধ রয়েছে, তার অধিকার রক্ষায়ও কি আপনি দাঁড়াবেন?

চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র লিসবেট (রেনাতে রেইনসভে) ও মিহাই ঘেওরগিউ (সেবাস্তিয়ান স্ট্যান)। পাঁচ সন্তানকে নিয়ে তারা সম্প্রতি রোমানিয়া থেকে নরওয়ের একটি ছোট শহরে এসেছেন। লিসবেটের জন্ম এই অঞ্চলে। ফলে স্থানীয় ভাষায় তার দক্ষতা স্বামীর চেয়ে বেশি। চলচ্চিত্রের এই ভাষাগত ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মিহাই অনেক কথাই পুরোপুরি বুঝতে পারেন না; নতুন সমাজের নিয়মকানুন ও মূল্যবোধও তার অপরিচিত।
পরিবারটি স্থানীয় সমাজের তুলনায় অনেক বেশি ধর্মপ্রাণ। সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন বা ইউটিউব তুলে দিতে তারা আগ্রহী নন। প্রতিদিন বাইবেল পাঠ তাদের পারিবারিক জীবনের অংশ। এমনকি ধর্মীয় পাঠের অগ্রগতি নির্ধারণে সন্তানদের জন্য রয়েছে পয়েন্টভিত্তিক ব্যবস্থা। প্রতিবেশীদের চোখে তাদের জীবনযাপন কিছুটা অস্বাভাবিক। স্কুলে মিহাই যখন পিয়ানোতে একটি ধর্মীয় সংগীত বাজান, তখন তাকে ধর্মীয় প্রচার না করতে বলা হয়—যদিও তার কাছে সেটি কেবল সংগীত পরিবেশন। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে স্কুলে বড় মেয়ে এলার শরীরে আঘাতের চিহ্ন নজরে আসার পর। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। মিহাই স্বীকার করেন, শাসন করতে কিংবা সন্তানদের বিপদ থেকে সরিয়ে রাখতে তিনি কখনো কখনো তাদের গায়ে হাত তুলেছেন। লিসবেটও জানান, রান্নাঘরে গরম পানি পড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনা এড়াতে কখনো সন্তানদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন।
রোমানিয়ার যে ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশে পরিবারটি এত দিন বসবাস করেছে, সেখানে সন্তানদের শাসনে এ ধরনের শারীরিক আচরণকে অনেকেই ভিন্নভাবে দেখেন। কিন্তু নরওয়ের সামাজিক ও আইনি কাঠামোয় বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা গুরুত্ব পায়। মিহাই যখন লিখিত বিবৃতিতে সন্তানদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার কথা স্বীকার করেন, তখনই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। কর্তৃপক্ষ পাঁচ সন্তানকে পরিবারের কাছ থেকে সরিয়ে পালক পরিবারের কাছে পাঠায়। এরপর ‘ফিয়র্ড’ আর কেবল একটি অভিবাসী পরিবারের সংকটের গল্প থাকে না। এটি হয়ে ওঠে আদালত, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং পারিবারিক অধিকারের সংঘাত নিয়ে নির্মিত রাজনৈতিক চলচ্চিত্র।
মুঙ্গিউ ছবিটিকে রহস্যকাহিনির মতো এগিয়ে নেননি। বরং তিনি দর্শককে একটি নৈতিক ও সামাজিক দ্বিধার মধ্যে আটকে রাখেন। মিহাইয়ের সন্তান প্রতিপালনের পদ্ধতি স্থানীয়দের মতো নয়—কিন্তু সেই পার্থক্য কি সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার মতো গুরুতর অপরাধ? আবার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দোহাই দিয়ে শারীরিক শাস্তিকে কি বৈধতা দেওয়া যায়? এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিহাইয়ের রক্ষণশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্বাস। তিনি মনে করেন, বিয়ে হওয়া উচিত কেবল নারী ও পুরুষের মধ্যে। ছবিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, স্কুলে তার এক সন্তানের মুখে বাবার এই মতামত শোনার পর থেকেই পরিবারটির প্রতি কর্তৃপক্ষের নজর আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। এখানেই ছবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য। পরিচালক দেখান, পরিবারটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে মিলে গেলে হয়তো তাদের জীবনযাপন নিয়ে এত প্রশ্ন উঠত না। রোমানিয়ায় যে আচরণগুলো সামাজিকভাবে পরিচিত বা গ্রহণযোগ্য, নরওয়েতে সেগুলোই হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় তদন্তের বিষয়।
তবে পরিচালক বিষয়টিকে সংস্কৃতির আপেক্ষিকতার সরল তত্ত্বে নামিয়ে আনেন না। শিশুদের ওপর নির্যাতনকে সাংস্কৃতিক পার্থক্যের অজুহাতে উপেক্ষা করা যায় না—এ কথাও ছবির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। বরং মুঙ্গিউর আগ্রহ, কোন পর্যায়ে সমাজের নৈতিক অবস্থান অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপের অধিকারে পরিণত হয়, তা অনুসন্ধান করা। এই জটিলতাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন দুই প্রধান অভিনেতা। লিসবেটের চরিত্রে রেনাতে রেইনসভে সংযত অভিনয় করেছেন। তার অভিনয়ে আতঙ্ক, অসহায়ত্ব কিংবা ক্ষোভের প্রকাশ কখনোই অতিনাটকীয় হয়ে ওঠে না। লিসবেট এমন একজন নারী, যিনি নিজের পরিবার সামলানোর পাশাপাশি আশপাশের মানুষের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকতে চান। কিন্তু তার এই মানবিক উদ্যোগও একসময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। একজন রোগীর মৃত্যুর পর ধর্মীয় বিশ্বাসের মাধ্যমে অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় প্রচারের অভিযোগে পরিণত হয়। প্রতিবেশী এবং পরে পরিবারের আইনজীবীর ভূমিকায় লিসা কারলেহেডও উল্লেখযোগ্য। জটিল আইনি পরিস্থিতির মধ্যে তার উপস্থিতি চলচ্চিত্রটিতে একধরনের স্থিরতা এনে দেয়।

তবে মিহাইয়ের চরিত্রে সেবাস্তিয়ান স্ট্যানের অভিনয় বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি চরিত্রটিকে প্রচলিত অর্থে নায়কোচিত করে তোলেননি। বরং একজন কঠোর, আত্মসংযমী এবং নিজের বিশ্বাসে অনড় মানুষের অন্তর্গত অস্থিরতা ফুটিয়ে তুলেছেন। সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তার ক্ষোভ ধীরে ধীরে জমতে থাকে। অনেক সময় ভাষা না বোঝার কারণে তাকে অনুবাদকের সাহায্য নিতে হয়। স্ট্যান এই অসহায়ত্বকে অতিরঞ্জিত করেন না; বরং চরিত্রটির মধ্যে জমে থাকা হতাশা ও ক্ষোভকে ধীরে ধীরে প্রকাশ করেন। মিহাইকে দর্শকের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টাও নেই পরিচালকের। তার বিশ্বাসের সঙ্গে একমত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বরং প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: কারও মতাদর্শ অপছন্দ হলেই কি তার মৌলিক অধিকার অস্বীকার করা যায়? যাদের সঙ্গে আমাদের বিশ্বাসের মিল রয়েছে, তাদের অধিকার রক্ষা করা সহজ। কিন্তু যাদের জীবনদর্শন আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য, তাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি বজায় রাখা অনেক কঠিন।
ছবিটির কিছু অংশে অবশ্য চরিত্রের চেয়ে তত্ত্ব ও রাজনৈতিক বক্তব্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হতে পারে। একটি প্রত্যন্ত জনপদের পারিবারিক বিরোধ ক্রমে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় পরিণত হলে গল্পের স্বাভাবিক আবহ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবু মুঙ্গিউর নির্মাণশৈলীর শক্তি তার সংযত মুহূর্তগুলোতে। যেমন, সন্তানকে হারানোর পর লিসবেট যখন বুঝতে পারেন, তার স্তনে আর শিশুটির জন্য দুধ তৈরি হচ্ছে না, তখন ছবিটি এক গভীর মানবিক মাত্রা অর্জন করে। মাতৃত্বের যে শারীরিক ও আবেগিক অভিজ্ঞতা তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিচ্ছেদের ফলে সেটিও যেন ভেঙে পড়ে।
এই দৃশ্যের শক্তি কোনো রাজনৈতিক যুক্তিতে নয়, বরং এক মায়ের ব্যক্তিগত বেদনায়। মতাদর্শ, ধর্ম, রাষ্ট্র কিংবা আইনের বিতর্কের বাইরে গিয়ে এটি দর্শককে এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা সংস্কৃতির বিভাজন অতিক্রম করতে পারে। ‘ফিয়র্ড’ কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেয় না। মুঙ্গিউও যেন শুরু থেকেই জানেন না, এই পরিবারের প্রতি তার নিজের অবস্থান ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। বরং গল্পের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেও চরিত্রগুলোকে বোঝার চেষ্টা করেন। এই অনুসন্ধিৎসাই চলচ্চিত্রটিকে নিছক রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে আনতে সক্ষম হয়েছে।
চরমপন্থা ও মেরুকরণের বর্তমান সময়ে সমাজের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত ভিন্নমতকে মেনে নেওয়া নয়, বরং ভিন্নমতের মানুষের অধিকারও সমানভাবে স্বীকার করা। বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গড়ে তোলার কথা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু অন্যের জীবনযাপন বোঝার আগেই যখন তাকে বিচার করতে শুরু করি, তখন সেই ধারণার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। মুঙ্গিউর ‘ফিয়র্ড’ তাই কেবল একটি পরিবারের বিচ্ছিন্নতার গল্প নয়। এটি এমন এক সময়ের দলিল, যখন সমাজের ভেতরে জমে থাকা মতাদর্শিক সংঘাত ধীরে ধীরে তুষারধসের মতো নেমে আসছে। সেই ধসের পরিণতি কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউ জানে না। কিন্তু তার অভিঘাত নিয়ে কথা বলা যে এখন জরুরি, সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত সেই কথাই আমাদের মনে করিয়ে দিবে।

২০২৬ সালের ১৮ মে কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে ক্রিস্তিয়ান মুঙ্গিউর ‘ফিয়র্ড’ চলচ্চিত্রটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়।‘ফিয়র্ড’ স্বর্ণপাম জয় করে। ১৯ আগস্ট ফ্রান্সের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। ফিয়র্ড ২০২৬ সালের অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্র।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









