এবারের বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ফিরেছেন দুই পরিচিত লেখক—২০১৫ সালের বিজয়ী মার্লন জেমস এবং ২০২০ সালের বিজয়ী ডগলাস স্টুয়ার্ট। তাদের সঙ্গে ৫০ হাজার পাউন্ডের পুরস্কারের দৌড়ে রয়েছেন পুলিৎজারজয়ী এলিজাবেথ স্ট্রাউট, কল্পবিজ্ঞানের বিশিষ্ট লেখক এম জন হ্যারিসন, ঔপন্যাসিক ও কবি লুক কেনার্ড এবং প্রথম উপন্যাসের লেখক রেবেকা পেরি।
সোমবার (৯ নভেম্বর) বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে আগামী।
জ্যামাইকান লেখক মার্লন জেমস ২০১৫ সালে ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব সেভেন কিলিংস’ উপন্যাসের জন্য বুকার পেয়েছিলেন। এবার সংক্ষিপ্ত তালিকায় এসেছে তার ‘দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারার্স’। এইডস মহামারির সময়কার জ্যামাইকাকে পটভূমি করে লেখা উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছে একদল সমকামীর ওপর হামলার ঘটনা। তারা জন হারবার্টের কারাগারকেন্দ্রিক নাটক ‘ফরচুন অ্যান্ড মেনস আইজ’ মঞ্চস্থ করার মহড়া দিচ্ছিলেন। ৬৪০ পৃষ্ঠার বইটি এবারের তালিকার সবচেয়ে দীর্ঘ উপন্যাস।
২০২০ সালে ‘শুগি বেইন’ উপন্যাসের জন্য পুরস্কার পাওয়া ডগলাস স্টুয়ার্ট এবার মনোনয়ন পেয়েছেন ‘জন অব জন’ বইয়ের জন্য। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র জন-ক্যালাম ম্যাকলয়েড। বহুদিন পর সে ফিরে আসে আউটার হেব্রিডিসে, নিজের পুরোনো ভূখণ্ডে। বইটি নিয়ে ইয়াগনিশসিং দাওর একে নীরবতা, আকাঙ্ক্ষা ও বেদনার মধ্যে আটকে থাকা পুরুষদের জীবন অনুসন্ধানের এক গভীর প্রয়াস বলে বর্ণনা করেছেন।

এলিজাবেথ স্ট্রাউট ২০০৯ সালে ‘অলিভ কিটেরিজ’ উপন্যাসের জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন। ২০১৬ সালে ‘মাই নেম ইজ লুসি বার্টন’ দিয়ে তিনি বুকারের দীর্ঘ তালিকায় এবং ২০২২ সালে ‘ওহ উইলিয়াম!’ দিয়ে সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নেন। এবার তার মনোনীত উপন্যাস ‘দ্য থিংস উই নেভার সে’। আগের বইগুলোর পরিচিত চরিত্রদের বাইরে এসে এখানে তিনি পরিচয় করিয়েছেন আর্টি ড্যাম নামের এক ইতিহাসশিক্ষকের সঙ্গে। ম্যাসাচুসেটসের উপকূলবর্তী অঞ্চলে তার আপাতস্বচ্ছন্দ জীবন এক গোপন সত্য এবং পরিবর্তনশীল যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতার মুখে বিপন্ন হয়ে পড়ে।
২০২২ সালে বুকার পুরস্কারের বিচারক ছিলেন এম জন হ্যারিসন। এবার তার ‘দ্য এন্ড অব এভরিথিং’ সংক্ষিপ্ত তালিকায় এসেছে। উপন্যাসটির পটভূমি এক নামহীন উপকূলীয় শহর—ইংল্যান্ডের কেন্ট অঞ্চলে, পৃথিবী-পরবর্তী এক বিপর্যস্ত সময়ে। বইটি নিয়ে লিখতে গিয়ে মিশেল ফাবের বলেছেন, নামের ইঙ্গিতের মতোই উপন্যাসটি সবকিছু নিয়েই। মানুষের মনস্তত্ত্ব, এমনকি সভ্যতার অন্তর্লোকেও প্রবেশ করে এটি বর্তমান জীবনের গভীর অনিশ্চয়তা উন্মোচন করে।
এবারের বিচারকমণ্ডলীর সদস্য লেখক রেমন্ড অ্যান্ট্রোবাসের মতে, সংক্ষিপ্ত তালিকার বইগুলো ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করেনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এসব বইয়ের পুনর্নির্মাণ সম্ভব নয়; এগুলো মানুষের অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতারই ফসল। বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি ইতিহাসবিদ মেরি বিয়ার্ড। অন্য সদস্যরা হলেন সংগীতশিল্পী জার্ভিস ককার, লেখক প্যাট্রিসিয়া লকউড এবং গার্ডিয়ানের সাংবাদিক রেবেকা লিউ।
লুক কেনার্ডের ‘ব্ল্যাক ব্যাগ’ একটি ব্যঙ্গাত্মক ক্যাম্পাস উপন্যাস। এর প্রধান চরিত্র ত্রিশোর্ধ্ব এক অভিনেতা, যে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার অংশ হিসেবে কালো চামড়ার ব্যাগের ভেতরে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বক্তৃতা শুনতে যাওয়ার কাজ নেয়। সংক্ষিপ্ত তালিকার শেষ বইটি রেবেকা পেরির প্রথম উপন্যাস ‘মে উই ফিড দ্য কিং’। এ বছরই বইটি ওয়াটারস্টোনস ডেব্যু ফিকশন পুরস্কার পেয়েছে। এর কেন্দ্রে রয়েছেন এক সমকালীন কিউরেটর, যার কাজ ঐতিহাসিক বাড়িগুলোর ঘর সাজানো। মধ্যযুগের এক রাজার জীবন সম্পর্কে ক্রমশ গভীর হয়ে ওঠে তার আগ্রহ—একসময় তা প্রায় আচ্ছন্নতায় পরিণত হয়।

সংক্ষিপ্ত তালিকার ছয়টি বইয়ের চারটির লেখক পুরুষ। এর মধ্যে ‘ব্ল্যাক ব্যাগ’, ‘দ্য ডিসঅ্যাপিয়ারার্স’ ও ‘জন অব জন’—তিনটি উপন্যাসেই পুরুষত্ব ও পুরুষের যৌনতার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিচারক জার্ভিস ককারের কাছে তালিকায় পুরুষ লেখকদের প্রাধান্য কিছুটা বিস্ময়কর। তার মতে, সাধারণভাবে পুরুষদের লেখা বইয়ের তুলনায় নারী লেখকদের বইয়ের মান এবার ভালো ছিল। পুরুষত্বের প্রশ্নটি হয়তো পুরুষদের নিজেদের ভূমিকা নতুন করে ভাবার প্রয়োজন থেকেই এসেছে। তবে মেরি বিয়ার্ড মনে করেন, এই তালিকাকে বিশেষভাবে ‘পুরুষতান্ত্রিক’ বলা যায় না।
এবারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত অনুপস্থিতির নাম মার্কিন লেখক এমা ক্লাইন। তাঁর ‘সুইটজি’ উপন্যাসে স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত এক ব্যক্তি মৃত্যুর সহায়তা পাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি ক্লিনিকের দিকে যাত্রা করে। বইটি সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছিল; এমনকি অনেকে ধারণা করেছিলেন, এবারের বুকার পুরস্কারও জিততে পারে এটি। ব্রিটিশ লেখক গেন্ডোলিন রাইলির দীর্ঘ তালিকাভুক্ত উপন্যাস ‘দ্য পাম হাউস’ ও শেষ পর্যন্ত জায়গা করে নিতে পারেনি।
বিচারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংক্ষিপ্ত তালিকা চূড়ান্ত করার বৈঠক চলে প্রায় তিন ঘণ্টা। বাদ পড়া অন্য পাঁচটি বই হলো ক্লোয়ি আরিডজিসের ‘দ্য শ্যাডো অব দ্য অবজেক্ট’, ম্যাকেনা গুডম্যানের ‘হেলেন অব নোহোয়ার’, কেনান ওরহানের ‘দ্য রেনোভেশন’, জামেল হোয়াইটের ‘অল দেম ডগস’ এবং মিসৌরি উইলিয়ামসের ‘দ্য ভিভিসেক্টরস’।
এবারের পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয়েছে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যুক্তরাজ্য অথবা আয়ারল্যান্ডে প্রকাশিত বই।

গত বছর বুকার পেয়েছিলেন ডেভিড স্যালজে, তার উপন্যাস ‘ফ্লেশ’-এর জন্য। সাম্প্রতিক বিজয়ীদের তালিকায় রয়েছেন সামান্থা হার্ভে ‘অরবিটাল’(২০২৪), পল লিঞ্চ ‘প্রফেট সং’(২০২৩) এবং শেখান করুণাতিলকা ‘দ্য সেভেন মুনস অব মালি আলমেইডা’ (২০২২)।
বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকা তাই কেবল ছয়টি বইয়ের নাম নয়। এর মধ্যে আছে স্মৃতি ও প্রত্যাবর্তন, যৌনতা ও নীরবতা, সভ্যতার বিপর্যয় এবং ব্যক্তিগত জীবনের গোপন অন্ধকার। পুরস্কারটি শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে, তা জানা যাবে ৯ নভেম্বর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









