মহাবিশ্বের জন্ম কীভাবে হয়েছিল? বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরের মুহূর্তগুলোতে কী ঘটেছিল? ডার্ক ম্যাটার কোথায় লুকিয়ে আছে? আর মহাবিশ্বে পদার্থের অস্তিত্বই বা কেন—যখন পদার্থ ও প্রতিপদার্থের পরিমাণ সমান হলে তাদের একে অন্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার কথা?
এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা এবার এক ধাপ এগিয়েছেন। ইউরোপের পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা সিইআরএনের লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার (এলএইচসি) থেকে পাওয়া গেছে প্রকৃতির অত্যন্ত বিরল এক কণা-বিক্রিয়ার প্রমাণ।ঘটনাটি এতটাই বিরল যে, একটি নির্দিষ্ট ধরনের কণার প্রতি ১০ বিলিয়ন বার ক্ষয়ের মধ্যে মাত্র একবার এমনটি ঘটতে পারে। চার দশকের বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা এই ঘটনার সন্ধান করছিলেন।
৩ নভেম্বর এক সেমিনারে এবং একই সময়ে গবেষণাপত্রের প্রাথমিক সংস্করণ প্রকাশ করে এলএইচসিবি গবেষক দল এই ফলাফলের কথা জানায়। গবেষণাপত্রটি এখনো অন্য বিজ্ঞানীদের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যায়নি।
বিজ্ঞানীরা এই অনুসন্ধানের ক্ষেত্রটির নাম দিয়েছেন ‘জেপ্টোভার্স’। জেপ্টোমিটার হলো দৈর্ঘ্যের এমন এক অতি ক্ষুদ্র একক, যা মানুষের চুলের পুরুত্বের তুলনায় হাজার হাজার ট্রিলিয়ন গুণ ছোট। এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগতে এমন কণা বা বলের অস্তিত্ব থাকতে পারে, যাদের সম্পর্কে এখনো আমাদের ধারণা নেই।
নতুন গবেষণায় যে ঘটনাটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সেটি হলো ‘বি-ডি মেসন’ নামের একটি কণার ক্ষয়। এই কণাটি ভেঙে একটি মিউয়ন ও একটি অ্যান্টিমিউয়ন তৈরি করে। মিউয়ন হলো ইলেকট্রনের মতোই একটি মৌলিক কণা, তবে এর ভর অনেক বেশি।
বি-ডি মেসন তৈরি হয় দুটি কোয়ার্ক দিয়ে—একটি বিউটি কোয়ার্ক এবং একটি ডাউন অ্যান্টিকোয়ার্ক। কোয়ার্ক হলো পদার্থের মৌলিক উপাদান। ছয় ধরনের কোয়ার্কের মধ্যে আপ ও ডাউন কোয়ার্ক একত্র হয়ে প্রোটন ও নিউট্রনের মতো কণা তৈরি করে। বিউটি কোয়ার্কের মতো অন্য কোয়ার্কগুলোও মহাবিশ্বের গভীর রহস্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই বিরল কণাগুলো পেলেন কোথায়? তারা নিজেরাই তৈরি করেছেন। এলএইচসিতে প্রায় আলোর গতিতে ছুটে আসা প্রোটনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানো হয়। সেই সংঘর্ষে অসংখ্য নতুন কণার জন্ম হয়। এর মধ্যে তৈরি হওয়া বিউটি কোয়ার্ক ও ডাউন অ্যান্টিকোয়ার্ক প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একত্র হয়ে মেসন তৈরি করে।
এই মেসন টিকে থাকে মাত্র দেড় ট্রিলিয়ন ভাগের এক সেকেন্ড। আর তার ক্ষয়ের মধ্যেও কাঙ্ক্ষিত মিউয়ন-অ্যান্টিমিউয়ন জুটি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
এমন বিরল ঘটনা শনাক্ত করতে এলএইচসিবি যন্ত্রের উন্নত প্রযুক্তি এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের নতুন তথ্যের সঙ্গে ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের তথ্য মিলিয়ে গবেষকেরা পেয়েছেন ৩.২ সিগমা মাত্রার প্রমাণ। সহজভাবে বললে, ফলটি নিছক দৈব ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ০.৩ শতাংশ।
তবে বিজ্ঞানীরা একে এখনই চূড়ান্ত আবিষ্কার বলছেন না। পদার্থবিজ্ঞানে কোনো ফলকে নিশ্চিত আবিষ্কার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সাধারণত ৫ সিগমা মাত্রার প্রমাণ প্রয়োজন। সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও তথ্য ও গবেষণা দরকার।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ফলাফল এখন পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত তত্ত্ব—‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই তত্ত্ব মৌলিক কণা ও তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া ব্যাখ্যা করে। কিন্তু ডার্ক ম্যাটার কিংবা মহাবিশ্বে পদার্থের আধিক্যের মতো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না।

তাই এই গবেষণা নতুন পদার্থবিজ্ঞানের দরজা খুলে দিতে পারে কি না, তা এখনো অজানা। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, নতুন কোনো কণা সরাসরি তৈরি না করেও তার অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব—বিরল কণার আচরণে সামান্য অস্বাভাবিকতা খুঁজে বের করার মাধ্যমে।
এলএইচসির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ফলে ২০৩০-এর দশকে আরও বেশি সংঘর্ষ ঘটানো এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। তাতে এই বিরল বিক্রিয়া সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী হ্যারি ক্লিফের কথায়, প্রথমবারের মতো এই বিরল ক্ষয়ের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া ছিল রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। বিজ্ঞানীরা এখন জেপ্টোভার্সের দরজায় কড়া নাড়ছেন। দরজার ওপারে কী আছে, তা জানার অপেক্ষা এখন।
গবেষণাটির প্রাথমিক সংস্করণ পড়া যাবে arXiv-এ। গবেষণাপত্রটি এখনো বিশেষজ্ঞদের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে স্বীকৃত হয়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









