আমি পারব তো? মানুষ কী বলবে?, পরিবার কি মেনে নেবে?, ব্যর্থ হলে কী হবে?— এ ধরনের প্রশ্ন অনেক নারীর মনে বারবার আসে। অথচ বাস্তবতা হলো, নারীদের সাহসের অভাব নেই। বরং অনেক সময় সমাজ, পরিবার, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ তাদের নিজের সাহসকে প্রকাশ করার সুযোগ দেয় না।
একজন নারী যখন নতুন কিছু করতে চান, তখন তাকে শুধু নিজের সঙ্গে লড়াই করতে হয় না; অনেক সময় তাকে চারপাশের মানুষের ধারণা ও প্রত্যাশার সঙ্গেও লড়তে হয়। ফলে নিজের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি পিছিয়ে যান। ছোটবেলা থেকেই তৈরি হয় ভয় একজন ছেলে ও একজন মেয়েকে সমাজ অনেক সময় একইভাবে বড় করে না। মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই সাবধানে চলতে, ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে এবং সমাজের প্রচলিত নিয়ম মেনে চলতে শেখানো হয়।
অন্যদিকে ছেলেদের অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ও ঝুঁকি নিতে উৎসাহ দেওয়া হয়। ফলে বড় হওয়ার পর কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একজন নারী স্বাভাবিকভাবেই বেশি দ্বিধায় পড়তে পারেন। তিনি ভুল করার ভয় পান, সমালোচনার ভয় পান এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করেন।
মানুষ কী বলবে— এই ভয়
নারীর আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ সামাজিক বিচার। একজন নারী নতুন ব্যবসা শুরু করলে, চাকরি ছেড়ে নিজের উদ্যোগ নিলে কিংবা প্রচলিত গন্ডির বাইরে কিছু করতে চাইলে অনেক সময় তাকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। এত ঝুঁকি নেওয়ার কী দরকার? ব্যবসা করে কী হবে? সংসার কে দেখবে? ব্যর্থ হলে সবাই হাসবে। এই কথাগুলো একজন নারীর মনে ভয় তৈরি করতে পারে। ধীরে ধীরে তিনি নিজের মতের চেয়ে অন্যের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন।
ব্যর্থতার ভয়
উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু অনেক নারী ব্যর্থতাকে শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি হিসেবে দেখেন না; তারা মনে করেন, ব্যর্থ হলে হয়তো পরিবার ও সমাজ তাদের অযোগ্য মনে করবে। এই ভয় তাদের শুরু করতেই বাধা দেয়। অথচ সফল উদ্যোক্তাদের অনেকেই জীবনে একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছেন। ব্যর্থতা শেষ নয়; বরং ভুল থেকে শেখার একটি সুযোগ। একজন নারীকে বুঝতে হবে—ব্যর্থ হওয়া লজ্জার নয়, চেষ্টা না করাই বড় আফসোসের বিষয় হতে পারে।
আর্থিক স্বাধীনতার অভাব
সাহসের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও সম্পর্ক রয়েছে। নিজের হাতে অর্থ না থাকলে একজন নারী অনেক সময় নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেন না। ব্যবসা শুরু করার জন্য মূলধন প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ঋণ, বিনিয়োগ বা ব্যবসায়িক সুযোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে অনেক নারী শুরু করার আগেই পিছিয়ে যান। তাই নারীকে শুধু সাহসী হতে বললেই হবে না; তাকে জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগও দিতে হবে।
পারিবারিক দায়িত্ব
অনেক নারীকে একই সঙ্গে সংসার, সন্তান, চাকরি কিংবা ব্যবসার দায়িত্ব সামলাতে হয়। ফলে নিজের স্বপ্নের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। একজন নারী যখন ব্যবসা শুরু করতে চান, তখন পরিবারের সহযোগিতা তার জন্য বড় শক্তি হতে পারে। কিন্তু সহযোগিতার পরিবর্তে যদি সব দায়িত্ব তার ওপরই থাকে, তাহলে তার উদ্যোগ থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
আত্মবিশ্বাসের সংকট
অনেক নারী আসলে সক্ষম, কিন্তু নিজের সক্ষমতার ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেন না। তারা ভাবেন, "অন্যরা আমার চেয়ে ভালো", "আমি হয়তো পারব না", "আমার অভিজ্ঞতা কম।" এই মানসিক বাধা ভাঙতে প্রয়োজন ছোট ছোট পদক্ষেপ। একটি ছোট কাজ সফলভাবে শেষ করা, নতুন কিছু শেখা, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া—এসব ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
নারী কীভাবে সাহসী হবেন?
নারীদের সাহসী করে তোলার প্রথম ধাপ হলো তাদের ওপর বিশ্বাস রাখা। পরিবারকে বলতে হবে—"তুমি চেষ্টা করো, আমরা তোমার পাশে আছি।" নারীদের ছোটবেলা থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তাদের অর্থনৈতিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উদ্যোক্তা হতে চাইলে বাজার, অর্থব্যবস্থা, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নারীর ভুল করার অধিকারকে স্বীকার করা। কারণ ভুল করার সুযোগ না থাকলে নতুন কিছু করার সাহসও তৈরি হয় না।
সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়
সাহসী মানুষ মানেই যে তার কোনো ভয় নেই, তা নয়। বরং ভয় থাকা সত্ত্বেও যে মানুষ সামনে এগিয়ে যায়, সেই সত্যিকারের সাহসী। একজন নারী যখন বলেন, "আমি চেষ্টা করব"—সেখান থেকেই তার সাহসের শুরু। প্রথমবার ছোট ব্যবসা শুরু করা, প্রথম ক্রেতার সঙ্গে কথা বলা, প্রথমবার নিজের পণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়া কিংবা প্রথমবার নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়ানো—প্রতিটি পদক্ষেপই সাহসের পরিচয়। নারীরা সাহসী হন না—এই ধারণাটি বদলানো দরকার। নারীদের মধ্যে সাহস আছে, মেধা আছে, দক্ষতা আছে এবং স্বপ্ন আছে। প্রয়োজন শুধু সেই সাহস প্রকাশের জন্য একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ। একজন নারীকে শুধু বলতে হবে না, "সাহসী হও।" বরং তাকে বলতে হবে—"তুমি চেষ্টা করো, ভুল হলে আবার শুরু করবে; আমরা তোমার পাশে আছি।" কারণ একজন নারীর সাহস যখন জেগে ওঠে, তখন বদলে যেতে পারে শুধু তার নিজের জীবন নয়— বদলে যেতে পারে একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
লেখক: অদিতি রায়


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









