একটা সময় ছিল, যখন বড় হয়ে কী হতে চাও—এই প্রশ্নের উত্তরে বেশির ভাগ শিশুই নির্দ্বিধায় বলে দিত, “ডাক্তার হব”, “ইঞ্জিনিয়ার হব”, “পাইলট হব”। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সহজ উত্তরটাই যেন কঠিন হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময়, পড়াশোনা শেষ করার পর কিংবা চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অনেক তরুণই আটকে যায় একটি প্রশ্নে—‘আমি আসলে কী করতে চাই?’
ক্যারিয়ার নির্বাচন এখন আর শুধু একটি পেশা বেছে নেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, সামাজিক মর্যাদা, পরিবারের প্রত্যাশা এবং নিজের ভালো লাগা। এতগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়াটাই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
নিজের পছন্দ, নাকি অন্যের প্রত্যাশা?
ক্যারিয়ার নিয়ে দ্বিধার অন্যতম বড় কারণ হলো নিজের ইচ্ছা আর পরিবারের প্রত্যাশার মধ্যে দূরত্ব। অনেক পরিবার এখনো চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা ব্যাংকারের মতো পেশাকে তুলনামূলক নিরাপদ ও সম্মানজনক মনে করে। ফলে সন্তানের আগ্রহ অন্য কোথাও থাকলেও তাকে প্রচলিত ক্যারিয়ারের দিকে যেতে উৎসাহ দেওয়া হয়। একজন তরুণ হয়তো লেখালেখি, ডিজাইন, ফটোগ্রাফি, চলচ্চিত্র নির্মাণ কিংবা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চান। কিন্তু পরিবারের প্রশ্ন আসে—‘এসব করে ভবিষ্যতে কী করবে?’ এই প্রশ্নই অনেক সময় নিজের পছন্দ নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে।
সামাজিক তুলনার চাপ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ক্যারিয়ার নিয়ে দ্বিধা আরও বেড়েছে। বন্ধু বা পরিচিত কেউ ভালো চাকরি পেয়েছে, কেউ বিদেশে গেছে, কেউ ব্যবসা শুরু করেছে—এসব দেখলে নিজের অবস্থানকে ছোট মনে হতে পারে। অন্যের সাফল্য তখন নিজের ব্যর্থতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। অথচ প্রত্যেক মানুষের পথ, সামর্থ্য, সুযোগ ও সময় আলাদা। একজন ২২ বছর বয়সে সফল হতে পারেন, অন্যজন হয়তো ৩০ বছর বয়সে নিজের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাবেন। কিন্তু সামাজিক তুলনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—‘আমি পিছিয়ে পড়ছি।’
পেশার সংখ্যা বেড়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়েছে
আগের তুলনায় এখন ক্যারিয়ারের সুযোগ অনেক বেশি। শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক বা সরকারি চাকরির মধ্যেই পেশাজীবন সীমাবদ্ধ নেই। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ইউএক্স ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা হওয়া—নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সুযোগ যত বাড়ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাব্য পথও তত বাড়ছে। আর বেশি বিকল্প অনেক সময় সিদ্ধান্তকে সহজ না করে বরং কঠিন করে তোলে।
ব্যর্থতার ভয়
ক্যারিয়ার নির্বাচনের সময় অনেক তরুণের মনে একটি ভয় কাজ করে—‘ভুল সিদ্ধান্ত নিলে কী হবে?’ এই ভয় বিশেষ করে তখন বাড়ে, যখন একটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে অনেক সময় ও অর্থ জড়িয়ে থাকে। কেউ বিষয় পরিবর্তন করতে চান, কেউ পেশা বদলাতে চান, কেউ নিজের পছন্দের পথে যেতে চান; কিন্তু মনে হয়, ‘এতদিন যা করেছি, সব তাহলে বৃথা?’ বাস্তবতা হলো, ক্যারিয়ার সবসময় সরলরেখায় এগোয় না। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষ নিজের আগ্রহ, দক্ষতা ও লক্ষ্য নতুন করে আবিষ্কার করে। তাই একটি সিদ্ধান্তই যে সারাজীবনের জন্য চূড়ান্ত—এমন ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত নয়।
নিজের সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার অভাব
ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার আগে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন না—নিজেকে বোঝার চেষ্টা। কোন কাজ করতে ভালো লাগে, কোন কাজে দক্ষতা আছে, কোন পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, আমার কাছে অর্থ, স্বাধীনতা, স্থায়িত্ব নাকি সৃজনশীলতার গুরুত্ব বেশি—এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনেই অনেকে পেশা বেছে নেন। ফলে কিছুদিন পর মনে হয়, ‘আমি কি ভুল জায়গায় চলে এসেছি?’
ক্যারিয়ার পরিকল্পনার প্রথম ধাপ তাই শুধু চাকরির বাজার দেখা নয়; বরং নিজের সক্ষমতা, আগ্রহ, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা।
তথ্যের অভাবও তৈরি করে দ্বিধা
অনেক তরুণ একটি নির্দিষ্ট পেশা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেন অন্যের কথা শুনে। কিন্তু সেই পেশার বাস্তব কাজ কী, প্রয়োজনীয় দক্ষতা কী, কর্মক্ষেত্র কেমন, আয় ও উন্নতির সুযোগ কতটা—এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য থাকে না। ফলে কল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য তৈরি হয়। কোনো পেশাকে বাইরে থেকে যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, ভেতরে গিয়ে দেখা যায় সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সঙ্গে কথা বলা, বাস্তব অভিজ্ঞতা জানা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পর্কে গবেষণা করা জরুরি।
তাহলে দ্বিধা কাটানোর উপায় কী?
ক্যারিয়ার নিয়ে দ্বিধা থাকা মানেই যে কেউ দুর্বল বা সিদ্ধান্তহীন—তা নয়। বরং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন বলেই অনেক সময় মানুষ বেশি ভাবেন।
দ্বিধা কাটাতে প্রথমেই নিজের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—আমি কী করতে ভালোবাসি? কোন কাজে আমার দক্ষতা আছে? কোন ধরনের জীবনযাপন চাই? আমার আর্থিক ও পারিবারিক বাস্তবতা কী? আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চাই? এরপর সম্ভাব্য কয়েকটি ক্যারিয়ার বেছে নিয়ে সেগুলো সম্পর্কে বাস্তব তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ছোট পরিসরে কাজ করে বা ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে কোনো ক্ষেত্রকে পরীক্ষা করেও দেখা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অন্যের সাফল্যকে নিজের জীবনের মানদণ্ড না বানানো।
ক্যারিয়ার নিয়ে দ্বিধা আসলে একটি স্বাভাবিক মানবিক অভিজ্ঞতা। কারণ ক্যারিয়ার শুধু চাকরি নয়; এটি আমাদের জীবনযাপন, পরিচয়, ভবিষ্যৎ এবং স্বপ্নের সঙ্গে জড়িত। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের আগ্রহকে গুরুত্ব দিতে হবে, বাস্তবতা বুঝতে হবে, প্রয়োজন হলে পরামর্শ নিতে হবে এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনাকেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









