জয় খুব অলস ছেলে। তবে সাধারণ অলস না।জয়ের অলসতা ছিল একেবারে আন্তর্জাতিক মানের। পৃথিবীর কোনো কাজ যদি বসে বসে করা সম্ভব হয়, তাহলে জয় সেই কাজ দাঁড়িয়ে করার কথা চিন্তাও করত না। আর যে কাজ শুয়ে শুয়ে করা সম্ভব, সেটা বসে করারও কোনো কারণ সে দেখত না। ছোটবেলায় মা বলতেন,
— জয়, ওঠ বাবা। স্কুলে যাবি না?
জয় কম্বলের ভেতর থেকে বলত, আজকে শরীরটা ভালো না মা। মা কপালে হাত দিয়ে দেখতেন, জ্বর নেই।
— জ্বর তো নেই!
জয় তখন চোখ বন্ধ রেখেই বলত, জ্বর ভিতরে আছে মা। থার্মোমিটারে ধরা পড়ছে না।
পড়ালেখা শেষ করে ফেলেছে জয়। এরপর চাকরির বয়সও হয়ে গেল। কিন্তু চাকরি করার ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই। সকাল হলে সে বিছানায় শুয়ে ফেসবুক চালায়। দুপুর হলে শুয়ে গান শোনে। বিকেলে কম্পিউটারে বসে। আর ইদানীং নতুন এক বিপদ শুরু হয়েছে—টিকটক!
জয় এখন টিকটকের ভিডিও বানায়। তার ধারণা, একদিন না একদিন সে ভাইরাল হবেই। কিন্তু সমস্যা হলো, তার ভিডিওতে মানুষ লাইক দেওয়ার চেয়ে বেশি করে স্ক্রল করে চলে যায়।
একদিন জয় নিজের বানানো একটা ভিডিও দেখে মুগ্ধ হয়ে বাবাকে বলল,
— বাবা, কেমন হয়েছে?
বাবা মোবাইলটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন।
— এটা কী?
— ভিডিও।
— বুঝলাম। কিন্তু ভিডিওটা দেখে আমার কেন মনে হচ্ছে তুই চাকরি না করে আরও বড় একটা বিপদে পড়েছিস?
জয় বাবার কথা শুনে গম্ভীর হয়ে বলল, বাবা, তুমি বুঝবে না। এটা ক্রিয়েটিভ কাজ।
বাবা বললেন, তোর মায়ের রান্নাঘরের কাজও ক্রিয়েটিভ। কিন্তু সে মাসের শেষে বাজারের টাকা চায়। তুই ক্রিয়েটিভ হয়ে কী পাস?
জয় উত্তর দিল,
— ফলোয়ার।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ফলোয়ার দিয়ে বাজার থেকে চাল-ডাল পাওয়া যায়?
জয় একটু ভেবে বলল, এখনো যায় না। তবে ভবিষ্যতে যেতে পারে।
বাবা আর কোনো কথা বললেন না।
কারণ তিনি বুঝে গেছেন, ছেলের সঙ্গে যুক্তি করে লাভ নেই।
জয়ের বাবা-মা ছেলেকে নিয়ে এতটাই চিন্তিত ছিলেন যে আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছিল।
খালা এসে বলতেন, জয়, বাবা, পড়ালেখা শেষ করেছিস। এবার একটা চাকরি কর।
মামা বলতেন,
— চাকরি না করলে বিয়ে করবি কীভাবে?
জয় তখন মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই বলত,
— বিয়ে করব কেন?
মামা বলতেন,
— সংসার করার জন্য।
জয় বলত,
— সংসার করতে চাকরি লাগে নাকি?
মামা বলতেন,
— টাকা লাগে।
জয় বলত,
— টাকা থাকলেই তো হয়।
মামা বিরক্ত হয়ে বলতেন,
— টাকা পাবি কোথায়?
জয় খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলত,
— সেটা তো আমি জানি না। তবে টাকা লাগবে—এই কথাটা ঠিক।
একদিন এক চাচা জয়কে বোঝাতে এসে বললেন,
— বাবা, জীবনটা কিন্তু খুব ছোট। এখন পরিশ্রম না করলে পরে আফসোস করবি।
জয় বলল, চাচা, জীবন ছোট হলে এত পরিশ্রম করে লাভ কী?
চাচা হতবাক।
— কেন?
— ছোট জিনিসে বেশি পরিশ্রম করলে তো দ্রুত শেষ হয়ে যাবে!
চাচা সেদিন আর কথা বাড়াননি। বাড়ি ফিরে তিনি জয়ের বাবাকে শুধু বলেছিলেন,
— ভাই, তোর ছেলে অলস না। ও দর্শনশাস্ত্রে ঢুকে গেছে।
একদিন সকালবেলা জয় বাড়ির উঠোনে বসে টিকটকের ভিডিও বানাচ্ছিল। ভিডিওর বিষয়—
“জীবনে সফল হতে হলে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন।”
জয় ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত জ্ঞানী মুখ করে বলছিল,
— বন্ধুরা, জীবনে কখনো হাল ছেড়ে দেবেন না। পরিশ্রম করুন, সফলতা একদিন আসবেই—
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল,
— বাবা, দশটা টাকা দিবেন?
জয় ভিডিও বন্ধ করে তাকাল। একজন ভিক্ষুক দাঁড়িয়ে আছে। জয় একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— দশ টাকা কেন?
ভিক্ষুক বলল,
— কিছু খাওয়ার জন্য।
জয় বলল, তুমি ভিক্ষা না করে পরিশ্রম করতে পারো না?
ভিক্ষুক চুপ করে রইল। জয় এবার জ্ঞান দেওয়ার মুডে চলে গেল।
— মানুষকে পরিশ্রম করতে হয়। বসে বসে টাকা চাইলে হবে? কাজ করো। পরিশ্রম করলে টাকা আসবে।
ভিক্ষুক কিছুক্ষণ জয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে অসহায় গলায় বলল,
— আমাকে কে কাজ দেবে বাবা?
জয় থেমে গেল। তার মাথায় হঠাৎ একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। সে ভিক্ষুককে কাছে ডাকল।
— এই যে, চাচা, তোমার নাম কী?
— কাদের।
— কাদের চাচা, তুমি কি আমার কথা শুনবে?
— শুনব বাবা।
জয় চারপাশে তাকিয়ে কাদেরকে আরও কাছে ডাকল। তারপর কানে কানে বলল, তুমি প্রতিদিন পুরো মহল্লা, বাজার, হাট—সব জায়গায় ঘুরে যত টাকা তুলবে, সব আমার কাছে জমা দেবে।
কাদের অবাক।
— সব?
— হ্যাঁ, সব।
— তারপর?
— আমি তোমাকে প্রতিদিন ৫০ টাকা বেতন দেব। বাকি টাকা আমার।
কাদের কয়েক সেকেন্ড জয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল। জয়ও হাসতে লাগল।
দুজনের হাসির কারণ অবশ্য আলাদা। কাদের ভাবছে, ছেলেটা বোধহয় পাগল। আর জয় ভাবছে, সে জীবনে প্রথমবার একটা ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেলেছে!


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









