দিনের বেলা পেঁচাকে দেখা যায় কম। সে তখন গাছের কোটরে বসে চোখ কুঁচকে ভাবতে থাকে—‘আহা, সবাই এত হৈচৈ করে কেন?’
কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই পেঁচার ঘুম ভাঙে। চোখ মেলে সে বলে—এইবার আমার পালা!
তারপর ডানা মেলে উড়ে যায় রাতের আকাশে। কোনো হইচই নেই, কোনো ‘ফড়ফড়’ শব্দ নেই। যেন পেঁচা নয়, কালো মেঘের এক টুকরো!
পৃথিবীতে পেঁচার ২৫০টিরও বেশি প্রজাতি আছে। বরফে ঢাকা আর্কটিক থেকে গরম মরুভূমি, ঘন জঙ্গল থেকে খোলা মাঠ—প্রায় সব জায়গাতেই তাদের দেখা মেলে।
কেউ ছোট্ট, কেউ বিশাল। কেউ গাছে থাকে, কেউ আবার থাকে মাটির নিচে!

ছোট পেঁচা, বড় কাণ্ড!
পেঁচাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটদের একজন হলো এলফ আউল। লম্বায় মাত্র ১৪ সেন্টিমিটার। এতটুকু পেঁচাকে দেখলে মনে হবে, কেউ বুঝি পেঁচার একটা ছোট সংস্করণ বানিয়ে ফেলেছে!
এই পুঁচকে পেঁচা থাকে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমের মরুভূমিতে। দিনের বেলা ক্যাকটাস বা গাছের গর্তে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যা হলেই বেরিয়ে পড়ে খাবারের খোঁজে।
তার মেনুতে থাকে মথ, ঝিঁঝিঁ পোকা, বিছা আর গুবরে পোকা।
অবশ্য সব পেঁচা এত ছোট নয়। ইউরোপীয় ঈগল পেঁচা প্রায় ৪ কেজি পর্যন্ত ভারী হতে পারে। তার ডানা মেললে চওড়া হয় দেড় মিটারেরও বেশি!
মানে, এক পেঁচার ডানা মেললেই যেন ছোটখাটো ছাতা খুলে গেল!
পেঁচার রাতের খাবার
পেঁচারা কী খায়?
ইঁদুর, ছুঁচো, ছোট পাখি, ব্যাঙ, মাছ, পোকামাকড়—যা পায়, সুযোগ বুঝে ধরে ফেলে। বড় পেঁচারা খরগোশ, শশক, এমনকি ছোট শিয়াল বা অন্য ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীকেও শিকার করতে পারে।
আর শিকার ধরার পর?
চিবোতে বসে না। অনেক সময় শিকার আস্ত গিলে ফেলে!
তারপর খাবার হজম হয় পেটে। কিন্তু পশম, হাড়, দাঁত বা পালকের মতো কিছু জিনিস তো আর হজম হয় না। সেগুলো পরে গোলগাল দলা হয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে।
এই দলার নাম পেলেট।
বিজ্ঞানীরা সেই পেলেট দেখে আবার পেঁচার খাবারের হিসাব বের করেন।
অর্থাৎ পেঁচা খাবার খায়, আর বিজ্ঞানীদের জন্য রেখে যায় তার ‘খাবারের রসিদ’!
উড়ে যায়—কিন্তু শব্দ কোথায়?
পেঁচার আরেকটি আশ্চর্য কাণ্ড হলো তার নিঃশব্দ উড়ান।
রাতে একটা পেঁচা যদি তোমার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়, তুমি হয়তো টেরই পাবে না।
তার পালকের কিনারায় থাকা নরম সূক্ষ্ম অংশ বাতাসের শব্দ কমিয়ে দেয়। ফলে পেঁচা প্রায় চুপিচুপি শিকারের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
ইঁদুর তখন হয়তো ভাবছে, ‘বাহ, কী শান্ত রাত!’
আর ঠিক তখনই—
ঝপ!
পেঁচা হাজির।
চোখ দুটি এমন কেন?
পেঁচার চোখ মানুষের চোখের মতো গোল নয়। এগুলো অনেকটা লম্বা নলের মতো। চোখ দুটিও মাথার মধ্যে শক্তভাবে বসানো।
তাই পেঁচা চোখকে আমাদের মতো এদিক-ওদিক ঘোরাতে পারে না।
কিন্তু তাতে তার অসুবিধা কী?
মোটেই না!
তার চোখ এমনভাবে তৈরি যে অল্প আলোতেও সে বেশ ভালো দেখতে পায়। রাতের অন্ধকারে শিকার খুঁজতে এই চোখ তার বিরাট সাহায্য করে।
আর চোখ যখন নড়তে চায় না, তখন পেঁচা কী করে?
সে মাথা ঘোরায়!

মাথা ঘোরে কত দূর?
পেঁচা তার মাথা প্রায় ২৭০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘোরাতে পারে।
না, পুরো ৩৬০ ডিগ্রি নয়। তাই পেঁচা মাথা ঘুরিয়ে নিজের পেছনের মাথাটাও দেখতে পারে—এমন ভাবার দরকার নেই!
তবে ২৭০ ডিগ্রিও কম কাণ্ড নয়।
একদিকে তাকাল।
তারপর একটু ঘুরল।
আরও ঘুরল।
ব্যস—পেছনের দিকটাও দেখা হয়ে গেল!
পেঁচার লম্বা ও নমনীয় ঘাড়ই তাকে এই আশ্চর্য ক্ষমতা দিয়েছে।
কান কোথায় গেল?
পেঁচার মাথার ওপর অনেক সময় দুটো পালকের গুচ্ছ দেখা যায়। দেখতে একেবারে কানের মতো।
কিন্তু ওগুলো কান নয়!
ওগুলো শুধু পালক।
আসল কান লুকিয়ে আছে মাথার দুই পাশে, মুখের চারপাশের পালকের নিচে।
আর মজার ব্যাপার হলো, পেঁচার দুই কান একই উচ্চতায় থাকে না। একটি একটু ওপরে, অন্যটি একটু নিচে।
এই অদ্ভুত কান তাকে শব্দের দিক বুঝতে সাহায্য করে।
অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না?
তাতে কী!
পেঁচা শুনেই বুঝে নিতে পারে—‘ওই যে, নিচে কোথাও একটা ইঁদুর হাঁটছে!’

বরফের দেশে সাদা পেঁচা
আর্কটিকের বরফে ঢাকা অঞ্চলে বাস করে স্নোয়ি আউল বা তুষার পেঁচা।
পুরুষ তুষার পেঁচা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও সাদা হয়ে যায়। প্রতি বছর নতুন পালক গজানোর পর তার শরীরের সাদা রং আরও উজ্জ্বল হয়।
শেষে সে প্রায় বরফের মতো সাদা হয়ে যেতে পারে।
তখন বরফের মধ্যে তাকে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন।
পেঁচা মনে মনে বলে,
—খুঁজে দেখো দেখি!
গাছ ছেড়ে মাটির নিচে!
সব পেঁচা যে গাছে থাকে, তা কিন্তু নয়।
বারোয়িং আউল নামে এক ধরনের পেঁচা থাকে মাটির নিচের গর্তে!
নিজেরা গর্ত খোঁড়ে, আবার অন্য প্রাণীর ফেলে যাওয়া গর্তও ব্যবহার করে। প্রেইরি ডগ, কচ্ছপ কিংবা আর্মাডিলোর পুরোনো গর্তও তাদের বেশ পছন্দ।
আর অন্য পেঁচাদের মতো শুধু রাতেই শিকার করে না—এরা দিনের বেলাতেও বের হয়।
পোকা, বিছা, ইঁদুর, ছোট সরীসৃপ—সবই তাদের খাবারের তালিকায় আছে।

পেঁচা কি সত্যিই জ্ঞানী?
পেঁচাকে কেউ জ্ঞানী বলে, কেউ আবার ভয় পায়।
প্রাচীন গ্রিসে পেঁচাকে জ্ঞানের দেবী অ্যাথেনার সঙ্গে যুক্ত করা হতো। তাই সেখানে পেঁচা ছিল জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক।
জাপানেও পেঁচাকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
আবার পৃথিবীর কিছু জায়গায় মানুষ পেঁচাকে অশুভ মনে করে। কেউ কেউ তাদের মৃত্যু বা জাদুবিদ্যার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।
এসব বিশ্বাসের কারণে কোথাও কোথাও পেঁচা মানুষের হাতে শিকারও হয়েছে।
কিন্তু পেঁচা আসলে প্রকৃতির খুব দরকারি প্রাণী। তারা ইঁদুর ও নানা ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
তাই পেঁচাকে ভয় নয়, বরং ভালোভাবে চিনে তাকে রক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সর্বত্র!
বার্ন আউল বা গোলাঘর পেঁচা পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত স্থলচর পাখিদের একটি। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই তাদের দেখা যায়।
সন্ধ্যা নামছে।
মাঠের ওপর হালকা অন্ধকার।
দূরে একটি বেড়ার খুঁটিতে বসে আছে পেঁচা।
চোখ দুটি বড় বড়।
কান লুকানো।
ঘাড় ঘোরে ২৭০ ডিগ্রি।
ডানা মেললে কোনো শব্দ নেই।
হঠাৎ সে উড়ল।
কোথায় গেল?
কেউ জানে না।
শুধু অন্ধকারের মধ্যে ভেসে এল—
‘হুঁ…হুঁ…’
মনে হলো, রাতের রাজ্যে কেউ একজন পাহারা দিচ্ছে।
সে হলো পেঁচা—
দিনের ঘুমকাতুরে, রাতের দুরন্ত গোয়েন্দা!


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









