শোন, পাশের ফ্ল্যাটে রিয়া নামের মেয়েটা আছে না? হেলেনা খানম বললেন।
কোন রিয়া। রমিজ সাহেবের মেয়েটা? তারেজুল হক বললেন।
হ্যাঁ। ওর কাণ্ড শুনবে?
কী করেছে রিয়া?
এক ছেলেকে বিয়ে করবে বলে বাড়ি থেকে চুপিচুপি কাপড়চোপড় আর টাকাপয়সা নিয়ে বের গেছে। ছেলের সাথে ওর ফেসবুকে পরিচয়। দুজনে মিলে রেলস্টেশনে দেখা করেছে। এখন রিয়া বলেছে, চলো আগে বিয়ে করি।
ছেলে বলেছে,আগে গ্রামে চলে যাই। ওখানে যেয়েই বিয়ে করব।
রিয়া বেঁকে বসেছে। আগে বিয়ে।
একসময় ছেলে বলেছে, ঠিক আছে। চলো আগে বিয়ে করি।
আশেপাশে কোথায় কাজীর অফিস আছে-দেখ। রিয়া বলেছে।
তাই শুনে চমকে উঠেছে ছেলে। কাজী অফিসে কেন! আমরা তো মন্দিরে বিয়ে করব।
অ্যাঁ! তুমি হিন্দু! আগে কেন বলোনি? প্রায় কেঁদেই ফেলেছে রিয়া।
তুমিও তো জানতে চাওনি।
গল্প বলা শেষ করে আঁচল চাপা দিয়ে হাসতে লাগলেন হেলেনা খানম।
অত হেসো না। তোমার মেয়েও বড় হয়েছে। সারাক্ষণ মোবাইল নিয়েই আছে। তার দিকে ভালো করে নজর রাখ। তারেজুল স্ত্রীকে ধমক দিলেন।
স্বামীর কথা শুনে মাথা ঝাঁকালেন হেলেনা।
ঠিকই বলেছেন তৃপ্তির আব্বু। এ বছর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে মেয়ে। সারাদিন প্রাইভেট আর প্রাইভেট। বাসায় ফিরে হয় নোট তোলা নয়তো মোবাইলে কথা বলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে সারাক্ষণ।
তবু মাঝে মাঝে আড়ি পাতেন হেলেনা।
কার সাথে এত কথা?
কী কথা?
সেদিন রাতে খাওয়ার পর বারান্দায় যেয়ে কার সাথে যেন চুপিচুপি কথা বলছিল তৃপ্তি।
হ্যাঁ। চুপ করে আসবে। কেউ যেন না দেখে।
শুনে বুকটা কেঁপে উঠেছিল মায়ের। হবু জামাই কি চুপিচুপি রাতে মেয়ের সাথে দেখা করতে আসবে?
সাধারণত রাত এগারোটার মধ্যে বিছানায় যান হেলেনা। সেদিন জেগে রইলেন।
ঠিক রাত বারোটায় মেয়ে তৃপ্তি আর ছেলে তানভীর এসে মাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল ড্রইংরুমে।
বড় গামলা দিয়ে কী যেন ঢাকা ছিল।
গামলা উঠাও মা। তৃপ্তি বলেছিল।
গামলা উঠাতেই চোখে পড়েছিল একটা কেক। সেখানে লেখা “হ্যাপি বার্থ ডে মা”।
এক বান্ধবীর মায়ের কাছে হোমমেড কেক বানিয়ে নিয়েছিল তৃপ্তি। বান্ধবীর ছোটভাইকে কেক ডেলিভারি দেওয়ার সময় চুপিচুপি আসতে বলেছিল ও। যেন আম্মু টের না পায় যে জন্মদিনের কেক আনানো হচ্ছে।
কয়েকদিন আগে সাবিনা নামের এক বান্ধবীর বাসায় জন্মদিনের দাওয়াত খেতে গিয়েছিল তৃপ্তি।
কী মনে করে সাবিনাকে ফোন দিয়েছিলেন হেলেনা। জন্মদিনের নাম করে অন্য কোথাও যাচ্ছে না তো?
হ্যালো। আমি তৃপ্তির বান্ধবী তমা বলছি। আমাদের একসাথে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার কথা। তৃপ্তি কি তোমার সাথে আছে নাকি বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে গেছে?
বয়ফ্রেন্ড! ওপাশে মনে হয় হকচকিয়ে গিয়েছিল সাবিনা।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মোবাইলে মেয়ের গলা শুনতে পেয়েছিলেন হেলেনা, আম্মু তুমি কোন বয়ফ্রেন্ডের কথা জানতে চাইছ?
খিলখিল করে হেসে উঠেছিল তৃপ্তি।
কী বলবেন ভেবে পাননি হেলেনা।
আম্মু তুমি ভুলে গিয়েছ-সাবিনা তোমার নাম ‘আন্টি’ নামে সেভ করে রেখেছে।
আজকালের টিনএজ মেয়েদের মতিগতি বোঝা দায়।
একদিন তৃপ্তির মোবাইলের কন্টাক্ট লিস্ট দেখেছিলেন হেলেনা।
কী অদ্ভুত সব নাম!
গরু - ৫
গাধা-২
পাগলি-৩
জান-১
জান-২
এগুলো কার নাম রে! বয়ফ্রেন্ডের নয় তো? জানতে চেয়েছিলেন মা।
আম্মু তুমি এত সন্দেহ করো কেন! এগুলো তো সব আমার ক্লাসমেটদের নাম।
ওরা জানে, তুই ওদেরকে এইসব নামে সেভ করেছিস?
ওরা জানবে কীভাবে? আসল কথা হলো আমি ওদের নাম মনে রাখতে পারি না। তাই এভাবে সেভ করে রেখেছি।
এ কথা বলার পরও হেলেনার মন থেকে খুঁতখুঁতানি যায় না।
একদিন তৃপ্তি কলেজে যাওয়ার পর হেলেনা মেয়ের ডায়েরি বের করে পড়লেন।
প্রথম কয়েক পেজে শুধু হোমওয়ার্কের লিস্ট লেখা। শেষ পাতায় লেখা- ‘'আম্মু, তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে আমার ডায়েরি পড়ছ কেন?’
প্রচণ্ড শক খেয়েছিলেন হেলেনা। মেয়ে দেখি তার চেয়ে একধাপ এগিয়ে সবসময়।
বাধ্য হয়ে অন্য পন্থা নিলেন মা। মেয়ের উপর গোয়েন্দাগিরি করার আরও অনেক উপায় জানা আছে তার।
ছেলে তানভীর এখনো ছোট। ভেবেছিলেন তাকে এই কাজে লাগাবেন না। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই।
হেলেনা এই বুদ্ধি শিখেছেন নিজের মায়ের কাছ থেকে। তাকে গান শেখাতে আসতেন দুলালদা। বিবাহিত ছিলেন। তিনি যখন হেলেনাকে গান শেখাতেন ছোট ভাই রিপন পাশে বসে ওদেরকে পাহারা দিত।
ফলাফল অবশ্য বেশ ভালো।
রিপন এখন ভালোই গান গাইতে পারে।
তোকে একটা কাজ করতে হবে বাবা। ছেলে তানভীরকে ডেকে ধীর গলায় বললেন হেলে না ।
কী কাজ মা?
গোয়েন্দাগিরির কাজ।
গোয়েন্দাগিরি?
হ্যাঁ। তোর আপু কোনো ছেলের সাথে প্রেম করে কি না সেটা জানার জন্য চোখকান খোলা রাখবি।
যদি না করে। আমার সামনে তো আর ওসব গল্প করবে না। বুঝব কীভাবে?
বুঝবি বুঝবি। যদি কখনো শুনিস ভালোবাসা নিয়ে কথা বলছে তাহলে সাথে সাথে আমাকে জানাবি, ঠিক আছে?
ঠিক আছে। মাথা নাড়ল তানভীর।
কয়েকদিন পরের কথা।
দুপুরে খাওয়ার পর রেস্ট নিচ্ছিলেন হেলেনা খানম।
এসময় ঘরে এলো তানভীর।
মা মা। আপু না ভালোবাসা নিয়ে মোবাইলে কথা বলছিল। আমি শুনেছি।
কার সাথে বলছিল?
সেটা জানি না মা। তবে ভালোবাসার কথা বলছিল।
কী কী বলছিল? তাড়াতাড়ি বল আমাকে। হেলেনা খানম উত্তেজনার চোটে বিছানায় উঠে বসলেন।
বলছিল, আম্মু পাশের বাসার লোকমান সাহেবকে ভালোবাসে। তার সাথে চুপিচুপি হোয়াটস আপে চ্যাট করে।
স্তব্ধ হয়ে গেলেন মা।
মেয়েও দেখি তার উপর গোয়েন্দাগিরি করছে!


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









