বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে ১৯৮৯ সালের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন দমনের স্মরণে প্রতিবছর যে সমাবেশ আয়োজন করতেন হংকংয়ের কর্মীরা, সেই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত তিন নেতাকে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। তাদের সাজা সর্বোচ্চ সাত বছর তিন মাস পর্যন্ত। অভিযুক্তদের মধ্যে ৬৯ বছর বয়সী ‘লি চেউক-ইয়ান’ ও ৪১ বছর বয়সী ‘চাও হ্যাং-তুং’ গত মাসে দোষী সাব্যস্ত হন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—হংকংয়ের বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে অন্যদের রাষ্ট্রক্ষমতা উৎখাতের কাজে প্ররোচিত করা। তৃতীয় অভিযুক্ত, ৭৪ বছর বয়সী ‘অ্যালবার্ট হো’, জানুয়ারিতেই দোষ স্বীকার করেছিলেন। একসময় চীনা ভূখণ্ডের মধ্যে হংকং ছিল এমন বিরল একটি স্থান, যেখানে তিয়ানআনমেন হত্যাকাণ্ডের স্মরণে প্রকাশ্যে মানুষ জড়ো হতে পারত। মূল ভূখণ্ড চীনে এখনও ১৯৮৯ সালের সেই ঘটনা অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং কঠোরভাবে সেন্সর করা হয়।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ নীতির কথা বলে হংকং কর্তৃপক্ষ তিয়ানআনমেন স্মরণে সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। সেই নিষেধাজ্ঞা আর ওঠেনি। একই বছর কার্যকর হয় জাতীয় নিরাপত্তা আইন—যে আইনের আওতায় ভিন্নমত প্রকাশের বিস্তৃত পরিসরকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এই আইন জরুরি। সমালোচকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, আইনটি হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষয় করেছে এবং মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
লি, চাও ও হোকে ২০২১ সালে গ্রেপ্তার করে অভিযুক্ত করা হয়। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাঁদের সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারত। শুক্রবার আদালত লিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়। চাওকে দেওয়া হয় সাত বছর তিন মাস। দোষ স্বীকার করায় হোর সাজা হয়েছে পাঁচ বছর।

আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, লি ও চাও অন্যদের ‘অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা উৎখাতের’ উদ্দেশ্যে সংগঠিত, পরিকল্পিত বা অংশগ্রহণমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে প্ররোচিত করেছিলেন। কিন্তু চাও মে মাসে আদালতে বলেছিলেন, ‘আসলে এই বিচার হওয়া উচিত ছিল আইনেরই।’
২০২২ সালে গ্রেপ্তারের আগে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চাও বলেছিলেন, তিনি গ্রেপ্তারের জন্য প্রস্তুত এবং গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হলে তার মূল্য দিতেও প্রস্তুত। তারা ছিলেন এখন বিলুপ্ত ‘হংকং অ্যালায়েন্সের’ নেতা। ১৯৮৯ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি বেইজিংয়ে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সমর্থন করত। কয়েক সপ্তাহ পর চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সেনা ও ট্যাংক নামিয়ে তিয়ানআনমেন স্কয়ারের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন দমন করে। নিহতের সংখ্যা নিয়ে আজও নিশ্চিত হিসাব নেই—কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত বিভিন্ন অনুমান রয়েছে।
পরবর্তী তিন দশক ধরে হংকং অ্যালায়েন্স চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে তিনটি দাবি জানিয়ে এসেছে: তিয়ানআনমেন দমন-পীড়নের দায় স্বীকার করতে হবে, ভিন্নমতাবলম্বীদের মুক্তি দিতে হবে এবং গণতান্ত্রিক সংস্কার আনতে হবে। প্রতিবছর সংগঠনটি তিয়ানআনমেনের নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন ও সমাবেশের আয়োজন করত। আয়োজকদের দাবি, কোনো কোনো বছর সেই সমাবেশে এক লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। পুলিশের হিসাব অবশ্য ছিল কম।
শুক্রবার আদালত হংকং অ্যালায়েন্সকেও ১৫ লাখ হংকং ডলার জরিমানা করেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক ‘সারা ব্রুকস’ এই রায়কে বলেছেন ‘তিন স্তরের এক ট্র্যাজেডি’। তাঁর মতে, প্রথমত অন্যায়ভাবে শাস্তি পাওয়া কর্মীদের জন্য, দ্বিতীয়ত তিয়ানআনমেন দমন-পীড়নের বেঁচে থাকা মানুষ ও নিহতদের জন্য, আর তৃতীয়ত সেই প্রজন্মের হংকংবাসীর জন্য—যাদের আধুনিক চীনের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে কথা বলার পরিসরও ক্রমে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একটি স্মরণসভা থেকে শুরু হওয়া এই ইতিহাস তাই শুধু অতীতের নয়। প্রশ্নটি আজও বর্তমান: একটি সমাজ তার ইতিহাসকে কতটা স্বাধীনভাবে স্মরণ করতে পারে? আর যখন স্মরণ করাও অপরাধ হয়ে ওঠে, তখন কার ভয় বেশি—যারা মোমবাতি জ্বালায়, নাকি যে রাষ্ট্র সেই আলোটুকুও নিভিয়ে দিতে চায়?
সূত্র: কোহ ইউ, বিবিসি নিউজের এশিয়া-প্যাসিফিক বিষয়ক সংবাদদাতা ও সাংবাদিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









