‘ব্রিটিশ এমপিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে ইসরাইল দেখিয়ে দিল, ফিলিস্তিনিদের ওপর তার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন এড়াতে সে কতদূর যেতে পারে।’
আমার জীবনে বেশ কয়েকবার ফিলিস্তিন যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেখানে আমি কোনো দূরবর্তী রাজনৈতিক বিতর্ক দেখিনি। দেখেছি মানুষের প্রতিদিনের জীবন। দেখেছি অন্তহীন চেকপোস্ট, সশস্ত্র পাহারার টাওয়ার, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, এবং সশস্ত্র বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলোই ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন বাস্তবতা। কোথায় একজন মানুষ যেতে পারবেন, কোথায় পারবেন না—তা নির্ধারণ করে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে স্বাধীন চলাচল সবার অধিকার নয়। দখলদারিত্ব এভাবেই কাজ করে। দখলকৃত মানুষের কাছ থেকে স্বায়ত্তশাসনের প্রতিটি সম্ভাবনা কেড়ে নিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়। ফিলিস্তিনিদের জীবন এই নিয়ন্ত্রণের ছন্দেই আবদ্ধ।
গাজার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরও নির্মম। সেখানে কী প্রবেশ করবে, কী বের হবে—তার ওপর ইসরাইলের দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অবৈধ অবরোধের পরিণতিতে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক অনাহার ও বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। বিশ্ব যখন ধীরে ধীরে গাজার গণহত্যার বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে শুরু করেছে, তখন ইসরাইল জাতিসংঘের তদন্তকারী এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রবেশও আটকে দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট: যুদ্ধাপরাধের পূর্ণ চিত্র যেন বিশ্বের সামনে না আসে।
আরও একটি বিষয় ভুলে যাওয়া উচিত নয়। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শরণার্থী এখনও নিজেদের ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত। এটাই আসল কেলেঙ্কারি। ইইসরাইলি সরকারের আমাকে এবং আরও ১০ জন ব্রিটিশ এমপিকে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রতিদিন যে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার সামান্য একটি ঝলক মাত্র।
নিষেধাজ্ঞা নয়, সত্যই তাদের ভয়ের কারণ
ইসরাইলের নিন্দা পাওয়ার কারণে আমি রাতের ঘুম হারাব না। যে বিষয়টি আমাকে ক্ষুব্ধ করে, তা হলো ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি ইসরাইলের অবমাননাকর আচরণ। যে বিষয়টি আমি মেনে নিতে পারি না, তা হলো প্রতিদিন হাজার হাজার ফিলিস্তিনির চলাচলের স্বাধীনতা অস্বীকার করা। আমি নিন্দা করি জাতিসংঘের তদন্তকারী ও সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে—যার মাধ্যমে ইসরাইল দখলদারিত্ব, বর্ণবাদী শাসন ও গণহত্যার অভিযোগ থেকে নিজেকে জবাবদিহির বাইরে রাখার চেষ্টা করছে।
এই নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?
ব্রিটিশ এমপিরা যেন গাজা ও পশ্চিম তীরে যেতে না পারেন। বিশ্ব যেন নিজের চোখে দেখতে না পারে সেখানে কী ঘটছে। ইসরাইলি সরকারের এই সিদ্ধান্ত আমাদের অনেক কিছু জানিয়ে দেয়। তারা চায় না বিশ্ব সত্যটি জানুক। আরও একটি বিষয় পরিষ্কার: বিশ্বজুড়ে ইসরাইলের সমর্থন কমতে থাকায় তার প্রতিক্রিয়া ক্রমেই মরিয়া এবং অযৌক্তিক হয়ে উঠছে। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের থামানোর কারণ নয়। বরং সত্য, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের দাবি আরও জোরালো করার কারণ।
আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা
অবৈধ বসতি থেকে আসা পণ্য নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই। সেই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়াতেই ইসরাইল আমাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন এখানে পরিষ্কার।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) রায় দিয়েছিল, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের উপস্থিতি বেআইনি। একই সঙ্গে আদালত রাষ্ট্রগুলোকে এই অবৈধ পরিস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা না করার বাধ্যবাধকতার কথাও বলেছিল। অবৈধ বসতি থেকে আসা পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা অনেক আগেই কার্যকর হওয়া উচিত ছিল। পশ্চিমা দেশগুলোতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র-সমর্থিত বসতিস্থাপনকারী সহিংসতার বিরোধিতা ক্রমেই বাড়ছে। যারা এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, তাদের আচরণও দেখিয়ে দেয়—ইসরাইল এতদিন কতটা দায়মুক্তি ভোগ করেছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রথম পদক্ষেপ।
কারণ অবৈধ বসতির অর্থনীতি ইসরাইলের বৃহত্তর অর্থনীতি থেকে আলাদা নয়। বসতির পণ্য শুধু বসতির ভেতরেই তৈরি হয় না; তা একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ। তাই কার্যকর নিষেধাজ্ঞা বলতে শুধু বসতির পণ্য বন্ধ করা বোঝায় না। এর অর্থ হওয়া উচিত, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের বেআইনি উপস্থিতিকে টিকিয়ে রাখে—এমন সব ধরনের বাণিজ্য ও সহায়তা বন্ধ করা।

ব্রিটেনেরও জবাবদিহি আছে
আমি আবারও এই সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি: গাজায় সংঘটিত গণহত্যাকে স্বীকার করুন। সামরিক সহযোগিতা বন্ধ করুন। এর মধ্যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ বিক্রি এবং গাজার ওপর পরিচালিত নজরদারি ফ্লাইটও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। ব্রিটেনের ভূমিকা নিয়ে একটি প্রকাশ্য তদন্তের দাবিও আমি বারবার জানিয়েছি।
কারণ প্রশ্নটি শুধু ইসরায়েলের অপরাধ নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, ব্রিটিশ সরকার সেই অপরাধের সঙ্গে কতটা জড়িত, এবং কতদিন পর্যন্ত তা অস্বীকার করে যাবে। কোনো সরকার যদি অস্ত্র সরবরাহ করে, সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখে, অথবা অপরাধের প্রমাণ দেখতে না চায়, তবে তার নিরপেক্ষতার দাবি বিশ্বাসযোগ্য থাকে না।
জবাবদিহি শুধু অন্যের জন্য নয়। নিজের সরকারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ফিলিস্তিন শুধু ধ্বংসের গল্প নয়
ফিলিস্তিনের সঙ্গে সংহতিতে আমি কতগুলো বিক্ষোভে অংশ নিয়েছি, তার হিসাব এখন আর মনে নেই। প্রতিটি বিক্ষোভে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাই ফিলিস্তিনের স্মৃতি। আমি যে কোনো বক্তৃতায় অন্তত একজন ফিলিস্তিনির কথা উদ্ধৃত করার চেষ্টা করি। কারণ দখলদারিত্ব, বর্ণবাদী শাসন ও গণহত্যা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই যাদের কথা বলি, তাদের নিজেদের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়।
সেই কণ্ঠস্বর সামনে আনা জরুরি। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতাই সবচেয়ে নির্মমভাবে সীমিত করা হয়েছে। আর সেই স্বাধীনতাই আমাদের রক্ষা করতে হবে। ইসরাইল আমাকে নিষিদ্ধ করতে পারে। কিন্তু সত্য প্রকাশ থেকে থামাতে পারবে না। তারা ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে—এই অভিযোগের তদন্ত, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের দাবি থেকে আমি সরে যাব না।
যে ফিলিস্তিনকে আমি দেখেছি
ফিলিস্তিন নিয়ে আলোচনায় আমরা প্রায়ই শুধু ভয়াবহতার গল্প শুনি। সেগুলো অবশ্যই বলা দরকার। কিন্তু আমার ফিলিস্তিন সফরগুলো আমাকে আরও কিছু দেখিয়েছে। আমি দেখেছি মানুষের মানবিকতা। শুনেছি গান। দেখেছি শিল্প, কবিতা, আনন্দ এবং বেঁচে থাকার অদম্য শক্তি। ফিলিস্তিন কোনো কেবল ধ্বংসস্তূপের ভূগোল নয়। এটি মানুষের একটি সমাজ, যার জীবনকে দখলদারিত্ব প্রতিদিন সংকুচিত করে চলেছে।
ইসরাইলি সরকারের কাছ থেকে বর্ণবাদী শাসনের একটি সাজানো সফর নেওয়ার কোনো আগ্রহ আমার নেই। আমি জানি, স্বাধীনতা কীভাবে অস্বীকার করা হয়, তা দেখার জন্য সরকারি গাইডের প্রয়োজন নেই। আমার কাছে শান্তির একমাত্র বাস্তব পথ হলো দখলদারিত্বের অবসান। ফিলিস্তিন সফরের পর বহু বছর কেটে গেছে। তবু ইসরাইল আমাদের ভয় দেখিয়ে নীরব করতে যতই চেষ্টা করুক, আমি আশা হারাইনি। একদিন হয়তো আবার সেই শিশুদের দেখতে ফিরতে পারব, যাদের সঙ্গে একসময় দেখা হয়েছিল।
একটি মুক্ত, স্বাধীন ফিলিস্তিনে।
সূত্র: জেরেমি করবিন ইজলিংটন নর্থ আসনের ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য। যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সাবেক নেতা এবং মানবাধিকারকর্মী। আল জাজিরা


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









