একসময় প্রতিবেশীরা হালিমা কেদিরকে নিয়ে হাসতেন। গাছ লাগিয়ে কী হবে—এমন প্রশ্নও শুনতে হয়েছে তাকে। কিন্তু ইথিওপিয়ার ওরোমিয়া অঞ্চলের বেরবেরে জেলার ৩৫ বছর বয়সী এই নারী থামেননি। হাজার হাজার গাছ লাগিয়েছেন তিনি। এখন তাঁর বাড়ির চারপাশে কলা, জলপাই, গ্রেভিলিয়াসহ নানা গাছের সবুজ।
হালিমা বলেন, ‘আমার প্রতিবেশীরা আমাকে নিরুৎসাহিত করত। তারা ভাবত, আমি বৃথা পরিশ্রম করছি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেকেই বুঝতে শুরু করেছে—জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যসংকট মোকাবিলায় গাছ আমাদের সমস্যার একটি সমাধান হতে পারে।’
ইথিওপিয়া গত কয়েক দশকে ব্যাপক বন উজাড়ের শিকার হয়েছে। ২০০০ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশটি প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদন হারিয়েছে। কৃষিজমির সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিকভাবে কাঠ কাটা এবং জ্বালানি হিসেবে কাঠকয়লার ব্যবহার এর বড় কারণ। এতে জীববৈচিত্র্য, মাটির গুণমান ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়েছে।
পরিস্থিতি বদলাতে ২০১৯ সালে সরকার শুরু করে ‘গ্রিন লিগ্যাসি ইনিশিয়েটিভ’। এর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে গাছ লাগানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও যুক্ত করা হচ্ছে। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইথিওপিয়ায় বার্ষিক বন উজাড়ের হার ৯২ হাজার হেক্টর থেকে কমে ২৭ হাজার ৭০৩ হেক্টরে নেমেছে। একই সময়ে সরকারি হিসাবে বনভূমির পরিমাণ ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।
সরকারের দাবি, গ্রিন লিগ্যাসি কর্মসূচির আওতায় সাত বছরে ৪৮ বিলিয়ন গাছ লাগানো হয়েছে। ২০১৯ সালে একদিনেই ৩৫ কোটি ৩০ লাখ চারা লাগানোর কথাও জানিয়েছিল সরকার। এখন লক্ষ্য—২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন গাছ লাগানো।
হালিমার কাজ দেখে তার প্রতিবেশী ফাতে আবদুলাহিও গাছ লাগানো শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ‘সে আমাদের ভুল প্রমাণ করেছে এবং এখন সে আমাদের জন্য একটি উদাহরণ। আমাদের সমস্যার স্থানীয় সমাধান খুঁজতে সে এগিয়ে এসেছে।’
হালিমা ওরোমো জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের ঐতিহ্যে ‘গুদ্দিফাচা’ নামে একটি প্রথা আছে—কোনো শিশুকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে তাকে পরিবার ও সমাজের অংশ করে নেওয়া। হালিমা তার চারাগুলোকেও নিজের সন্তানের মতো দেখেন। তার ভাষায়, ‘আমাদের ঐতিহ্যে যেমন একটি শিশুকে দত্তক নিই, আমি গাছগুলোকেও আমার নিজের সন্তান মনে করি।’

বেরবেরেতে পানির সংকট তীব্র। চারাগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হালিমাকে প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে পানি আনতে হয়। তার ১৩ বছর বয়সী ছেলে আনোয়ার হাসেন মায়ের কাজ দেখে গর্বিত। সে বলে, ‘আমি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সারা জীবন নিজেকে যুক্ত রাখতে চাই।’
এখন আশপাশের হাজার হাজার পরিবারও গাছ লাগানোর উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। ওয়াটারএইড ইথিওপিয়ার সহায়তায় একসময় অবক্ষয়িত জমিগুলো সবুজ হয়ে উঠছে।
ওয়াটারএইড ইথিওপিয়ার পরিচালক আলেবাচেউ আদেম জানান, এ পর্যন্ত পরিবার ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৫৫ হাজার স্থানীয় প্রজাতির গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। এর প্রায় ৮৫ শতাংশ সফলভাবে বেড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘বেরবেরের মতো শুষ্ক ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের উদ্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।’
৫০ বিলিয়ন গাছের লক্ষ্যটি বড়। কিন্তু ইথিওপিয়ার এই উদ্যোগের গল্প শেষ পর্যন্ত সংখ্যার গল্প নয়। এটি হালিমার মতো মানুষের গল্প—যারা একটি করে চারা মাটিতে পুঁতে, এক কলস পানি ঢেলে, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া সবুজকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









