একটি ছোট্ট মেয়ে। বয়স মাত্র ৯ বছর। পরনে সাদামাটা পোশাক, সঙ্গে ভাই রাজু আর পোষা টিয়া মিঠু। কিন্তু এই মেয়েটিই কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়ার লাখো শিশুর কাছে সাহস, অধিকার আর সমতার প্রতীক। সে মীনা।
২৪ সেপ্টেম্বর মীনা দিবস। শিশুদের অধিকার, শিক্ষা, সমতা ও সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজ ও আনন্দময় গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতেই মীনা চরিত্রের সৃষ্টি। নব্বইয়ের দশকে ইউনিসেফের উদ্যোগে তৈরি এই চরিত্র সময়ের সঙ্গে শুধু একটি কার্টুন চরিত্র হয়ে থাকেনি, বরং শিশুদের নানা সামাজিক সমস্যা নিয়ে কথা বলার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
যেভাবে জন্ম মীনার
১৯৯০ থেকে ২০০০ সালকে মেয়েশিশুর দশক হিসেবে উদযাপনের উদ্যোগ নেয় ইউনিসেফ। দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েশিশু, তাদের পরিবার ও সমাজকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি উৎসাহিত করতে একটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র সিরিজ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। সেই সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবেই আসে মীনা।
মীনার চেহারা ও নাম নির্ধারণের আগে নেওয়া হয় নানা গবেষণা। চারটি দেশের শিল্পীরা দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের আদলে কয়েক ডজন ছবি আঁকেন। মীনার পোশাক ও জীবনযাপন কেমন হবে, তা নিয়েও মতামত নেওয়া হয় ১০ হাজারের বেশি শিশুর কাছ থেকে।
বাংলাদেশেই প্রথম পর্দায়
বাংলাদেশে মীনার যাত্রা শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মুরগিগুলো গুনে রাখো’ পর্বটি সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে মীনা প্রথম দর্শকদের সামনে আসে। গল্পটিতে স্কুলে যাওয়ার জন্য মীনার সংগ্রাম তুলে ধরা হয়।
এরপর ধীরে ধীরে মীনার গল্প ছড়িয়ে পড়ে টেলিভিশনের বাইরে। তৈরি হয় রেডিও অনুষ্ঠান, কমিক বই ও নানা ধরনের শিক্ষামূলক উপকরণ। মীনার গল্প ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানের শিশুদের কাছেও পৌঁছে যায়।
গল্পের আড়ালে বড় বার্তা
মীনার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শিশুদের কাছে কঠিন সামাজিক বিষয়গুলো সহজভাবে তুলে ধরা। লিঙ্গসমতা, শিশুর অধিকার, শিক্ষা, সুরক্ষা ও উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো মীনার বিভিন্ন গল্পে উঠে এসেছে।
মীনা কখনো স্কুলে যাওয়ার অধিকার নিয়ে কথা বলে, কখনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। তার গল্পে মেয়েশিশুর সমান অধিকার, ভালোবাসা, যত্ন ও মর্যাদার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। ফলে বিনোদনের পাশাপাশি গল্পগুলো শিশুদের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা তৈরির মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।
মীনা শুধু কার্টুন নয়
সময় গড়ানোর সঙ্গে মীনা চরিত্রের পরিধিও বেড়েছে। টেলিভিশনের পাশাপাশি কমিক বই, পোস্টার, রেডিও অনুষ্ঠান ও শিক্ষকদের জন্য বিভিন্ন উপকরণে মীনা এসেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, টেলিভিশনে মীনার ২৬টি পর্ব তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে মীনার জনপ্রিয়তার একটি বড় দৃষ্টান্ত হলো তাকে চেনা শিশুর সংখ্যা। ইউনিসেফের হিসাবে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলের ৮১ শতাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী মীনাকে চেনে।
সাংবাদিকতায়ও মীনার ছাপ
মীনার কাজ শুধু শিশুদের বিনোদন দেওয়া কিংবা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিশুদের নিয়ে সাংবাদিকদের আরও দায়িত্বশীল ও মানসম্মত প্রতিবেদন তৈরিতে উৎসাহ দিতে ২০০৫ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশ চালু করে মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড। শিশু অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে করা সাংবাদিকতার স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
প্রজন্ম পেরিয়ে মীনা
মীনার বয়স গল্পে নয় বছরই। কিন্তু তাকে ঘিরে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের বয়স এখন অনেক বেশি। যে শিশুরা একসময় টেলিভিশনের পর্দায় মীনার গল্প দেখত, তাদের অনেকেই এখন নিজেদের সন্তানদের সেই গল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।
এভাবেই মীনা প্রজন্ম পেরিয়ে টিকে আছে। তার গল্পের অনেক বিষয় আজও প্রাসঙ্গিক—স্কুলে যাওয়ার অধিকার, বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান, শিশুর সুরক্ষা এবং সমান মর্যাদার দাবি।মীনা তাই শুধু একটি কার্টুন চরিত্র নয়; শিশুদের অধিকার ও সমতার কথা বলার দীর্ঘদিনের এক পরিচিত কণ্ঠ। ২৪ সেপ্টেম্বরের মীনা দিবস সেই কণ্ঠের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









