বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়ার ফলে পৃথিবীতে তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল ও শক্তিশালী ঝড়ের মতো নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এর প্রভাব হয়তো আরও গভীরে পৌঁছাচ্ছে—মানুষের শরীরের ভেতরেও।
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়ার সঙ্গে মানুষের রক্তের কিছু রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘এয়ার কোয়ালিটি’, ‘অ্যাটমসফিয়ার অ্যান্ড হেলথ’ সাময়িকীতে। গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই প্রবণতা ভবিষ্যতে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড, রক্তের পরিবর্তন
মানুষের বিবর্তনের দীর্ঘ সময়জুড়ে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল—প্রায় ২৮০ পার্টস পার মিলিয়ন বা পিপিএম। শিল্পবিপ্লবের পর জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সেই মাত্রা দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
গবেষণায় অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটির পরিবেশস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক আলেকজান্ডার লারকম্ব এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিষয়ক বিজ্ঞানী ফিল বিয়ারওয়ার্থ যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন।
তারা ১৯৯৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার মানুষের রক্তের বিভিন্ন উপাদানের তথ্য পরীক্ষা করেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—প্রায় ৩৬৯ পিপিএম থেকে ৪২০ পিপিএম।
গবেষকদের নজরে আসে, এই সময়ে রক্তে বাইকার্বোনেটের মাত্রা প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে রক্তে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রা কমেছে।
কেন বাড়ছে বাইকার্বোনেট?
রক্তে বাইকার্বোনেট একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান। এটি শরীরের অম্ল-ক্ষার বা অ্যাসিড-বেস ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে। রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়লে শরীর সেই অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড সামাল দিতে বাইকার্বোনেটের পরিমাণ বাড়াতে পারে।
সহজভাবে বললে, শরীর যেন রক্তের অম্লতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিজের ভেতর একটি রাসায়নিক ‘ঢাল’ তৈরি করে।
গবেষক আলেকজান্ডার লারকম্বের মতে, রক্তে বাইকার্বোনেটের মাত্রা বাড়া শরীরের অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর একটি লক্ষণ হতে পারে।
তবে শরীরের এই সামঞ্জস্য করার ক্ষমতারও সীমা আছে।
স্বল্প সময়ের জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর মাত্রা বেশি হলে মাথাব্যথা, ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর সংস্পর্শে থাকলে প্রাণীর ওপর করা গবেষণায় অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রদাহ এবং কিডনি ও ধমনিতে টিস্যুতে ক্যালসিয়াম জমার মতো সম্ভাব্য সমস্যার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসও কমছে
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই সময়ে রক্তে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রাও কমেছে।
শরীর অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড সামলানোর সময় হাড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাড় শরীরের অতিরিক্ত অ্যাসিড-ক্ষার ভারসাম্য সামলাতে সাহায্য করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মতো খনিজের ওপরও চাপ পড়ে।
১৯৯৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গবেষণায় অংশ নেওয়া মানুষের রক্তে ক্যালসিয়াম প্রায় ২ শতাংশ এবং ফসফরাস প্রায় ৭ শতাংশ কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এখনই মানুষের শরীরে ক্যালসিয়াম বা ফসফরাসের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। গবেষকেরা মূলত দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রবণতা শনাক্ত করেছেন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কতা
গবেষকেরা বর্তমান প্রবণতা একইভাবে চলতে থাকলে কী হতে পারে, তার একটি হিসাবও করেছেন। তাদের মডেল অনুযায়ী, রক্তে বাইকার্বোনেটের মাত্রা প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে বর্তমানে গ্রহণযোগ্য স্বাস্থ্যসীমার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের ক্ষেত্রেও শতাব্দীর শেষ দিকে স্বাস্থ্যসীমার নিচের দিকে পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।
তবে গবেষকেরা নিজেরাই সতর্ক করেছেন—এগুলো অনুমান। ভবিষ্যতে পরিবর্তনের গতি একই থাকবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। মানুষের জীবনযাপন, পরিবেশ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির হারও এতে প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষণাটি কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি ও রক্তের রাসায়নিক পরিবর্তনের মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখিয়েছে; এটি সরাসরি প্রমাণ করেনি যে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড-ই এই পরিবর্তনের একমাত্র কারণ।
শরীর কি মানিয়ে নিতে পারবে?
মানুষের শরীর পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে। এখন পর্যন্ত আমাদের শরীরও বায়ুমণ্ডলে বাড়তে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সামঞ্জস্য করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সামঞ্জস্য করার ক্ষমতারও কি একটা সীমা আছে?
গবেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড আরও বাড়তে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখার ব্যবস্থা ধীরে ধীরে চাপের মুখে পড়তে পারে। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর বর্তমান বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে রক্তের রাসায়নিক পরিবর্তন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই জলবায়ু পরিবর্তন শুধু গরম পৃথিবী, গলতে থাকা হিমবাহ কিংবা বাড়তে থাকা ঝড়ের গল্প নয়। এর প্রভাব মানুষের শরীরের ভেতরেও পৌঁছাতে পারে।
ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এখনই বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমানোর চেষ্টা জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









