দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ প্রকাশ না করেই দেহে লুকিয়ে থাকতে পারে ডায়াবেটিস। তাই ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সব সময়ই সচেতন থাকতে হয়। ডায়াবেটিসের কারণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে লিখেছেন ডা. মোহনা জামান
বিপাকীয় রোগ ডায়াবেটিস। বিভিন্ন কারণে এই রোগ হয়ে থাকে। কারণ অনুযায়ী রোগের ধরনও আলাদা। সব ধরনের ডায়াবেটিসের মূল লক্ষণ রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। এর ফলে দেহে অনেকগুলো জটিল সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার প্রায় ১৩.২ শতাংশ।
অর্থাৎ প্রায় প্রতি আটজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত; মোট সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৩৯ লাখ। বিশ্বের মোট ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের হার সবচেয়ে বেশি। এই রোগের উপসর্গ সহজে প্রকাশিত হয় না। লুক্কায়িত থেকে দিনের পর দিন দেহের ক্ষতি করতে থাকে।
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা দেখা দেওয়ার পরই রোগটি শনাক্ত হয়। তত দিনে চোখ, কিডনি, স্নায়ু কিংবা হৃদরক্তনালিতে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়। তাই এর প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
ডায়াবেটিস কেন হয়
মানবদেহে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয় শর্করা। খাবারে থাকা শর্করা হজমের পর গ্লুকোজে পরিণত হয়।
গ্লুকোজকে রক্ত থেকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হরমোন ইনসুলিন। কোষের মধ্যে গ্লুকোজকে অক্সিডাইজ করে শক্তি উৎপাদন করা হয়। দেহে
পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি না হলে অথবা তৈরি হওয়া ইনসুলিন
ঠিকমতো কাজ না করলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়। এই অবস্থাকে চিকিৎসার ভাষায় বলা হয় ডায়াবেটিস।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের কারণ দেহে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন উৎপাদন না হওয়া। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কোনো কারণে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরিকারী কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে এটি দেখা দেয়। শিশু-কিশোরদের মধ্যে টাইপ-১ ডায়াবেটিস বেশি দেখা যায়। তবে এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে এবং প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই। দেহ সঠিকভাবে ইনসুলিন ব্যবহার করতে না পারলেই টাইপ-২ ডায়াবেটিস দেখা দেয়। এক পর্যায়ে ইনসুলিন উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। বেশির ভাগ ডায়াবেটিক রোগীই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভুগছে। দেহের অতিরিক্ত ওজন, নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনসহ বিভিন্ন কারণে এটি হয়ে থাকে।
ঝুঁকিতে কারা
পরিবারে মা-বাবা বা ভাই-বোনের ডায়াবেটিস থাকলে ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দেহের অতিরিক্ত ওজন, শরীরচর্চা না করা, উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।। দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীতে তুলনামূলক কম বয়স ও কম ওজনেই টাইপ-২ ডায়াবেটিস দেখা যায়। তাই ওজন কম থাকলে ডায়াবেটিস হবে না—এমন ধারণা ভুল। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হয়েছিল এমন নারী এবং কোনো সময় রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে কিন্তু এখন গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক—এমন ব্যক্তিদেরও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
লক্ষণ
খুব বেশি তৃষ্ণা পাওয়া
ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
অস্বাভাবিক ক্লান্তি
কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া
ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া।
এগুলো ডায়াবেটিসের অতি পরিচিত লক্ষণ। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ঘন ঘন সংক্রামক ব্যাধিও দেখা দিতে পারে। তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে এসব লক্ষণ অনেক সময় খুব মৃদু অবস্থায় থাকে। অনেক সময় বছরের পর বছর কোনো লক্ষণই না-ও থাকতে পারে। এ কারণেই শুধু লক্ষণের অপেক্ষায় থাকা ঠিক নয়। ঝুঁকির কারণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তে গ্লুকোজ বা HbA1c পরীক্ষা করা যেতে পারে। ডায়াবেটিস নির্ণয়ে উপবাস অবস্থায় রক্তে গ্লুকোজ, HbA1c কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট ব্যবহার করা হয়।
প্রি-ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস দেখা দেয়নি কিন্তু রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, এমন অবস্থাকে বলা হয় প্রি-ডায়াবেটিস। জীবনযাত্রা পরিবর্তন করে প্রি-ডায়াবেটিক অবস্থায় থেকেও ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায়। ওজন নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং নিয়মিত ব্যায়াম করলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রায় ব্যায়াম করা জরুরি। খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে শাক-সবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও বাদাম। চিনিযুক্ত পানীয় ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণও কমাতে হবে। নইলে প্রি-ডায়বেটিস থেকে টাইপ-২ ডায়বেটিস দেখা দেওয়ার ঝুঁকি আছে।
দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা
দীর্ঘদিন ধরে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি থাকলে ছোট-বড় রক্তনালি এবং স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে বাড়ে হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনির রোগ, দৃষ্টিশক্তি হারানো, পায়ের ঘা, সংক্রমণজনিত নানা রোগের ঝুঁকি। গুরুতর ক্ষেত্রে অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজনও হতে পারে। ডায়াবেটিস নিয়ে সচেতনতার অর্থ শুধু মিষ্টি কম খাওয়া নয়; বরং লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই পরীক্ষা করা এবং প্রি-ডায়াবেটিস পর্যায়েই জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









