মানবদেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট ও ট্রেস মিনারেল সেলেনিয়াম। দেহের সুস্থতা ধরে রাখার পাশাপাশি আর্সেনিকের বিষক্রিয়া থেকেও দেহকে রক্ষা করতে পারে এটি। সেলেনিয়ামের উৎস, ঘাটতির কারণ এবং মানবদেহে এর ক্রিয়াকলাপ নিয়ে লিখেছেন ডা. শাহজাদা সেলিম।
সেলেনিয়ামের ভালো উৎস ব্রাজিল নাটস
মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কোষগুলোকে অক্সিডেশন থেকে রক্ষা করা, থাইরয়েড হরমোনের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রজননস্বাস্থ্য ধরে রাখতে কাজ করে সেলেনিয়াম। প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক সেলেনিয়াম চাহিদা মাত্র ৫৫ মাইক্রোগ্রাম।
গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে সেটি ৬০-৭০ মাইক্রোগ্রাম হয়ে থাকে। আমাদের দেশের মানুষ দৈনিক কতটুকু সেলেনিয়াম গ্রহণ করে এ নিয়ে গবেষণা অপ্রতুল। তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৈনিক সেলেনিয়াম গ্রহণের মাত্রা তুলনামূলক কম, দিনে ২৮ থেকে ৩৫ মাইক্রোগ্রাম। দৈনিক চাহিদার প্রায় অর্ধেক মাত্রায় সেলেনিয়াম গ্রহণকারীর সংখ্যা নেহাত কম নয়।
তাই ধারণা করা হয়, দেশের অনেকেই হয়তো কমবেশি সেলেনিয়াম ঘাটতিতে ভুগছেন। উদ্ভিজ্জ খাবারে সেলেনিয়ামের পরিমাণ মাটির ধরনের ওপর নির্ভরশীল। উত্তরবঙ্গের মাটিতে সেলেনিয়ামের মাত্রা তুলনামূলক বেশি, তাই এ অঞ্চলে সেলেনিয়াম ঘাটতি তেমন দেখা যায় না।
কারা ঝুঁকিতে
সঠিক পরিমাণে সুষম খাবার খেলে দেহে সেলেনিয়াম ঘাটতির আশঙ্কা কম। যারা দীর্ঘদিন ধরে ভাত-ভর্তা খেয়ে আসছে, ডাল বা প্রাণিজ আমিষ গ্রহণ করছে না, তাদের দেহে সেলেনিয়াম ঘাটতি দেখা দিতে পারে। অপুষ্টি কিংবা অন্ত্রে পুষ্টি শোষণে সমস্যা থাকলেও সেলেনিয়াম ঘাটতির ঝুঁকি বাড়ে। কিডনি ডায়ালিসিস রোগীদের মধ্যেও সেলেনিয়াম ঘাটতি দেখা যায়। এ ধরনের রোগীদের জন্য বিশেষায়িত ডায়েট বা সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।
ঘাটতির লক্ষণ
সেলেনিয়াম ঘাটতির লক্ষণ সহজে বোঝা যায় না। দীর্ঘদিনের ঘাটতিতে পেশির দুর্বলতা বা পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। থাইরয়েড হরমোনের বিপাকেও এর ভূমিকা রয়েছে। তাই সেলেনিয়াম ঘাটতি হলে থাইরয়েডের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে। সেলেনিয়াম ঘাটতি গুরুতর অবস্থায় পৌঁছলে হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
মনে রাখতে হবে, দুর্বলতা, ক্লান্তি, পেশির সমস্যা কিংবা থাইরয়েডের অস্বাভাবিকতা শুধু সেলেনিয়াম ঘাটতির কারণে হয় না। তাই লক্ষণ দেখে নিজে থেকে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়। যারা দীর্ঘদিন ধরে সেলেনিয়ামসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করছে না, তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে তবেই সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করবেন চিকিৎসক।
কী খাবেন
সেলেনিয়ামের ভালো উৎস দেশীয় ছোট মাছ, ডিম, লাল মাংস, মুরগি ও দুগ্ধজাত খাবার। চাল, গম, ডালসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ খাবারেও স্বল্প মাত্রায় সেলেনিয়াম থাকে। তবে সেলেনিয়ামের মাত্রা কম এমন মাটিতে জন্মানো শস্যে সেলেনিয়াম কম থাকে। সেলেনিয়ামের সেরা উৎস ব্রাজিল নাট। মাত্র একটি বা দুটি ব্রাজিল নাট খেলেই দৈনিক প্রয়োজনের সমপরিমাণ বা তারও বেশি সেলেনিয়াম পাওয়া যায়।
আর্সেনিক ও সেলেনিয়াম
আর্সেনিকের ক্ষতিকারক প্রভাব কমাতে সেলেনিয়াম কার্যকর। আর্সেনিকযুক্ত পানি ব্যবহার করে এমন ব্যক্তিদের ওপর চালানো গবেষণায় দেখা যায়, সেলেনিয়ামসমৃদ্ধ ডাল খাওয়ার পর প্রস্রাবের মাধ্যমে আর্সেনিক শরীর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ সেলেনিয়াম গ্রহণ করলে আর্সেনিক পয়জনিংয়ের হার কমে। তবে এ বিষয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
বেশি খেলেও বিপদ
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মাত্রায় সেলেনিয়াম গ্রহণ করলে দেহে নানা রকম সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে—
চুল ও নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া
বমিভাব বা বমি হওয়া
ত্বকের সমস্যা, যেমন—র্যাশ বা চুলকানি
স্নায়বিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
তাই প্রয়োজন ছাড়া সেলেনিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ একেবারেই অনুচিত। দেহে সেলেনিয়াম ঘাটতি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি এড়াতে সঠিক খাবার গ্রহণ করাই শ্রেয়।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









