রোমার বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে আবারও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। তবে কোচ হোসে মোরিনিওর শেষ মুহূর্তের কৌশলগত পরিবর্তনে ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। তচুয়ামেনি ও ফেদেরিকো ভালভার্দের মাঝমাঠের জুটি ভেঙে আরদা গুলের ও বার্নার্দো সিলভাকে নামানোর পরই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।
মাঠের বাইরেও অস্থিরতা চলছে রিয়ালে। রোমের স্তাদিও অলিম্পিকোতে সমর্থকদের গ্যালারিতে দেখা গেছে জুনের নির্বাচনে ক্লাবের সভাপতি পদপ্রার্থী এনরিকে রিকেলমের নতুন সদস্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের লোগোসংবলিত ব্যানার। মাঠের ভেতরে অবশ্য রিয়ালের প্রধান সমস্যা হয়ে উঠেছে দলের ভারসাম্যহীনতা।
মাঝমাঠের জুটি নিয়ে প্রশ্ন
সতর্ক ও রক্ষণাত্মক ফুটবলের জন্য পরিচিত মরিনহো পূর্ণ শক্তির দল পাওয়ার পর তচুয়ামেনি ও ভালভার্দেকেই মাঝমাঠের সেরা জুটি মনে করেছিলেন। ফরাসি মিডফিল্ডার চোট কাটিয়ে ফেরার পর এলচে, আতলেতিকো মাদ্রিদ, ভিয়ারিয়াল ও রোমার বিপক্ষে টানা চার ম্যাচে তাদের একসঙ্গে খেলিয়েছেন তিনি।
কিন্তু শেষ দুই ম্যাচে এই জুটি ভাঙার পরই জয় পেয়েছে রিয়াল। আতলেতিকোর বিপক্ষেও শেষ দিকে তচুয়ামেনিকে ছাড়া এবং বার্নার্দোকে নিয়ে খেলেই আশার আলো দেখেছিল দলটি। তবু মরিনহো নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে ছিলেন। রোমার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘ম্যাচের শেষ দিকে যারা খেলেছে, তাদের দিয়ে শুরু করলে ওরা আমাদের পাঁচ গোল দিত।’
গুলেরকে নিয়ে মরিনহোর অবস্থানও বদলাতে হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি বলেছিলেন, মাঝমাঠের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় খেলার জন্য এই তুর্কি তরুণ যথেষ্ট পরিণত নন। শুরুতে তাকে আক্রমণভাগের কাছাকাছি খেলাতে চাইলেও রোমা ও ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে পরিস্থিতির কারণে মাঝমাঠে নামাতে হয় তাকে। অন্যদিকে ৩২ বছর বয়সী বার্নার্দো সিলভা মৌসুমের শুরুতে নিয়মিত একাদশে থাকলেও এলচে, আতলেতিকো ও ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে আগের তিন ম্যাচ মিলিয়ে খেলেছিলেন মাত্র আট মিনিট।

রক্ষণে দুর্বলতা, আক্রমণে বিচ্ছিন্নতা
রিয়ালের বড় সমস্যা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের রক্ষণে পর্যাপ্ত অবদান না রাখা। ফলে মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগকে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে।
রোমার বিপক্ষে প্রথমার্ধে রিয়ালের ছয় খেলোয়াড় নিজেদের অর্ধে প্রতিপক্ষের চাপে আটকে ছিলেন। অন্যদিকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, দিয়োমান্দে, জুড বেলিংহাম ও কিলিয়ান এমবাপ্পে ছিলেন প্রতিপক্ষের অর্ধে। দুই অংশের মধ্যে কার্যকর সংযোগ ছিল না।
পরিস্থিতি বোঝাতে একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া রিয়ালের হয়ে ৫৫টি পাস দিয়েছেন, যা দলের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তার চেয়ে বেশি পাস দিয়েছেন শুধু কোনাতে—৫৮টি। অপ্টার হিসাবে, চলতি মৌসুমে কোর্তোয়ার ম্যাচপ্রতি পাসের গড় ২৮। রোমার বিপক্ষে সংখ্যাটি প্রায় দ্বিগুণ হওয়া রিয়ালের ওপর চাপেরই প্রমাণ।
গুলেরের বদলেই আক্রমণে গতি
ম্যাচের প্রায় এক ঘণ্টা পর ৩-১ গোলে পিছিয়ে থাকা রিয়াল মূল পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। গুলের মাঠে নামেন এবং ভালভার্দে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ডান প্রান্তের রক্ষণে খেলেন। ৭০ মিনিটে বার্নার্দো সিলভাকে নামিয়ে তচুয়ামেনিকে তুলে নেন মরিনহো। ৩৭ মিনিট মাঠে থেকে গুলের দলের হয়ে সর্বোচ্চ তিনটি গোলের সুযোগ তৈরি করেন এবং আটটি ক্রস দেন। তিনি ৩৭টি আক্রমণাত্মক কার্যক্রমে অংশ নেন। অন্যদিকে ভালভার্দে ৯৭ মিনিটে অংশ নেন ৪৭টি কার্যক্রমে। গুলের ২৭টি পাস দেন, ভালভার্দে ৩১টি।
গুলেরের ক্রস কাজে লাগান এন্দ্রিক ও এস্পি। ভিনিসিয়ুসের জায়গায় ৫৯ মিনিটে মাঠে নামা এন্দ্রিক চলতি মৌসুমে এর আগে খেলেছিলেন মাত্র চার মিনিট। বেঞ্চে বসে তিনি ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলছিলেন বলে জানান, কারণ এত দ্রুত মাঠে নামবেন ভাবেননি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন এই ব্রাজিলিয়ান। পরিসংখ্যানেও রিয়ালের পরিবর্তন স্পষ্ট। ৮০ মিনিট পর্যন্ত দলটি নয়টি শট নেয়, যার তিনটি ছিল লক্ষ্যে। শেষ ১৫ মিনিট ও যোগ করা সময়ে আরও সাতটি শট নেয় তারা, যার পাঁচটি লক্ষ্যে ছিল।

নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে মরিনহো
ম্যাচ শেষে মরিনহো বলেন, রোমার মতো গতিময় ও আক্রমণাত্মক দলের বিপক্ষে শুরু থেকেই শেষ দিকে মাঠে থাকা খেলোয়াড়দের নামালে টিকে থাকা কঠিন হতো।
তার ভাষায়, ‘কৌশল প্রয়োগের সময় কখনো কোচকে বোকা মনে হয়, আবার কখনো মনে হয় তিনি খুব ভালো কাজ করেছেন। ৩-১ থেকে ৩-৪ করার সবকিছু আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছিলাম, এমন দাবি করছি না। তবে শেষ ২০ মিনিটে পরিবর্তন আনার মতো খেলোয়াড় আমার হাতে ছিল। আমাকে কিছু কৃতিত্ব তো দিতেই পারেন।’
রোমার বিপক্ষে জরুরি পরিকল্পনা রিয়ালকে স্বস্তি দিলেও মাঝমাঠের জুটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তচুয়ামেনি ও ভালভার্দের প্রতি মোরিনিওর আস্থা অটুট, কিন্তু সাম্প্রতিক ম্যাচের ফল বলছে, গুলের ও বার্নার্দো সিলভার মতো খেলোয়াড়দের ভূমিকা নতুন করে ভাবতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









