রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

সরকার বদলালেও বদলায়নি হাসপাতালের ভাগ্য

নামে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, বাস্তবে চিকিৎসাহীন এক নীরব ভবন

প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০০ পিএম

আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০০ পিএম

নামে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, বাস্তবে চিকিৎসাহীন এক নীরব ভবন

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র

নামের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই—মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। নাম শুনলে মনে হয়, এখানে মা ও শিশুর জন্য থাকবে নিরাপদ চিকিৎসা, আস্থা আর ভরসা। কিন্তু বাস্তবে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আলোকঝাড়ী ইউনিয়নে দাঁড়িয়ে থাকা ১০ শয্যাবিশিষ্ট এই কেন্দ্র যেন নীরব এক স্মৃতিস্তম্ভ—ভবন আছে, বেড আছে, রোগী আছে; নেই শুধু চিকিৎসা।

প্রায় এক যুগ আগে বড় স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু। দিনাজপুর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ২০১৪ সালের ১০ মে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন হয় কেন্দ্রটির। উদ্বোধনের ফিতা কেটেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। উদ্বোধনের দিন মানুষ ভেবেছিল—এবার বুঝি গরিব মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছাবে। কিন্তু সময় গড়াল, বছর পেরোল—কেন্দ্রের দরজায় চিকিৎসক আর এলেন না।

আজ দীর্ঘ সাত বছর ধরে এই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সিজারিয়ান তো দূরের কথা, একজন এমবিবিএস চিকিৎসকও নিয়মিত নেই। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শুধু স্বাভাবিক প্রসব করাতে একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন পাহারাদার আর একজন ঝাড়ুদার—এই নিয়েই চলছে ‘হাসপাতাল’।

ভবনের ভেতরের চিত্রও হতাশাজনক। দেয়ালের এপাশ-ওপাশে ফাটল, কোথাও রড বেরিয়ে আসছে। নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তারের কারণে মাঝেমধ্যেই শর্টসার্কিটের ভয়। চিকিৎসা সরঞ্জাম বসানো তো দূরের কথা, যা আছে তাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বারবার।

সেবা নিতে আসা বেলি আক্তার কণ্ঠে হতাশা লুকাতে পারেন না। তিনি বলেন, “এখানে এসে কোনো লাভ নাই। শুধু চেকআপ ছাড়া আর কিছুই হয় না। সেটাও মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যায়।”

আরেক ভুক্তভোগী শিউলি কোলে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, “মেয়ের অনেক জ্বর। এখানে ডাক্তার নাই, তাই বাইরে নিয়ে যাচ্ছি। নাম আছে মা ও শিশু, কামে তো কিছুই আসে না।”

পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক আরফান সিরাজ জানালেন ভিন্ন এক বাস্তবতা, “ভবনের তার খুবই নিম্নমানের। বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে নিজেরাই কিছু অংশ মেরামত করেছি।”

উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার সীমা নাথ বলেন, “জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। তারপরও যতটুকু লোকবল আছে, তা দিয়ে চেষ্টা করছি। এখানে মাসে ৮–১০ জনের স্বাভাবিক প্রসব হয়।”

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অতিরিক্ত কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, “আমরা বারবার চিকিৎসকের চাহিদা পাঠিয়েছি। আশা করছি ডাক্তার নিয়োগ হবে। এই সংকট শুধু খানসামায় নয়, সারা দেশেই আছে।”

জানতে চাওয়া হয়েছিল দিনাজপুর জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরর নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য। কিন্তু একাধিকবার ফোন করেও কোনো সাড়া মেলেনি।

তবে আশার বাণী শুনিয়েছেন দিনাজপুর-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামান মিয়া। তিনি এক সভায় বলেছেন, হাসপাতালের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। হাসপাতালের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। ঢাকায় গিয়ে মহাপরিচালক ও মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এখানে আমাদের ডাক্তার আনার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ছয় মাসের মধ্যেই ডাক্তার আসবে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসেও বদলায়নি চিত্র। এখন সাধারণ মানুষ তাকিয়ে আছে নতুন করে গঠিত বিএনপি সরকারের দিকে—এই ভরসায়, হয়তো এবার অন্তত একজন চিকিৎসক আসবেন, যন্ত্রপাতি আসবে, প্রাণ ফিরে পাবে নামেই নয়, কাজে-ও মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র।

ততদিন পর্যন্ত আলোকঝাড়ীর এই হাসপাতাল দাঁড়িয়ে থাকবে—স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে, এক নিঃশব্দ অপেক্ষায়।

 

কাওছার আল হাবীব/এদিন

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.