বহু বছরের সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) চলমান সত্ত্বেও সারাদেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে হাম। এবারের প্রাদুর্ভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার কিছু দুর্বলতারও ইঙ্গিত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও হামের টিকার গুরুত্ব কমেছিল। সম্প্রসারিত টিকা কর্মসূচির বাইরে গিয়েও দুটি টিকা অতিরিক্ত হিসেবে দেওয়া হতো, যা ২০২৪-২৫ সালে হয়নি। এ অবস্থায় হাম সারাদশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তর্কাতর্কির মধ্যেই হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে ভিড় করছেন অভিভাবকরা।
জানা গেছে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শ্বাসনালীর মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসে ভেসে থাকা ভাইরাসের মাধ্যমে অন্যরা সহজেই সংক্রমিত হতে পারে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি আশপাশের অধিকাংশ সংবেদনশীল মানুষকে সংক্রমিত করতে সক্ষম, ফলে দ্রুত বিস্তার লাভ করে এ রোগ। ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় এই ঝুঁকি আরও বেশি।
চিকিৎসকদের মতে, হামের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং কয়েকদিন পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। সাধারণত সংক্রমণের ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এসব উপসর্গ প্রকাশ পায়। অনেক ক্ষেত্রে একে সাধারণ সর্দি-জ্বর ভেবে অবহেলা করা হয়, যা পরবর্তীতে জটিলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। হামের জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) পর্যন্ত হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মতে, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকাদান। বাংলাদেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে এমআর টিকা দেওয়া হয়। তবে এখনও অনেক শিশু এই টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা সংক্রমণ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।
হাম প্রতিরোধে বর্তমান সরকার পুরোপুরি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এ হামজনিত নিউমোনিয়া শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় বাবল সিপ্যাপের ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হঠাৎ করে হাম রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের তেমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না। তবে অল্প সময়ে হাম প্রতিরোধে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি আরও বলেন, আগামী রোববার থেকে সারাদেশে হামের টিকা দেওয়া শুরু হবে। এতগুলো শিশু মৃত্যুর ঘটনায় আমি মর্মাহত। ঢাকা ও রাজশাহীসহ সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলেন, এরইমধ্যে হামের চিকিৎসায় কয়েকটি হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। রাজশাহী ও মানিকগঞ্জে ভেন্টিলেটর ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্স প্রস্তুত রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে, যার প্রভাব এখনও দেখা যাচ্ছে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ের টিকা নিতে পারেনি, ফলে তারা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা ও গুজবও কিছু ক্ষেত্রে অভিভাবকদের নিরুৎসাহিত করছে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর টিকাদান কার্যক্রম জোরদার এবং নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শিশুর বয়স অনুযায়ী সব টিকা সময়মতো নিশ্চিত করতে হবে। হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে। পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও জরুরি।
হাম বেড়ে যাওয়ার ছয়টি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, অর্থায়ন সংকটে সেক্টর প্রোগ্রাম স্থগিত, ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক বিতরণ না হওয়া এবং প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এসব কারণ মিলিত হওয়ায় সংক্রমণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তারা দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং আক্রান্ত শিশুদের পৃথক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হাম শনাক্ত হয়েছে ৬৭৬ শিশুর শরীরে। আগের বছর ২০২৫ সালের এই সময়ে হাম আক্রান্ত রোগী ছিল ৯ জন। এর আগে ২০২৪ সালের এই সময়ে আক্রান্ত রোগী ছিল ৬৪ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম তিন মাসে রোগী বেড়েছে ৭৫ গুণ। আর ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ। দেশের ৮ বিভাগে শনাক্ত হামের রোগীর এমন তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে রোগটিতে কত শিশু মারা গেছে তার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এর আগে ২০২৫ সালে সারাদেশে হাম আক্রান্ত হয়েছিল ১২৫ জন। স্বাস্থ্য অধিপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি ২৪৫ জন হাম আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে, যা মোট রোগীর ৩৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। এরপর রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন বা ২০ দশমিক ২৬ শতাংশ। চট্টগ্রামে ৯৩ জন বা ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ময়মনসিংহে ৮০ জন বা ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। বরিশাল ও খুলনায় ৫১ জন বা ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ করে। সিলেটে ১৩ জন বা ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। রংপুর বিভাগে ৬ জন বা ০.৮৮ শতাংশ হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে।
নওগাঁ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অনুপ্রণ কুমার পাল বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে হামের সংক্রমণের প্রধান কারণ হিসেবে আমরা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করছি। ২০২০ সালের পর থেকে বড় কোনো জাতীয় ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং কিছু এলাকায় নিয়মিত টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় অনেক শিশু টিকার বাই রে থেকে গেছে। ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু এই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া হাম অত্যন্ত সংক্রামক, একজন আক্রান্ত শিশু থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সুস্থ শিশু আক্রান্ত হতে পারে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ।
অনেকেই হামকে সাধারণ জ্বর-ঠোসা মনে করেন, যা একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। হাম মোটেও সাধারণ রোগ নয়, বরং এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। হামের কারণে শিশুদের নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) হতে পারে। এমনকি ভিটামিন-এ এর অভাবে শিশু চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে এটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
তিনি আরোও জানান, বর্তমানে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এবার ৩ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। সাধারণত ৯ মাসের আগে টিকা দেওয়া হয় না, কিন্তু মায়ের দেওয়া অ্যান্টিবডি কমে আসায় এই ছোট শিশুরা বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। এছারাও হাম প্রতিরোধের একমাত্র এবং সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। ইপিআই শিডিউল অনুযায়ী দুই ডোজ টিকা নিলে প্রায় ৯৭% সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। টিকাদান জরুরি কারণ এটি শিশুকে হামের জটিলতা ও মৃত্যু থেকে রক্ষা করে। সমাজে ৯৫% শিশু টিকা নিলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয়, যা টিকা নিতে না পারা শিশুদেরও সুরক্ষা দেয়। টিকা না দিলে এই ভাইরাস নির্মূল করা অসম্ভব, যা বারবার মহামারীর রূপ নিতে পারে।
হাম কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. অনুপ্রণ কুমার পাল আরও বলেন, হামকে মনে করুন একটি অদৃশ্য দাবানল । টিকা হলো সেই পানি যা বনকে ভিজিয়ে রাখে, যাতে আগুন না লাগে। যদি বনের একাংশ শুকিয়ে যায় (টিকা না দেওয়া শিশু), তবে একটি মাত্র আগুনের ফুলকি (ভাইরাস) পুরো বন পুড়িয়ে দিতে পারে। তাই আপনার শিশুকে সময়মতো দুই ডোজ টিকা দিয়ে সুরক্ষিত রাখাই এখন প্রধান দায়িত্ব।
শয্যা বাড়িয়েও চাপ সামলাতে পারছে না হাসপাতালগুলো-
অভিভাবকরা শিশুদের নিউমোনিয়া ও হামের উপসর্গ নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে আসছেন শিশু হাসপাতালে। কিন্তু শয্যা খালি না থাকায় সঠিক চিকিৎসা দিতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গতকাল ঢাকার শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায় লম্বা সিরিয়াল। জরুরি চিকিৎসা শেষে শিশুদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর কোনো শয্যা খালি হলে শিশুদের ভর্তি রাখা হচ্ছে। কিন্তু হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালটিতে সিট পাওয়া দুর্লভ হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শিশু হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হামের রোগী বাড়ার কারণে সম্প্রতি হাসপাতালের একটি ওয়ার্ড হামের জন্য ডেডিকেটেড ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। আগে হামের জন্য হাসপাতালটিতে ১৫টি শয্যা ছিল। এখন এ ধরনের সংক্রমণের চিকিৎসা দেয়ার জন্য শয্যা সংখ্যা ৪৪-এ উন্নীত করা হয়েছে। শয্যা সংখ্যা তিন গুণ বাড়িয়েও রোগীর চাপ সামলাতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া আইসিইউসহ আরো কিছু আইসোলেটেড ওয়ার্ডেও সীমিতভাবে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
রাজধানীর উত্তরা এলাকার বাসিন্দা সাবিনা আক্তার জানান, তার তিন বছর বয়সী সন্তান সম্প্রতি হামে আক্রান্ত হয়। তিনি বলেন, প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম সাধারণ জ্বর। পরে শরীরে ফুসকুড়ি ওঠে, চোখ লাল হয়ে যায়। তখন দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা বলেন, এটা হাম। কয়েকদিন খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম, কারণ শিশুটি খেতেও পারছিল না, দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তিনি আরও বলেন, টিকা সময়মতো দেওয়া থাকলেও হয়তো কিছুটা দেরি হয়েছিল। এখন বুঝতে পারছি, এই বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া দরকার।
শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার মো. আল আমিন বিশ্বাস বলেন, প্রতিদিনই হামের উপসর্গ নিয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু আসছে। আমরা নির্ধারিত শয্যার বাইরে রোগী ভর্তি নিতে পারি না। আমাদের এখানে ফ্লোরিং সিস্টেম নেই। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। শয্যা খালি হওয়ামাত্রই আবার সেই শয্যা পূরণ হয়ে যায়। আগে আমাদের হামের জন্য নির্ধারিত শয্যা ছিল ১৫টি। এখন এটা প্রায় তিন গুণ করা হয়েছে। কিন্তু তবু আমরা সামাল দিতে পারছি না।
সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুরা আসছে বলে জানিয়েছেন মাদানী হসপিটাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ইব্রাহীম মাসুম বিল্লাহ। তিনি বলেন, আমরা প্রতিদিনই হামে আক্রান্ত রোগী পাচ্ছি। অবস্থা বুঝে চিকিৎসা দিই। জটিল রোগীগুলো আমরা রেফার করে দিই। রোগী আসার পাশাপাশি প্রচুর ফোন কল পাচ্ছি। অভিভাবকরা হাম নিয়ে আতঙ্কে আছেন।
মাস্ক পরাসহ যেসব সতর্কতা চিকিৎসকের-
বাতাসে দ্রুত ছড়াচ্ছে হাম—এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশ একেবারেই যৌক্তিক। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা কাশি-হাঁচির ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে সহজেই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় ভেসে থাকতে পারে। তাই চিকিৎসকরা মাস্ক পরার পরামর্শ দিচ্ছেন। চিকিৎমকরা জানান, আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি/হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে যায়। একই ঘরে থাকলেও সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও টিকা না নেয়া ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। চিকিৎসকদের নির্দেশনা অনুযায়ী করণীয় হচ্ছে- বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা। ভিড় এড়িয়ে চলা। শিশুদের অপ্রয়োজনে বাইরে না নেওয়া। অসুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে থাকা। হাত নিয়মিত সাবান দিয়ে ধুয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সময়মতো এমএমআর ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে হবে। টিকা না থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, এক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে টিকাদানের আওতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে সঠিক তথ্য প্রচারে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। একসময় হামের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। তবে সাম্প্রতিক এই সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রবণতা সেই অর্জনকে হুমকির মুখে ফেলছে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা, সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং দ্রুত চিকিৎসার কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে এই স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামে আরেক শিশুর মৃত্যু-
হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার রাতে হাসপাতালের ‘পেডিয়াট্রিক ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট-পিআইসিইউ’তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ মাস বয়সী শিশুটির মৃত্যু হয়। শিশুটি কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়ার বাসিন্দা। এ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে দুইদিনে দুই শিশু মারা গেল।
হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, “শিশুটিকে গতকাল সন্ধ্যায় বেসরকারি পার্ক ভিউ হাসপাতাল থেকে আমাদের এখানে আনা হয়। এরপর তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। রাতে শিশুটি মারা যায়। “হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুটি ভর্তি হয়েছিল। নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হলেও এখনো তার প্রতিবেদন পাইনি।” এর আগে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় মাস বয়সী আরেক শিশু মারা যায়। সেই শিশুটিও কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা ছিল। এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৭৬ জন। তার মধ্যে ৪০ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছে। জেলায় আট শিশুর নমুনায় হাম শনাক্ত হয়েছে। হাম শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে ছয়জন নগরীর এবং দুইজন উপজেলার বাসিন্দা।
এছাড়া হাম শনাক্তের জন্য বুধবার চট্টগ্রাম জেলা থেকে ২০ জনের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর আগে সোমবার পর্যন্ত ৯১ জনের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১১১ জনের নমুনা শনাক্তের জন্য ঢাকার পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিসেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরি-এনপিএমএলে পাঠানো হয়েছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, র্যাশ ও চোখ ওঠার মতো কোনো লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে এবং যদি জ্বর না কমে বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয় তাহলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল এবং বেসরকারি মা ও শিশু হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুরা চিকিৎসা নিচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগে পৃথক একটি কর্নার চালু করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









