বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীসমৃদ্ধ জাদুঘর ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়ামের ঐতিহাসিক অ্যাপোলো গ্যালারি দীর্ঘ নয় মাস পর আবার দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে এবার একটি বড় পরিবর্তন চোখে পড়বে—গ্যালারির বিখ্যাত রাজমুকুটের গয়নাগুলো আর সেখানে প্রদর্শন করা হচ্ছে না। গত বছরের অক্টোবরে প্রায় ১০ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার বেশি) মূল্যের রাজকীয় অলংকার চুরির ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। সেই ঘটনার পর গয়নাগুলো আরও নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার থেকে দর্শনার্থীরা আবার অ্যাপোলো গ্যালারির মনোমুগ্ধকর ১৭শ শতাব্দীর স্থাপত্য ও শিল্পকর্ম উপভোগ করতে পারছেন। সোনালি অলংকরণ, নান্দনিক ছাদ এবং ঐতিহাসিক সাজসজ্জার জন্য গ্যালারিটি ল্যুভরের অন্যতম আকর্ষণ। তবে আগে যেখানে ফরাসি রাজপরিবারের মূল্যবান গয়না প্রদর্শিত হতো, সেখানে এখন আর সেগুলো দেখা যাবে না।
ল্যুভর জাদুঘরের পরিচালক ক্রিস্তফ লেরিবো জানান, চুরি হওয়ার পর নিরাপত্তার বিষয়টি নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তাই রাজকীয় গয়নাগুলো এখন থেকে জাদুঘরের আরও নিরাপদ একটি অংশে প্রদর্শন করা হবে।
অ্যাপোলো গ্যালারিটি নির্মিত হয়েছিল ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের শাসনামলে। বিখ্যাত স্থপতি লুই ল্য ভো এর নকশা তৈরি করেন এবং শিল্পী শার্ল ল্য ব্র্যঁ সূর্যকে কেন্দ্র করে এর অভ্যন্তরীণ অলংকরণ সম্পন্ন করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই গ্যালারির নকশা থেকেই পরবর্তীতে ভার্সাই প্রাসাদের বিখ্যাত হল অব মিররস নির্মাণে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়।
ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্যাথরিন পেগার গ্যালারির পুনরায় উদ্বোধনকে ল্যুভরের জন্য একটি "নতুন সূচনা" বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এই চুরির ঘটনা শুধু ফ্রান্স নয়, পুরো বিশ্বের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে দেশের সব জাদুঘরের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
গত বছরের অক্টোবরে দিনের আলোতেই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই চুরির ঘটনা ঘটে। দুই ব্যক্তি একটি মালবাহী লিফট জাদুঘরের বাইরে এনে দ্বিতীয় তলার জানালায় পৌঁছান। এরপর তারা জানালা ভেঙে বৈদ্যুতিক কাটার যন্ত্র দিয়ে প্রদর্শন কক্ষের কাচ কেটে মূল্যবান গয়না নিয়ে পালিয়ে যান। বাইরে অপেক্ষায় থাকা আরও দুই সহযোগীর মোটরস্কুটারে করে তারা ঘটনাস্থল ছেড়ে যায়। পুরো অভিযান শেষ হতে সময় লাগে মাত্র সাত মিনিট।
এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে চুরি হওয়া অধিকাংশ গয়না এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
শুধু সম্রাজ্ঞী ইউজেনির একটি রাজমুকুট জাদুঘরের কাছাকাছি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে সেটি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে সংস্কারের কাজ চলছে। সম্রাজ্ঞী ইউজেনি ছিলেন ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের স্ত্রী।
চুরির ঘটনার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তৎকালীন ল্যুভর পরিচালক লরেন্স দে কার। নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কর্মীদের বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে চলমান অসন্তোষের কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করেন।
এছাড়া সরকারি নিরীক্ষা সংস্থাসহ বিভিন্ন সমালোচক অভিযোগ করেন, জাদুঘর কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় নতুন শিল্পকর্ম কেনা এবং মহামারির পর পুনরায় কার্যক্রম চালু করতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। অথচ জাদুঘরের সংগ্রহে থাকা শিল্পকর্মের মাত্র এক-চতুর্থাংশ সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শিত হয়।
অ্যাপোলো গ্যালারি পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও গত বছরের সেই দুঃসাহসিক চুরির ঘটনা এখনও ল্যুভর জাদুঘরের ইতিহাসে অন্যতম বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









