লোহিত সাগরে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সৌদি আরব ও মিসরের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। মঙ্গলবার কায়রোতে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। বৈঠকে লোহিত সাগরে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন নৌ চলাচলের পক্ষে অবস্থান নেয় মিসর।
এই বৈঠকের আগে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তাদের অগ্রযাত্রা বাব আল-মানদাব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রণালিটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে সৌদি আরব ও মিসরের ওপর। সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগর তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। আর মিসরের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার উৎস সুয়েজ খালের আয়। লোহিত সাগরে নৌ চলাচল কমে যাওয়ায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সুয়েজ খালের আয় প্রায় ৭০০ কোটি ডলার কমেছিল বলে মিসরের সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
মিসরের সিনেট সদস্য আবদেল মোনেম সাঈদের মতে, হুথিদের অগ্রযাত্রা মিসরের অর্থনীতি ও সুয়েজ খালের জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাই সৌদি আরব ও মিসরের মধ্যে যৌথ কৌশলগত ও সামরিক চিন্তা জরুরি হয়ে উঠেছে।
তবে ইয়েমেনে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে মিসরের সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। কিংস কলেজ লন্ডনের আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, কায়রো লোহিত সাগরের নৌপথ রক্ষায় সৌদির সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, নৌ নজরদারি ও বাণিজ্যিক জাহাজ সুরক্ষায় সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু ইয়েমেনের স্থলযুদ্ধে বড় ধরনের ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনা কম।
এর পেছনে মিসরের অতীত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬০-এর দশকে মিসরের তৎকালীন নেতা গামাল আবদেল নাসের উত্তর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিলেন। দীর্ঘ সেই যুদ্ধে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ফলে ইয়েমেনে সীমিত হস্তক্ষেপও বড় সামরিক ফাঁদে পরিণত হতে পারে—এমন আশঙ্কা কায়রোর নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ দিকে সৌদি আরব এরই মধ্যে লোহিত সাগরের নৌনিরাপত্তায় বহুপক্ষীয় সহযোগিতা গড়ে তুলেছে। জুলাইয়ে ১৪টি দেশ বাব আল-মানদাব, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে একটি বহুজাতিক নৌ প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। মিসরও এর সদস্য। জোটটির পরিকল্পনার মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া ও নৌ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে।
সৌদি-মিসর ঘনিষ্ঠতার পেছনে ইয়েমেন ছাড়াও সুদান, লিবিয়া ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে। দুই দেশই রাষ্ট্রের ভাঙন, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও সশস্ত্র মিলিশিয়ার বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে এখানে মিসরের জন্য আরেকটি জটিলতা রয়েছে—সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক। মিসরের অর্থনীতিতে আমিরাত সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি।
ফলে কায়রোর সামনে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নও রয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও আবুধাবির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না মিসর।
সিসি ও সৌদি যুবরাজের বৈঠকে নির্দিষ্ট কোনো সামরিক সহযোগিতার ঘোষণা আসেনি। বরং ইয়েমেন সংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এ থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—লোহিত সাগরের নিরাপত্তায় সৌদির সঙ্গে মিসরের সহযোগিতা বাড়ছে। তবে সেই সহযোগিতা কতটা সামরিক হবে এবং কায়রো ইয়েমেনের ভেতরের সংঘাতে কতটা জড়াবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









