কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন কয়েক সেকেন্ডেই এমন অনেক কাজ করে দিতে পারে, যেগুলো করতে আগে মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত। প্রতিবেদন লেখা, নথির সারাংশ তৈরি কিংবা কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেওয়া—সবই তার জন্য সহজ। কিন্তু একটি মৌলিক কাজ সে মানুষের হয়ে করতে পারে না: শেখা।
ধরা যাক, দুজন তরুণ একই সময়ে চাকরিতে যোগ দিলেন। দুজনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে জানেন। দুজনই যন্ত্রকে দিয়ে প্রতিবেদন লিখিয়ে নিতে পারেন, বড় নথি সংক্ষেপ করতে পারেন কিংবা জটিল প্রশ্নের উত্তর বের করতে পারেন। পার্থক্যটি দেখা দেবে তখনই, যখন যন্ত্রটি ভুল করবে। একজন বুঝতে পারবেন যে কোনো সংখ্যা মিলছে না, কোনো সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিকভাবে সরল কিংবা কোনো তথ্য আসলে সত্য নয়। অন্যজন হয়তো ভুলটিকেই সঠিক উত্তর ভেবে নেবেন।
এই পার্থক্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে তৈরি হয়নি। মানুষের শেখার ইতিহাসে এটি অনেক পুরোনো বিষয়। পড়া বুঝতে পারা, তথ্যের অর্থ অনুধাবন করা, যুক্তি দিয়ে বিচার করা এবং নতুন সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতাই মানুষকে নতুন কিছু শেখার ভিত্তি দেয়।
সাম্প্রতিক পিসা ফলাফল বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে। স্পেনের ফল ২০২২ সালের তুলনায় পাঠবোধে ২৩ পয়েন্ট, গণিতে ১৬ পয়েন্ট এবং বিজ্ঞানে ৮ পয়েন্ট কমেছে। প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর একজন পাঠবোধ ও গণিতে প্রাথমিক দক্ষতার স্তরেও পৌঁছাতে পারেনি। তবে পিসা কোনো চাকরির পরীক্ষা নয় এবং এর ফল দিয়ে একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে কেমন করবেন, তা নির্ধারণ করা যায় না। পরীক্ষাটি মূলত বোঝাপড়া, যুক্তি, সমস্যা সমাধান এবং নতুন পরিস্থিতিতে জ্ঞান প্রয়োগের মতো দক্ষতা পরিমাপ করে।

শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যও অনেকটা সেখানেই। শুধু তথ্য মুখস্থ করা নয়, শেখা জ্ঞানকে নতুন পরিস্থিতিতে কাজে লাগানো। কারণ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হলেও শেখা শেষ হয় না। কর্মজীবনে নতুন প্রযুক্তি, নতুন দায়িত্ব এবং নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় বারবার। শক্ত ভিত্তি থাকলে মানুষ নতুন জ্ঞান গ্রহণ করতে পারে; দুর্বল ভিত্তি হলে নতুন তথ্য কেবল মাথায় জমা হয়, জ্ঞানে পরিণত হয় না।
এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। যন্ত্র যদি আমাদের হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের একটি অংশ করে দিতে পারে, তাহলে মানুষের কাজ কী?
উত্তরটি হয়তো যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়। বরং যন্ত্র যা তৈরি করছে, সেটি বোঝা, যাচাই করা এবং প্রয়োজনে সংশোধন করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি প্রতিবেদন লিখে দিতে পারে, কিন্তু প্রতিবেদনটির তথ্য ঠিক আছে কি না তা বিচার করতে পারে না সবসময়। একটি সিদ্ধান্তের প্রস্তাব দিতে পারে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির সব দিক এবং তার সম্ভাব্য পরিণতি বুঝতে পারে না।
তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষের মূল্য কমে যাওয়ার বদলে মানুষের কিছু মৌলিক দক্ষতার গুরুত্ব আরও বাড়ছে—সমালোচনামূলক চিন্তা, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা।
প্রযুক্তি আমাদের কাজের গতি বাড়াতে পারে। কিন্তু কাজটি ঠিকভাবে হয়েছে কি না, সেটি বোঝার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষেরই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উত্তর দিতে পারে; ‘কিন্তু সেই উত্তরকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা মানুষকেই অর্জন করতে হবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









