অভূতপূর্ব ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত জাপানের পূর্বাঞ্চল। টানা বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে দেশটির চিবা প্রিফেকচারে অন্তত ‘৮ জনের মৃত্যু হয়েছে’। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে সড়ক ও রেলপথ, বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। রাজধানী টোকিওর পাশের এই অঞ্চলের দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে বিমান ও গণপরিবহন ব্যবস্থাতেও।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব মাত্রার ভারী বৃষ্টি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল থেকে চিবা অঞ্চলের কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগস্ট মাসের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় তিন গুণ এবং দেশটিতে রেকর্ড রাখা শুরুর পর এটিকে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি
বৃষ্টির তীব্রতা এতটাই বেড়ে যায় যে বৃহস্পতিবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ ‘লেভেল-৫ জরুরি সতর্কতা’ জারি করে। শুক্রবার সকালে সেটি লেভেল-৪-এ নামিয়ে আনা হলেও বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা এখনও রয়েছে।
চিবা গভর্নর তোশিহিতো কুমাগাই বলেন, জাপানের আবহাওয়ার ইতিহাসের বিবেচনাতেও এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা। অতীতে বহু দুর্যোগ মোকাবিলা করলেও এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা তার আগে হয়নি বলে জানান তিনি।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এখন মানুষের জীবন রক্ষা এবং আটকে পড়াদের উদ্ধার করা।
বন্যার পানিতে প্রাণহানি
প্রবল বর্ষণে বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস দেখা দিয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন নারী ছিলেন, যিনি বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া গাড়ির ভেতরে আটকা পড়ে মারা যান। আরও দুজন রাস্তায় অসুস্থ হয়ে পড়ে পরে মারা যান বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার এক লাখেরও বেশি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ‘২০ হাজারের বেশি বাড়িতে’।
নারিতা বিমানবন্দরে আটকা হাজারো যাত্রী
টোকিওর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর একটি ‘নারিতা বিমানবন্দরেও’ দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। হাজারো যাত্রী বিভিন্ন পরিবহন সমস্যায় আটকা পড়েন। কিছু যাত্রী মেট্রো স্টেশনগুলোতে রাত কাটান।
চিবা প্রিফেকচারাল গভর্নমেন্ট ভবনে প্রায় ‘১ হাজার ৮০০ মানুষ’ রাত কাটিয়েছেন বলে জানা গেছে।
শুক্রবার নারিতা বিমানবন্দরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্ধারিত ফ্লাইটগুলো স্বাভাবিকভাবেই পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে জাপান এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, কিছু ফ্লাইট বিলম্বিত হতে পারে।
বন্ধ রেলপথ, মহাসড়ক
প্রবল বৃষ্টির কারণে শুক্রবার সকালেও জাপানের বেশ কিছু রেলসেবা বন্ধ ছিল। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কও যান চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
চিবার ইচিকাওয়া শহরের এক বাসিন্দা জাপানের সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকেকে বলেন, বৃষ্টি এত দ্রুত শুরু হয়েছিল যে কেউ প্রস্তুত হওয়ার সুযোগই পাননি। বিদ্যুৎ না থাকায় আগামী কয়েক দিন ব্যবসা চালু করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

কেন এত ভয়াবহ বৃষ্টি?
জাপানের আবহাওয়া সংস্থার মতে, দেশের পূর্বাঞ্চলে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস প্রবেশের সঙ্গে ওপরের স্তরের ঠান্ডা বাতাসের সংঘর্ষে বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এর ফলেই অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে।
শুক্রবার রাত পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।
পুরো পূর্ব এশিয়ায় একের পর এক ঝড়
জাপানের এই দুর্যোগ এমন সময়ে এলো, যখন চলতি সপ্তাহে পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অংশে একের পর এক ঝড় আঘাত হেনেছে। ‘ডলফিন, চেন-হোম এবং পিলো’—এই ঝড়গুলো প্রায় একই সময়ে জাপান, ফিলিপাইন ও চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব ফেলেছে।
এর আগে ডলফিনের প্রভাবে জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। এতে কয়েক হাজার স্থাপনায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়, গাছপালা উপড়ে পড়ে এবং ফ্লাইট বাতিল করতে হয়।
চীনেও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। সপ্তাহান্তে টাইফুন ডলফিনের আঘাতের আগে দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে ‘১০ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া’ হয়। চলতি বছরে চীনে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন হিসেবে এটিকে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চলেও বন্যার আশঙ্কায় আবারও স্কুল ও সরকারি অফিস বন্ধ রাখা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, চলতি বছর পূর্ব এশিয়ায় অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় টাইফুন মৌসুমের ইঙ্গিত মিলছে। জাপানের সর্বশেষ দুর্যোগও সেই বৃহত্তর আবহাওয়াগত অস্থিরতারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
‘এখনও চিবা ও আশপাশের এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছে। কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং বন্যা ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে।’
সূত্র: বিবিসি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









