শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে লাগাম টানতে চেয়েছিল ফ্রান্স। কিন্তু সেই উদ্যোগই এবার বড় বাধার মুখে পড়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার আইন বাতিল করে দিয়েছে। আদালতের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে।
শুক্রবার ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদ এ সিদ্ধান্ত দেয়। গত জুলাইয়ে দেশটির আইনপ্রণেতারা বিলটি পাস করেছিলেন। এটি কার্যকর হলে ফ্রান্সই ইউরোপের প্রথম দেশ হতো, যেখানে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা থাকত।
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও আইনটি ধাপে ধাপে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ বছরের কম বয়সীরা নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারত না। নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার সময় বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করার কথাও ছিল। আগামী জানুয়ারি থেকে পুরোনো অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম চালুর পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু আইনটি নিয়ে সাংবিধানিক পরিষদে পর্যালোচনার আবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। নয় সদস্যের এই পরিষদ পরীক্ষা করে দেখে, কোনো আইন দেশের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
পরিষদ বলেছে, আইনের প্রথম ধারা ১৫ বছরের কম বয়সীদের মতপ্রকাশ ও যোগাযোগের স্বাধীনতায় এমন হস্তক্ষেপ করছে, যা উপযুক্ত, প্রয়োজনীয় বা আনুপাতিক নয়। অনলাইন সেবা ব্যবহারের জন্য বয়সের প্রমাণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত। তাদের মতে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি নিরাপত্তাব্যবস্থা সেখানে যথেষ্ট ছিল না।
রায়ের পর মাখোঁ দ্রুত নতুন একটি খসড়া আইন তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, সরকার যত দ্রুত সম্ভব নতুন প্রস্তাব তৈরি করবে। ২০২৭ সালের শুরুর দিকেই নতুন সংস্কার কার্যকর করার ব্যাপারে মাখোঁ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ইউরোপজুড়ে বাড়ছে কড়াকড়ি
ফ্রান্সের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য ও অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ। তবে আইনটির সমালোচকেরা শুরু থেকেই এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হবে, শিশুরা সেটি এড়িয়ে যেতে পারবে কি না এবং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা হবে—এসব নিয়েও উদ্বেগ ছিল।
এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চালু করে। তবে সেখানেও অনেক কিশোর এখনো বিভিন্নভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে বলে জানা যায়।
ইউরোপের অন্য দেশগুলোও একই পথে হাঁটছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নিয়ে নতুন আইন করার প্রস্তাব দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যও ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
ফ্রান্সের আদালতের রায় তাই শুধু দেশটির জন্য নয়, পুরো ইউরোপে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে—সেই বিতর্ককেও নতুন করে সামনে এনেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









