ইরানের সঙ্গে যুক্ত তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এই হামলা চালানো হয়। এতে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তিনটি ট্যাংকারের মধ্যে একটি খার্গ দ্বীপের কাছে, একটি হরমুজ প্রণালির কাছে এবং অন্যটি ওমান উপসাগরে হামলার শিকার হয়েছে। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, খার্গ দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালির কাছে থাকা দুটি ট্যাংকারকে ‘স্থায়ীভাবে অচল’ করে দেওয়া হয়েছে। অন্য ট্যাংকারটি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে।
সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, ‘আইআরজিসির জন্য বার্তা স্পষ্ট—আপনারা যদি আমাদের দুটি জাহাজে হামলা করেন, তাহলে আমরা আপনাদের তিনটি জাহাজ ধ্বংস করে আরও বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি করব।’ তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে ইরানের তেলবাহী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, খার্গ দ্বীপের কাছে নোঙর করা একটি ট্যাংকারে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ট্যাংকারটির নাবিকদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছিল বলে স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানায় তাসনিম। তবে ইরান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে হামলার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে, সেন্টকম দাবি করেছে, আইআরজিসি একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ও একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালায়। মার্কিন বাহিনী এসব হামলা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
খার্গ দ্বীপ ঘিরে উদ্বেগ
তিনটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ খার্গ দ্বীপ ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি হতো। তবে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে দেশটির তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
৩১ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, খার্গ দ্বীপ ‘উড়িয়ে দেওয়া’ হতে পারে। এর আগে জুন মাসেও তিনি দ্বীপটি দখলের কথা বলেছিলেন। পরে অবশ্য সম্ভাব্য সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিত রাখার কথা জানান তিনি।
খার্গ দ্বীপে বড় ধরনের হামলা হলে ইরানের তেল শিল্প ও অর্থনীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারেও তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আগে থেকেই বাড়ছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে কার্যত নৌ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
শুক্রবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ২৮ ডলারে উঠে জুলাইয়ের ২৪ তারিখের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা শুরু করলে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। জবাবে ইরান ইসরায়েল, মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়।
দুই দেশের মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি গত মাসে শেষ হয়েছে। এরপর নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে তেলবাহী জাহাজে সর্বশেষ মার্কিন হামলার পর সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









