১৯৭৬ সালে ৮২ বছর বয়েসে মাও সেতং মৃত্যু বরণ করেন। মৃত্যুর ৫০ বছর পরে এখনো অনেকে তাকে চীনের ত্রাণকর্তা মনে করেন; তার সমাধিসৌধে দর্শনার্থীর ঢল নামার প্রত্যাশা। কমিউনিস্ট পার্টি সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে ভুল বলে নিন্দা করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বলেছে, মাওয়ের অর্জন তার ভুলের চেয়ে বড়।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) চীন মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর ৫০ বছর পূর্তি স্মরণ করছে। গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও একসময় বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষকে কমিউনিস্ট পার্টির শাসনের অধীনে নিয়ে এসেছিলেন। অর্ধশতাব্দী পরও তার উপস্থিতি শুধু অতীতের বিষয় নয়; তার ছায়া চীনের ভবিষ্যতের ওপরও পড়ে আছে।
১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, ৮২ বছর বয়সে মাওয়ের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুতে অনেকে শোক প্রকাশ করেছিলেন; আবার তার প্রায় তিন দশকের শাসনে যারা নিপীড়িত হয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ স্বস্তিও পেয়েছিলেন। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ১৯৬৬ সালে শুরু করা উন্মত্ত গণআন্দোলন সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও অবসান দ্রুত এগিয়ে আসে। পরে কমিউনিস্ট পার্টি সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে একটি “গুরুতর ভুল” বলে ঘোষণা করে এবং এর প্রধান দায় মাওয়ের ওপর দেয়। তবু মাওয়ের প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখা হয়। পার্টির ভাষ্য, তার অর্জন তার ভুলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কোয়ারের দিকে এখনো তাকিয়ে আছে মাওয়ের ছয় মিটার উঁচু প্রতিকৃতি। এই স্কোয়ার চীনের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক। কাছেই চেয়ারম্যান মাও মেমোরিয়াল হলে সংরক্ষিত আছে তার মরদেহ। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ সেখানে আসে শ্রদ্ধা জানাতে।
আজও বহু চীনা নাগরিক মাওকে জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখেন। তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার সমাধিসৌধের খোলার সময় বাড়ানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাবে।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মাও ছিলেন সন্দেহপ্রবণ এবং বয়সে প্রবীণ। তিনি ছাত্র ও তার সমর্থকদের সংগঠিত করেছিলেন তথাকথিত “শ্রেণিশত্রুদের” বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে ছিলেন এমন নেতারাও, যাদের “পুঁজিবাদী পথে হাঁটার” অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। শুরু হয় ব্যাপক অস্থিরতা। প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে, অর্থনীতি কার্যত অচল হয়ে যায়, আর সহিংসতা ও রাজনৈতিক নিপীড়ন ছড়িয়ে পড়ে। এক দশকের সেই অস্থিরতা মাওয়ের পরের প্রজন্মের নেতাদের ওপরও গভীর ছাপ ফেলে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
শির ওপরও নিপীড়নের ছায়া
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আগে এবং তার সময় শির বাবা, সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী শি ঝোংশুন, পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন এবং নির্মম রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হন। তাদের পারিবারিক বাড়িও তছনছ করা হয়।
তখন কিশোর শিকে “প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্র” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, রাজনৈতিক মতাদর্শের জোরপূর্বক শিক্ষা নিতে বাধ্য করা হয়, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের হুমকিও দেওয়া হয়।
২০০০ সালে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত একটি সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শি বলেছিলেন, “আমি একগুঁয়ে ছিলাম এবং ভয় দেখিয়ে আমাকে দমানো যায়নি। তাই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে আমার বিরোধ হয়েছিল। সব খারাপ কিছুর দায় আমার ওপর চাপানো হতো... তখন আমার বয়স ১৫-ও হয়নি।”
১৯৬৯ সালে তার প্রজন্মের আরও বহু তরুণের মতো শিকেও গ্রামে পাঠানো হয়। উত্তর-পশ্চিম চীনের দরিদ্র একটি গ্রামে তিনি সাত বছর কাটান।

চীনা রাজনীতির বিশেষজ্ঞ এবং আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোসেফ টরিজিয়ান বলেন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব শির জন্য ছিল “গভীরভাবে হতাশাজনক এক অভিজ্ঞতা”। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বলেন, এই আন্দোলনের মধ্যে শি কিছু “পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও” দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা তাকে কঠিন করে তুলেছিল এবং রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার বিপদ সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছিল। একই সঙ্গে তার মনে এই ধারণা তৈরি হয়েছিল যে সমাজতন্ত্রের পথে এগোতে পার্টির একটি স্পষ্ট পথনির্দেশ প্রয়োজন।
দীর্ঘ ছায়া
নিজের পরিবারের ওপর নেমে আসা নিপীড়ন কিংবা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় দেখা অনেক ঘটনাবলীর পরও শি প্রকাশ্যে কখনো মাওকে দোষারোপ করেননি।
বরং ২০১২ সালে চীনের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর তিনি বারবার বলেছেন, মাও-পরবর্তী সংস্কারের যুগকে ব্যবহার করে মাওবাদী সময়কে অস্বীকার করা উচিত নয়। একই সঙ্গে তার শাসনব্যবস্থায় মাওয়ের যুগের কিছু রাজনৈতিক পদ্ধতির প্রতিধ্বনি ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে।
মাওয়ের মৃত্যুর পর দেং শিয়াওপিংয়ের সংস্কারের মাধ্যমে চীন যে পথে এগিয়েছিল, শির অব্যবহিত পূর্বসূরিরা সেই পথ ধরে নেতার ক্ষমতা কিছুটা সীমিত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শি সেই প্রবণতা থেকে সরে এসেছেন। তিনি ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছেন, ব্যক্তিগত কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করেছেন এবং মতাদর্শগত আনুগত্য ও পার্টির কঠোর শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়েছেন।
মাওয়ের পর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পথেই আছেন শি। অতিরিক্ত ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং আরেকটি ব্যক্তিপূজার ঝুঁকি ঠেকাতে সংস্কারের যুগে যে মেয়াদসীমার অলিখিত নিয়ম তৈরি হয়েছিল, শি তা ভেঙে দিয়েছেন। এমনকি পার্টি ও রাষ্ট্রের সংবিধানে থাকা রাষ্ট্রের সরকারি মতাদর্শের সঙ্গে তার নিজের নামও যুক্ত হয়েছে—মাওয়ের পর ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আর কোনো নেতা যা করতে পারেননি।
লন্ডনের কিংস কলেজের লাউ চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক কেরি ব্রাউন বলেন, “মাওবাদের প্রতীক, তার ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ এবং বিশেষ ধরনের ভাষা ও প্রতীক—এসব এখনো অসাধারণ শক্তিশালী।” তার মতে, শি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদ ও জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির মাধ্যমে এর কিছু অংশ আবার ফিরিয়ে এনেছেন।
টরিজিয়ানের মতে, শি মাওয়ের সরাসরি সমালোচনা থেকে সব সময় দূরে থাকেন, কারণ তিনি “সেই সময়ে পার্টিকে ফিরিয়ে নিতে চান, যখন উদ্দীপনা ও আবেগ সবাইকে এক ধরনের ছাঁচে গড়ে তুলেছিল।”
এখানেই ইতিহাসের পুরোনো প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে। শির এই পথ কি দীর্ঘস্থায়ী হবে? নাকি মাওয়ের মতো তিনিও এমন এক চাপ তৈরি করছেন, যা তার চলে যাওয়ার পর অনিচ্ছাকৃতভাবেই পরিবর্তনের দাবি আরও তীব্র করে তুলবে?
চীনের ইতিহাসে মাওয়ের ছায়া তাই শুধু স্মৃতির ছায়া নয়। এটি ক্ষমতারও ছায়া—একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার অতীতকে স্মরণ করে, কীভাবে তার ভুলকে স্বীকার করেও সেই অতীতের প্রতীককে আঁকড়ে থাকে, এবং কীভাবে একজন মৃত নেতার রাজনৈতিক ভাষা বহু দশক পরও জীবিত শাসকের হাতে নতুন অর্থ পেতে পারে, তার ছায়া।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









