ক্রেমলিনের কাছে সংসদীয় নির্বাচন রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, জনমতের প্রতিক্রিয়া, নেতৃত্বের নবায়ন এবং বৈধতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
রাশিয়ার সংসদীয় নির্বাচন পশ্চিমা বিশ্ব ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান তথ্যযুদ্ধের জন্য নতুন একটি সুযোগ তৈরি করেছে। পশ্চিমা রাজনীতিক, বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের অনেকে আবারও বলছেন—রাশিয়ায় গণতন্ত্র বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে; দেশটির ফেডারেল পার্লামেন্ট বা অন্য কোনো নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান বাস্তবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তেমন কোনো ভূমিকা রাখে না। তাদের মতে, রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মতো সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সরকারও নেয় না; বরং ক্রেমলিনের অত্যন্ত ছোট একটি মহলই সেগুলো ঠিক করে, যাদের কাছে জনগণের কোনো জবাবদিহি নেই।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে রাশিয়ায় নির্বাচন আয়োজনেরই প্রয়োজন নেই। কারণ সমালোচকদের মতে, ফলাফল আগে থেকেই ঠিক করে রাখে ক্রেমলিনের রাজনৈতিক কৌশলবিদেরা। আর নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, তাতে দেশের ভবিষ্যতের ওপর বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।
কিন্তু বিষয়টি একটু অন্যভাবে দেখলেও কিছু প্রশ্ন সামনে আসে। এমনকি সবচেয়ে পক্ষপাতদুষ্ট বাইরের পর্যবেক্ষকের পক্ষেও অস্বীকার করা কঠিন যে রুশ কর্তৃপক্ষ এই নির্বাচনে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং বিদ্যমান নির্বাচনী আইনের মধ্যে থেকে নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে ধারাবাহিকভাবে যথেষ্ট চেষ্টা করেছে। গত কয়েক মাসে দেশটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও স্পষ্টভাবে বেড়েছে।
শীর্ষ রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তারা বারবার ভোটারদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, আসন্ন নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ। যেসব অঞ্চলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ছিল, সেসব অঞ্চলের গভর্নরদের জন্য অতিরিক্ত সরকারি অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারি খাতের কিছু কর্মী ও পেনশনভোগীর ভাতা দ্রুত বাড়ানো হয়েছে। আবার জনগণের জন্য অনিবার্য কিন্তু অজনপ্রিয় কিছু সিদ্ধান্ত—যেমন আবাসন ও ইউটিলিটি খাতে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি—নির্বাচনের পর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এমনকি ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়েও নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর রুশ নেতৃত্বের হাত আরও কিছুটা মুক্ত হবে। তবে সেই বাড়তি স্বাধীনতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে রুশ রাজনৈতিক মহলে একমত ছিল না; বরং মত ছিল পরস্পরবিরোধী।

তবু একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। রুশ কর্তৃপক্ষ এমন একটি সময়ে নির্বাচন আয়োজন করেছে, যখন দেশ বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে আছে। অন্যদিকে কিয়েভের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ২০২৪ সালের ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন স্থগিত করে দিয়েছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ‘স্বাভাবিক সময়ের’ জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউক্রেনের রাজনৈতিক মহলের একটি অংশের অসন্তোষ ও চাপা ক্ষোভ সত্ত্বেও সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এত কিছু কেন?
রুশ কর্তৃপক্ষ এমন একটি নির্বাচনের জন্য এত সময়, অর্থ ও রাজনৈতিক শক্তি ব্যয় করছে কেন, যেটিকে রাশিয়ার বাইরের অনেক পর্যবেক্ষক প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি দুর্বল অনুকরণ ছাড়া আর কিছু মনে করেন না?
আরও বড় প্রশ্ন হলো, একটি বড় সামরিক সংঘাত চলার মধ্যেই কেন নতুন করে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করা হলো? কারণ যুদ্ধ বা জাতীয় সংকটের সময় প্রায় সব দেশেই স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর কোনো না কোনোভাবে সংকুচিত হয়।
শুধু পশ্চিমা প্রতিপক্ষ বা বিদেশি মিত্রদের প্রভাবিত করার জন্য রাশিয়ায় নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে—এমন ব্যাখ্যা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
পশ্চিমা সমালোচকেরা রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করেন, নির্বাচন সম্পূর্ণ অবাধ হয়ে গেলেও তা হঠাৎ বদলে যাবে—এমন সম্ভাবনা খুব কম। এমনকি কল্পনা করা যাক, কোনো নির্বাচনে রাশিয়ার উগ্র বিরোধী শক্তি বিপুল জয় পেল এবং ক্রেমলিনপন্থী প্রার্থীরা বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ল। তবুও অনেক পশ্চিমা পর্যবেক্ষক হয়তো সেটিকে ‘পুতিনের আরেকটি কৌশল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন—যার উদ্দেশ্য পশ্চিমা জনগণকে বিভ্রান্ত করা এবং রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার কর্তৃত্ববাদী চরিত্র আড়াল করা।
অন্যদিকে, রাশিয়ার বিদেশি মিত্রদেরও রুশ গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ আছে বলে মনে হয় না। ইরান, উত্তর কোরিয়া, বেলারুশ বা চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পশ্চিমা উদার গণতন্ত্রের প্রচলিত মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তাই কিম জং উন, আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, মোহাম্মদ বিন সালমান কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ ভ্লাদিমির পুতিনকে ভোটকেন্দ্র পরিচালনা বা ভোট গণনার বিষয়ে বিশেষ পরামর্শ দেবেন—এমনটিও খুব বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তাহলে কি ক্রেমলিন এমন একটি ব্যয়বহুল রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করছে, যার দর্শকের প্রতিক্রিয়া আগে থেকেই জানা?
সম্ভবত বিষয়টি এত সরল নয়।
বরং ধরে নেওয়া যায়, রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে নির্বাচন বাইরের বিশ্বের জন্য রাজনৈতিক সাজসজ্জা নয়। এটি তাদের নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য একটি কার্যকর এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। বিশেষ করে ২০২৬ সালের শরতের কঠিন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন সরকার ও সমাজের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার একটি মাধ্যম হতে পারে।
এ কারণেই সরকার ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। মানুষ যাতে সহজে ভোট দিতে পারে, সে জন্য যতটা সম্ভব সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এর একটি রাজনৈতিক কারণ আছে।

উচ্চ ভোটার উপস্থিতি দেখায় যে সমাজ এখনও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। মানুষ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি, সম্পূর্ণ উদাসীন বা নৈরাশ্যবাদী হয়ে যায়নি। রুশ নেতৃত্বের কাছে নাগরিক অংশগ্রহণ তাই নিছক একটি আনুষ্ঠানিক কথা নয়।
এই অর্থে, ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়াও সরকারের কাছে একেবারে ভোট না দেওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ বিরোধী কোনো দলকে ভোট দেওয়া মানে অন্তত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া।
নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জনমতের প্রকৃত অবস্থা বোঝা। সবচেয়ে উন্নত জনমত জরিপ বা সমাজবৈজ্ঞানিক গবেষণাও ভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত রাজনৈতিক পছন্দের সম্পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না।
আধুনিক রাশিয়ায় একটি সীমিত হলেও কার্যকর ‘ব্যবস্থার ভেতরের বিরোধী’ রাজনৈতিক পরিসর রয়েছে। বিভিন্ন দল বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, বয়সভিত্তিক ও আঞ্চলিক গোষ্ঠীর স্বার্থ ও প্রত্যাশা তুলে ধরে। সময়ের সঙ্গে এসব দলের জনপ্রিয়তার ভারসাম্যও বদলায়। রাষ্ট্রকে সেই পরিবর্তন বুঝতে হয় এবং তার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ করতে হয়।
ধরা যাক, কমিউনিস্ট পার্টি, আ জাস্ট রাশিয়া কিংবা অন্য কোনো বামপন্থী দলের ভালো ফল হলো। তাহলে সেটি সরকারের জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে—মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমানোর বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব চায়। নব্বইয়ের দশকের ‘বন্য পুঁজিবাদ’-এর কিছু পুরোনো সমস্যা এখনও যে মানুষের মনে আছে, সেটিও তখন স্পষ্ট হতে পারে।
আবার নিউ পিপল পার্টি বা অন্য কোনো ডানপন্থী শক্তি যদি ভালো ফল করে, সেটি অর্থনৈতিক কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত করার এবং বেসরকারি খাত, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য আরও সুযোগ তৈরি করার দাবি হিসেবে দেখা হতে পারে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি যদি শক্তিশালী ফল করে, তাহলে সেটিকে সমাজে জাতীয়তাবাদী প্রবণতা বাড়ার একটি ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
সরকার এসব রাজনৈতিক সংকেতের জবাব কীভাবে দেবে, তা আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু সংকেতগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা তার পক্ষে সহজ নয়। কারণ জনমতের পরিবর্তন বুঝতে না পারলে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করাও কঠিন।
নির্বাচনের গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়।
সম্ভাবনা রয়েছে যে স্টেট ডুমার এই নির্বাচন শুধু পার্লামেন্টের গঠনেই পরিবর্তন আনবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে কেন্দ্রীয় সরকারেও। নির্বাচনের পর নির্বাহী বিভাগে—ফেডারেল পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের অন্যান্য স্তরেও—উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে।
আর নেতৃত্বে পরিবর্তন মানেই নতুন মানুষ। নতুন মানুষ মানে নতুন চিন্তা, নতুন কর্মসূচি, নতুন প্রকল্প এবং কখনও কখনও প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন প্রস্তাব।
আজকের রুশ সমাজে নেতৃত্ব ও প্রশাসনে নবায়নের একটি চাহিদা রয়েছে। সংসদীয় নির্বাচন সেই চাহিদার প্রতি সাড়া দেওয়ার একটি পথ হতে পারে—যেখানে রাষ্ট্রের সামগ্রিক নীতি বা শীর্ষ নেতৃত্বের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে না তুলেও পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করা যায়।
বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর পর এই প্রথম রাশিয়ায় স্টেট ডুমার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে রুশ সমাজও অনেক বদলেছে। সেই অর্থে নির্বাচনকে একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা বলা যায়।
এর ফলাফল সম্পর্কে আগেভাগে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যারা বিশেষ সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন বা এখনও সংঘাতের সম্মুখসারিতে রয়েছেন, তাদের বড় অংশ কোন রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন করবেন—তা এখনও স্পষ্ট নয়। একইভাবে নতুন রুশ অঞ্চলগুলোর অনেক বাসিন্দার রাজনৈতিক পছন্দ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাদের অনেকের জন্য এই নির্বাচন হবে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রথম স্টেট ডুমা নির্বাচন।
এই পরীক্ষায় রুশ নেতৃত্বের জন্য কিছু ঝুঁকিও আছে। তবু তারা সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে।
কারণ তাদের কাছে নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগাযোগ বজায় রাখার একটি উপায়, জনমতের পরিবর্তন বোঝার একটি মাধ্যম এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের সমর্থন যাচাই করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সবচেয়ে বড় কথা, নির্বাচন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বৈধতা নতুন করে নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবেও কাজ করে।
তাই রাশিয়ার নির্বাচনকে শুধু রাজনৈতিক নাটক বা সাজানো মঞ্চ হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না। এর ফলাফল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—মানুষ কতটা অংশ নিল, কীভাবে ভোট দিল, কোন রাজনৈতিক বার্তা দিল এবং সেই বার্তাকে ক্ষমতাসীনরা ভবিষ্যতে কীভাবে পড়ল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









