১৯৫৯ সালে নির্মিত ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমাতেই ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র ভাষা, রাজনৈতিক চিন্তা এবং সাংস্কৃতিক অনুসন্ধান পূর্ণ তাৎপর্য নিয়ে প্রকাশিত হয়। ছবিটি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অশীষ রাজাধ্যক্ষের ‘আ রিটার্ন টু দ্য এপিক’, ইরা ভাস্করের ‘মিথ অ্যান্ড রিচুয়াল ইন মেঘে ঢাকা তারা’ (জার্নাল অব আর্টস অ্যান্ড আইডিয়াস, সংখ্যা ৩) এবং হেমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘ঋত্বিক কুমার ঘটক’ (প্রকাশক: ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অব ইন্ডিয়া)। বিতর্কের সঙ্গে যারা এখনো পরিচিত নন, মূলত তাদের জন্যই নিচে কুমার সাহানির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো। এতে তিনি ‘মেঘে ঢাকা তারা’ চলচ্চিত্রটির তাৎপর্য ও অন্তর্নিহিত ভাবনা বিশ্লেষণ করেছেন।
সহিংসতা ও দায়িত্ববোধ: কুমার সাহানি
অনেকেই আমাদের কাছে জানতে চান, ঋত্বিক ঘটকের ছাত্র হিসেবে আমরা তার কাছ থেকে কী পেয়েছি, কী উত্তরাধিকার বহন করছি। সমস্যাটা হলো, তারা এখনো বুঝতে পারেননি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার মধ্যে কাজ করার অর্থ কী। আমাদের পূর্বসূরিরা বিকাশের চেয়ে অনুকরণকেই বেশি পছন্দ করেন। তাদের ইচ্ছা, শিক্ষা এখনো সামন্ততান্ত্রিক পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধ থাকুক। বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের ধারণা হয়তো বাদ দেওয়া হবে, কিন্তু তরুণদের বলা হবে, ওস্তাদ কারিগরের কাছ থেকে যা শিখেছে, হুবহু তা-ই নকল করতে। প্রচলিত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার এবং সুবিধাবাদী মধ্যমেধার কাজকে বৈধতা দেওয়ার সবচেয়ে নিশ্চিত উপায় এটাই।
আমাদের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পকর্মকে যখন একদিকে ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদের এবং অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া ইউরোপীয় মানবতাবাদের প্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তখন ঋত্বিকদার কাজ আমাদের নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠার এক প্রবল ঘোষণা। মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে মৃত্যুপথযাত্রী মেয়েটির যে আর্তনাদ পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়, সেটি আসলে আমাদের বেঁচে থাকার অধিকারেরই ঘোষণা।
নীতার ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী ছিল বাংলার দেশভাগ। কিন্তু দেশভাগ ছিল আরও ব্যাপক এক বিভাজনের তাৎক্ষণিক প্রকাশমাত্র। ঋত্বিকের চলচ্চিত্রের কাহিনি ও চলচ্চিত্রভাষা—দুইয়েরই মূল প্রেরণা এসেছিল সমাজব্যবস্থা এবং তার মূল্যবোধের গভীর ভাঙন থেকে। অথচ বাইরে তখনো একটি প্রাচীন, গৌরবময় সংস্কৃতির অবয়ব অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা চলছিল। আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা অর্জনের পর যে সমাজ আধুনিক হয়ে উঠতে পারত, তার ভেতরের বৈপরীত্যগুলোই এই গভীর বিভাজনের প্রধান কারণ।
মেঘে ঢাকা তারা ছবির কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে তিন ভাগে বিভক্তির একটি বিন্যাস। এই বিন্যাসের ফলে তৈরি হয়েছে উল্টো ত্রিভুজ। তার অস্থির শীর্ষবিন্দুতে অবস্থান করছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আমাদের প্রাচীন নিম্নবর্গীয় বস্তুবাদী সংস্কৃতি থেকে নেওয়া নারীত্বের শক্তিও ছবিতে তিনটি প্রধান নারী চরিত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়েছে। তারা হলো নিষ্ঠুর মা, ইন্দ্রিয়পরায়ণ মেয়ে এবং পালন ও লালন করার ক্ষমতাসম্পন্ন নায়িকা নীতা। ত্রিভুজাকৃতির দৃশ্যবিন্যাস এবং শব্দের স্তরে দুর্গাকে ঘিরে নানা অনুষঙ্গ এই কাঠামোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
যেসব সমালোচক চলচ্চিত্রের এই কাঠামোগত নির্মাণের দিকে মনোযোগ দেন না, তাদের কাছে ঋত্বিকদার কাজ অতিনাটকীয় মনে হতে পারে। একথা ঠিক যে, নিজের বক্তব্য প্রকাশের জন্য তিনি ট্র্যাজেডির নানা উপাদান ব্যবহার করেছেন। যেমন, সমবেত কণ্ঠ বা কোরাসের ব্যবহার এবং কাহিনির অনিবার্য পরিণতিকে কঠোরভাবে নির্মাণ করা। তবে তিনি ধ্রুপদি ট্র্যাজেডির অতিপ্রাকৃত নিয়তি কিংবা পরবর্তী রোমান্টিক ধারার ব্যক্তিকেন্দ্রিক ধারণা থেকে চলচ্চিত্রের এই রূপকে মুক্ত করেছেন। শেক্সপিয়রের হ্যামলেট-এ নায়কের ব্যক্তিগত ত্রুটি বা ‘বিশেষ অপরাধ’ যে পরিণতি ডেকে আনে, ঋত্বিক সেখানে তার জায়গায় এনেছেন সামাজিক ও ঐতিহাসিক শক্তিকে। নিয়তিবাদের হতাশাকে প্রতিহত করেছে ছবির শেষ দৃশ্য, যা নতুন করে আশার সম্ভাবনা তৈরি করে। ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শ্রেণিগত সাধারণীকরণের উপস্থিতি রয়েছে বলেই এমন শক্তিশালী পরিণতি সম্ভব হয়েছে।
এই আশা বাস্তব ভিত্তি পায়, কারণ তথাকথিত ‘মেলোড্রামা’র কৌশলগুলোকে ঋত্বিক তাদের মূল ক্ষুদে-বুর্জোয়া অবস্থান থেকে সরিয়ে জীবনের পক্ষে এক প্রবল ও প্রাণবন্ত বিস্ফোরণে পরিণত করেছেন।
ছবির গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোতে ক্লোজ-আপের সময় ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল লেন্সের অভিব্যক্তিবাদী ব্যবহার কিংবা নাটকীয় ও দৃশ্যগত স্তরের সুস্পষ্ট বিভাজনের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, ‘মেলোড্রামা’ এখানে একটি সচেতন শিল্পরীতি। আমাদের ক্ষুদে-বুর্জোয়া বাস্তববাদী চলচ্চিত্রের মতো তিনি বাস্তব জগতের দৃশ্যমান রূপকে করুণ ও আবেগময় করে তোলেন না। আবার সাজানো ও আবেগসর্বস্ব দৃশ্যবিন্যাসের মাধ্যমে বাস্তবতাকে দর্শকের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টাও করেন না। ছবির শব্দ ব্যবহারের ধরনও অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। শব্দ এখানে বাস্তবতার বিভ্রমকে আরও জোরালো করার জন্য ব্যবহৃত হয়নি। দর্শককে চিন্তাহীন আবেগের সঙ্গে চরিত্রের ভাগ্যে একাত্ম করে একটি মিথ্যা মানসিক পরিশুদ্ধি বা ক্যাথারসিস তৈরি করাও এর উদ্দেশ্য নয়। বরং ঋত্বিকের ছবিতে প্রকৃতির মানুষের দুঃখ ও সংঘাতের প্রতি উদাসীনতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় বৃত্তাকার প্যানোরামিক দৃশ্যগুলোতে। প্রকৃতির বিস্তৃত পরিসর যেন মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা ও দ্বন্দ্বের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। চরিত্ররা অবশ্য নিজেদের অনুভূতি দিয়ে চারপাশের ভূদৃশ্যকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে। সুবর্ণরেখা ছবির তরুণ প্রেমিক ভূদৃশ্যকে সুন্দর মনে করে, কারণ নিজের আকাঙ্ক্ষা আবিষ্কার করার পর তার মনেও সৌন্দর্যের অনুভূতি জেগেছে। কিন্তু সে সরাসরি নিজের ভালোবাসার কথা বলতে লজ্জা পায়। একইভাবে, ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নায়িকা পাহাড়ের বিস্তৃত প্রান্তরে মুক্তির স্বপ্ন দেখে। কিন্তু ছবিতে পাহাড়ের এই দৃশ্যগুলোই আবার তার ব্যক্তিগত বেদনার অনুভূতির বিপরীতে এক বাস্তব অবস্থান তৈরি করে।
এভাবে কবিতার বিষয়গত অনুভূতি ও গীতিময়তা অক্ষুণ্ণ রেখেও ঋত্বিক সেই ভয়াবহ বিকৃতি এড়িয়ে যান, যা আবেগনির্ভর বাস্তববাদের মাধ্যমে দর্শকের মন নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া পরিচালকেরা ঘটান। যখনই ভূদৃশ্যকে চরিত্রের অনুভূতির সমর্থনে ব্যবহার করা হয়, তখন তা এমন প্রবল ও সচেতন ভঙ্গিতে করা হয়—যেমন ‘সুবর্ণরেখা’র রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মের দৃশ্য—যে দর্শক বুঝতে পারে, এটি পরিচালকের শিল্পীসুলভ হস্তক্ষেপ; প্রকৃতির স্বাভাবিক বাস্তবতা নয়। সেখানে মৃত্যুপথযাত্রী মেয়েটির প্রতি প্রতীকী সহানুভূতি জানিয়ে ‘বাস্তবসম্মতভাবে’ কোনো প্রদীপের আলো কাঁপতে থাকে না। আবার অতিরঞ্জিত শব্দ ও উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্যের মাধ্যমে চরিত্ররাও দর্শকের জীবনকে ঝড়ের মতো তছনছ করে দেয় না। এ ধরনের প্রতীকী উপস্থাপনার বিকৃতিকে প্রায়ই ‘যোগাযোগের সুবিধা’ বা দর্শকের কাছে সহজবোধ্য হওয়ার যুক্তিতে বৈধতা দেওয়া হয়। অর্থাৎ আমাদের দর্শকদের বড় একটি অংশ যখন চরিত্রের অনুভূতি কিংবা সেই অনুভূতির শিল্পরূপের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক স্থাপনের একটি যথার্থ পদ্ধতি খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন তথাকথিত ‘যোগাযোগকারীরা’ বিনা দ্বিধায় দর্শকের এই পিছিয়ে পড়া মানসিকতাকে কাজে লাগান। এর ফলে শিল্পীর দায়িত্বই অস্বীকার করা হয়। শিল্পী একটি প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে এবং সমষ্টিগত একটি মাধ্যমে কাজ করেন। অথচ নিজের তৈরি পণ্যের বাজার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তিনি সচেতনভাবেই দর্শকের সামনে নতুন চেতনার সম্ভাবনা হাজির করা থেকে বিরত থাকেন। এই ধরনের প্রতীকায়ন শুধু চলচ্চিত্রমাধ্যমের স্বভাবেরই বিরোধী নয়, প্রকৃতির ওপর মানুষের আংশিক বিজয়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও এর সরাসরি সংঘাত রয়েছে। যে মানুষ বিমানে ভ্রমণ করেছে, অর্থাৎ আধুনিক আবহাওয়াবিদ্যার প্রযুক্তিগত সুবিধা গ্রহণ করেছে, সে যদি ঝড়ের দৃশ্যের মাধ্যমে করুণ অনুভূতি বা আবেগ প্রকাশ করে, তাহলে তার মধ্যে অসততা থাকে। কারণ, ঝড়কে সে এমন এক প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে দেখাচ্ছে, যার কাছে মানুষ অসহায়। অথচ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষ প্রকৃতির অনেক শক্তিকেই আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে।
অন্যদিকে, এমন একধরনের প্রতীকায়নও রয়েছে, যা ঐতিহ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও তার অর্থ বদলে দেয় এবং আমাদের নতুন চেতনায় সমৃদ্ধ করে। এবার সেই প্রতীকায়ন নিয়ে আলোচনা করা যাক। ঋত্বিক ঘটক একসময় ধর্মীয় অর্থে ব্যবহৃত নানা প্রতীককে নিজের ছবিতে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পাশাপাশি স্থাপনের মাধ্যমে তিনি সেগুলোকে ধর্মনিরপেক্ষ অর্থ দিয়েছেন। যেমন, ‘সুবর্ণরেখা’র বহুরূপী এবং পরিত্যক্ত বিমানবন্দর—দুটিই একেকটি ‘আদিরূপ’ বা আর্কিটাইপ। যে সমাজ এখনো সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে, সেখানে শিল্পীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো ধর্মীয় প্রতীক ও ধারণাকে ধর্মনিরপেক্ষ অর্থে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা। ইউরোপের রেনেসাঁস এই নীতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ। সেখানে করুণ অনুভূতির গুরুত্ব কমে আসে, আবেগের জায়গা নেয় দৃষ্টিভঙ্গি বা পারস্পেকটিভ। প্রকৃতিকে দেখা হয় একটি স্বতন্ত্র বাস্তব সত্তা হিসেবে। এমনকি খ্রিষ্টধর্ম ও খ্রিষ্টীয় পুরাণের নানা চরিত্র ও প্রাণীকেও মানবিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার মধ্যে নিয়ে আসা হয়। আমাদের দেশেও বৌদ্ধ বিপ্লবের পর অল্প সময়ের জন্য পণ্য উৎপাদনের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক পুঁজির বিকাশ ঘটেছিল। সেই সময় বাণিজ্যপথ ধরে গড়ে ওঠা শিল্পকলা—যেমন গুহাচিত্র ও ভাস্কর্য—নিজেদের মধ্যে যুক্তিবোধ এবং সংযত ইন্দ্রিয়সুখের প্রকাশ ঘটিয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তির নিম্নস্তর যুদ্ধরত স্থানীয় শাসকদের হাত থেকে বাণিজ্যপথ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মৌর্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামভিত্তিক অর্থনীতির যুক্তি শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সংকীর্ণ স্বার্থে আবদ্ধ, উৎপাদনহীন জ্যোতিষী ও সামন্তপ্রভুদের ক্ষমতা দখলের পথ তৈরি করে। চিন্তাভাবনা আর বস্তুগত পরিবর্তনের দিকে এগোয়নি; বরং তা পরিণত হয়েছিল সূক্ষ্ম তর্ক-বিতর্ক ও খুঁটিনাটি বিশ্লেষণে।
আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার সঙ্গে আর সক্রিয় কাজের নিরাপত্তা ও তৃপ্তির সম্পর্ক রইল না। তার জায়গা নিল উন্মত্ত, ভোগসর্বস্ব আচার-অনুষ্ঠান। বাস্তবতার ওপর জমতে থাকল অতিরিক্ত বোঝা। শিল্পরূপ আর মানুষের মধ্যে আদান-প্রদানের প্রাণবন্ত মাধ্যম, অর্থাৎ ভাষা হয়ে উঠল না; বরং নিজেই একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল। সামগ্রিক কাঠামো ভেঙে গিয়ে তার জায়গায় তৈরি হলো খুঁটিনাটির অন্তহীন বিস্তার। তাই ভয় হয় যখন দেখি, বিশ্ব পুঁজিবাদের শেষ দিকের মতাদর্শীরা যে সর্বগ্রাসী বাস্তববাদের ধারণা তৈরি করেছেন, তা আমাদের মধ্যযুগীয় খুঁটিনাটিপ্রীতি ও সূক্ষ্ম আনুষ্ঠানিকতাবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ সময়টি হওয়া উচিত ছিল সব অর্থেই নির্মাণের সময়। অথচ নিজেদের প্রগতিশীল ও রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে দাবি করেন এমন কিছু সমালোচকও বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের স্থূল বিকৃতিগুলো মেনে নিচ্ছেন। তাঁরা ভুলে গেছেন মন্টাজের মৌলিক তাৎপর্য। মন্টাজের অর্থ হলো নির্মাণ। বিচ্ছিন্ন কিছু দৃশ্য, শট, সংলাপ কিংবা আলাদা অংশ দিয়ে চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু তৈরি হয় না; তৈরি হয় সেগুলোর সামগ্রিক বিন্যাস ও সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।
তাদের দেখে মনে হয়, তারা বিশ্বাস করেন প্রগতিশীল শিল্পও সাবানের মতো কিনে নেওয়া যায়। তাই তারা এমন এক মানবতাবাদকে সমর্থন করতে প্রস্তুত, যা শ্রেণিগত বৈপরীত্যকে মুছে দিয়ে সবকিছুকে চিরন্তন নৈতিক সম্পর্ক ও আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে। এই মানবতাবাদ শুধু শ্রমজীবী মানুষের শ্রমকে শোষণ করে না; তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ, সৃজনশীলতা ও প্রতিবাদের শক্তি অবশিষ্ট রয়েছে, তা-ও চোখের জল, রক্ত কিংবা পরিশীলিত আবেগের আড়ালে ধুয়ে মুছে দিতে চায়।ঋত্বিক ঘটক তার দৃশ্য ও শব্দের কাঠামোর প্রবল অভিঘাতের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রকৃত সমস্যাগুলোর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রতীক ব্যবহারের ধরন, ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল লেন্সের প্রয়োগ এবং শব্দের তীব্র আঘাত—এসবই তার চলচ্চিত্রের ভাষার অংশ। তাঁর নির্মাণের এই রুক্ষতা ও কঠোরতা এসেছে তাঁর ব্যক্তিত্ব থেকে।
আমাদের অবশ্যই এমন চলচ্চিত্রভাষা খুঁজে বের করতে হবে, যার উৎস সরাসরি আমাদের নিজস্ব পরিবেশে এবং যা আমাদের ব্যক্তিগত স্বভাব ও মানসিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আশা করি, ঋত্বিক যেখানে কাজ শেষ করেছেন, আমরা সেখান থেকেই এগিয়ে যেতে পারব। আমার মনে আছে, ঋত্বিকের কাজের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল সুবর্ণরেখা ছবির মধ্য দিয়ে। তত দিনে তিনি প্রচলিত ‘মেলোড্রামা’র কাহিনিবিন্যাসকে যথেষ্ট ভেঙে ফেলেছেন এবং মহাকাব্যিক রীতির দিকে এগিয়ে গেছেন। তার আগের ছবিগুলোর মধ্যেও মহাকাব্যিক রীতির সম্ভাবনা ছিল, বিশেষ করে মেঘে ঢাকা তারা ও কোমল গান্ধার-এ। এই ছবিগুলোতে কাহিনির মধ্যে গান এবং নানা ইঙ্গিতপূর্ণ কাঠামোগত উপাদান যুক্ত হয়েছে। এসব উপাদান সরাসরি আবেগ সৃষ্টি করার জন্য নয়; বরং বৃহত্তর কোনো অর্থের দিকে ইঙ্গিত করে। তবে সামগ্রিকভাবে ছবিগুলো তখনো নাটকীয় রীতির মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। সংগীত, কবিতা ও বক্তব্যধর্মী উপাদানের বিমূর্ততা সেগুলোকে নাটকের স্বভাবজাত দীর্ঘ, অবিচ্ছিন্ন রূপক হয়ে ওঠা থেকে মুক্ত রেখেছিল।
‘সুবর্ণরেখা’য় এসে নাটকীয় কাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করে। প্রচলিত নাটকীয়তার ক্লিশেগুলোকে ঋত্বিক তার নিজের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেন। আমাদের সংস্কৃতির যে ভয়াবহ ও আঘাতমূলক পণ্যায়ন ঘটেছে, ছবিতে তার একটি উদাহরণ হলো সংস্কৃত ভাষার উপস্থিতি—পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র শহরের পটভূমিতে, ‘লা দোলচে ভিতা’র সঙ্গে পাশাপাশি। আমাদের আত্মধ্বংসী অজাচারপ্রবণ আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি হতে বাধ্য করা হয় এই ছবিতে। অথচ আমাদের পরিশীলিত ও স্থূল—দুই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাতারাই সাধারণত এসব আকাঙ্ক্ষাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আড়াল করে রাখেন। পরিশীলিত নির্মাতা কখনো এমন এক আনুষ্ঠানিক শূন্যতা তৈরি করেন, যেখানে একে অপরকে বাতিল করে এমন নানা প্রতীক ব্যবহার করা হয়। আবার কখনো তিনি আশ্রয় নেন অতিরিক্ত বাস্তববাদের। এই দুই পদ্ধতিরই ফল একই: বাস্তবতার মধ্যে শিল্পী ও দর্শকের সক্রিয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা। দর্শককে এমন এক বাস্তবতা মেনে নিতে অভ্যস্ত করা হয়, যাকে আপাতদৃষ্টিতে বস্তুনিষ্ঠ মনে হয়, কিন্তু যা কখনোই প্রকৃত অর্থে বস্তুনিষ্ঠ হতে পারে না। কারণ, এই বাস্তবতা তার স্রষ্টা—সামাজিক মানুষ—থেকে বিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে, স্থূল বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে বাস্তবতার স্রষ্টা আক্ষরিক অর্থেই ঈশ্বর কিংবা তাঁর বিকল্প কোনো শক্তি। কখনো তা প্রাকৃতিক নিয়ম, কখনো মানুষের চিরন্তন স্বভাব। এসব শক্তিকে দেখানো হয় ইতিহাসের বাইরে অবস্থিত, অপরিবর্তনীয়, সর্বব্যাপী ও চিরস্থায়ী হিসেবে। কিন্তু ঋত্বিকদার নায়কের ভেঙে পড়া আসলে আমাদের পৃথিবীর তৈরি মূল্যবোধগুলোর ভেঙে পড়াও। সে যদি আবার নদীর সোনালি তীর দেখতে পায়, তার কারণ সে আবার নিজের কাজের জন্য দায়িত্ব নিতে শিখেছে; নিজের কাজের তাৎপর্য বুঝতে পেরেছে।
চলচ্চিত্রের প্রধান কাজও হলো অর্থ তৈরি করা, এমন একটি ভাষা গড়ে তোলা, যা মানুষকে যুক্তিনির্ভর কর্মের দিকে নিয়ে যাবে। ফ্যাসিবাদী উসকানি কিংবা বিমূর্ত নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার নামে ব্যক্তিগত মুক্তির ধারণা—কোনোটিই চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্য হতে পারে না। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে, যখন চলচ্চিত্রের সঙ্গে আমার গভীর পরিচয় তৈরি হচ্ছে, তখন একদিন সরল মনে ঋত্বিকদাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি কীভাবে অর্থবহ শিল্পরূপের সঙ্গে আলোকচিত্রনির্ভর বাস্তববাদের সমন্বয় ঘটান। তিনি শুধু মৃদু হেসেছিলেন। মনে হয়েছিল, সমস্যাটিকে তিনি স্বীকার করছেন। তখনো এই সমস্যার সীমা ও সম্ভাবনা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হয়নি—এমনকি চলচ্চিত্রের দিক থেকে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর ক্ষেত্রেও নয়। আজ চলচ্চিত্রভাষা নিয়ে এসব প্রশ্ন অনেক বেশি স্পষ্ট হয়েছে। আমরা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে নতুন করে যাত্রা শুরু করছি। কিছু সমালোচকের মতে, ঋত্বিক ঘটকের প্রতিটি ছবি আলাদাভাবে অসম্পূর্ণ শিল্পসাফল্য। কিন্তু আমার মনে হয়, তার সমস্ত কাজকে একত্রে দেখলে সেগুলোই সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ এবং সবচেয়ে বেশি নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা জাগায়। নিজের কারিগরি দক্ষতা প্রদর্শনের ব্যাপারে তিনি কখনোই খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। শুনেছি, তার সর্বশেষ ছবিতেও তিনি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন। কিন্তু এ বিষয়ে নিশ্চিত থাকা যায় যে, তার কাজ তরুণদের কাছে সব সময়ই এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। যেসব তরুণকে তিনি এত ভালোবাসতেন, তারাও তার কাজের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে—কখনো তা থেকে দূরে সরে যাবে, আবার ফিরে আসবে; তারপর নতুন ও অনিশ্চিত পথে এগিয়ে যাবে সেই পথিকৃৎ ঋত্বিকদার চেতনা নিয়েই।
অন্যরা কিন্তু প্রথম কয়েকটি পদক্ষেপের পরই থমকে গিয়েছিল। তারা প্রথমে বাস্তবতাকে অনুকরণ করেছিল, তারপর অনুকরণ করতে শুরু করেছিল নিজেদেরই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









