ভারতীয় মহাকাব্য ‘রামায়ণ’ নিয়ে নির্মিত নতুন সিনেমায় রাবণ চরিত্রকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে আলোচনায় এসেছেন দক্ষিণী তারকা যশ। নীতেশ তিওয়ারির পরিচালনায় ‘রামায়ণ: পার্ট ১’ সিনেমায় রাবণের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। প্রচলিত কাহিনিতে রাবণকে মূলত ভয়ংকর এক অসুর ও প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো হলেও নতুন সিনেমায় তার ব্যক্তিত্ব, অতীত, আবেগ, ক্ষোভ ও মানবিক দ্বন্দ্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সিনেমাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো রাবণকে শুধু একজন খলনায়ক হিসেবে না দেখিয়ে তার চরিত্র গড়ে ওঠার পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করা। যশের অভিনয়ে রাবণের ক্ষমতা, অহংকার, বীরত্ব ও দুর্বলতার নানা দিক ফুটে উঠেছে।
রাবণের গল্প দিয়েই শুরু
সিনেমার প্রথম প্রায় ৫০ মিনিটজুড়ে দর্শকদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে রাবণের অতীত ও তার বেড়ে ওঠার গল্পে। সেখানে দেখা যায়, শৈশবে সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তার। মায়ের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি কঠিন পথ পাড়ি দেন। নিজের জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেন। তার লড়াইয়ের পেছনে ছিল জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও নিজেদের ভূমি ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
রাবণের এই অতীত তাকে প্রচলিত খলনায়কের পরিচয়ের বাইরে নিয়ে যায়। সিনেমায় তাকে কখনো অসহায়, কখনো ক্ষুব্ধ, আবার কখনো দেবতার কাছে সাহায্যপ্রার্থী এক মানুষ হিসেবেও দেখা যায়।
যশের অভিনয়ে ক্ষমতা ও দুর্বলতার মিশেল
‘কেজিএফ’ সিনেমার রকি ভাই চরিত্রের মাধ্যমে বিশাল তারকাখ্যাতি পাওয়া যশের জন্য রাবণের চরিত্রটি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ। তবে পর্দায় প্রভাবশালী পুরুষ চরিত্র ফুটিয়ে তোলার অভিজ্ঞতা তাকে এ ভূমিকায় সহায়তা করেছে বলে মনে করেন সমালোচক।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন মতে, যশ রাবণের চরিত্রে শক্তি, দাপট ও পৌরুষের পাশাপাশি আত্মসংশয় এবং দুর্বলতাও তুলে ধরেছেন। লঙ্কার সিংহাসনে বসার পর রাবণ প্রথমেই প্রজাদের জন্য সমতার ভিত্তিতে একটি রাজ্য গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু অতীতের অপমান ও বঞ্চনার স্মৃতি তাকে বারবার তাড়িত করে।
ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেও তার ভেতরের ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা তাকে অস্থির করে রাখে। ফলে চরিত্রটি একদিকে যেমন শক্তিশালী, অন্যদিকে তেমনি নানা মানসিক দ্বন্দ্বে আক্রান্ত।
রাবণের দশ মাথার ভিন্ন ব্যাখ্যা
সিনেমায় রাবণের দশ মাথাকে শুধু পৌরাণিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং তার মনের ভেতরে চলতে থাকা নানা চিন্তা, দ্বন্দ্ব ও পরস্পরবিরোধী আবেগের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে প্রতিশোধ নেওয়া এবং নিজেকে সংযত রাখার মধ্যে দ্বিধায় পড়ে যান রাবণ। তার মধ্যে একই সঙ্গে কাজ করে ক্রোধ, অনুশোচনা, যুক্তি ও প্রতিহিংসা। এই উপস্থাপনা চরিত্রটিকে আরও জটিল ও মানবিক করে তুলেছে।
তবে সিনেমাটি রাবণের নেতিবাচক দিকও আড়াল করেনি। নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বললেও তার চরিত্রে নারীর প্রতি অন্যায় আচরণের দৃষ্টান্ত রয়েছে। একইভাবে মৃত্যুকে জয় করার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও নিজের মৃত্যু নিয়ে একধরনের ভয় তাকে তাড়িত করে।
সৃজনশীলতার জায়গায় নিরাপদ পথ বেছে নিয়েছে সিনেমা
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের পর্যালোচনায় সিনেমাটির সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন মতে, ‘রামায়ণ’র মতো বহুল পরিচিত মহাকাব্য নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে নতুন ব্যাখ্যা, সৃজনশীল স্বাধীনতা ও সাহসী নির্মাণশৈলীর সুযোগ ছিল। কিন্তু পরিচালক নীতেশ তিওয়ারি অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত কাহিনি অনুসরণ করেছেন।
ফলে সিনেমাটি দর্শকদের বিনোদন দিতে সক্ষম হলেও মহাকাব্যটির নতুন কোনো বৈপ্লবিক ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারেনি। তবে রাবণের চরিত্র নির্মাণে যে গভীরতা দেখানো হয়েছে, সেটিই সিনেমার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন।
মহাকাব্যের খলনায়ককে নতুনভাবে দেখার সুযোগ
সমালোচকের মতে, রামায়ণের মতো মহাকাব্যের অভিযোজন শুধু ভালো ও মন্দের লড়াই দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং একজন মানুষের চরিত্র কীভাবে গড়ে ওঠে, তার সিদ্ধান্তের পেছনে কী ধরনের অভিজ্ঞতা ও মানসিক দ্বন্দ্ব কাজ করে, সেটিও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
‘রামায়ণ: পার্ট ১’-এ যশের রাবণ চরিত্র সেই সুযোগ তৈরি করেছে। সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনির কাঠামো থেকে খুব বেশি দূরে না গেলেও রাবণের মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরার মাধ্যমে দর্শকদের নতুনভাবে ভাবার অবকাশ দিয়েছে।
রণবীর কাপুর, সাই পল্লবী, যশ, রবি দুবে, সানি দেওলসহ একাধিক তারকা অভিনয় করেছেন সিনেমাটিতে। রাম চরিত্রে রণবীর কাপুর এবং সীতার চরিত্রে সাই পল্লবী অভিনয় করেছেন। সিনেমাটির দ্বিতীয় পর্বে রাম ও রাবণের মধ্যকার সংঘাত আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









