কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্ববাজারে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন, ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিপুল ব্যয় এবং ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় সম্ভাব্য আর্থিক সংকটের আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এআই খাতের বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্ব অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের সঞ্চয়েও পড়তে পারে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) প্রকাশিত বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রযুক্তির শেয়ারে বড় ধস
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর এআই খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিটে ব্যাপক দরপতনের পর প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়।
গত এক মাসে সূচকটি প্রায় ১২ শতাংশ হারিয়েছে। এর ফলে নাসডাকভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারমূল্য থেকে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার কমে গেছে। বাজারের ভাষায় সূচকটি এখন সংশোধন বা ‘কারেকশন’ পর্যায়ে রয়েছে।
প্যারিসভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কারমিনিয়াকের কেভিন থোজেটের মতে, যেসব অঙ্গরাজ্যে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বড় প্রকল্প রয়েছে, সেখানে ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের ফলে এসব প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে পারে এবং নির্মাণকাজ দীর্ঘায়িত হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা মূলত এই ঝুঁকিই বিবেচনায় নিচ্ছেন।
এআই অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ ব্যয়
এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তৈরি হচ্ছে বিশাল আকারের ডেটা সেন্টার। এসব কেন্দ্রে এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ ব্রুনো কাভালিয়েরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় ৩০ শতাংশে অবদান রেখেছে ডেটা সেন্টার খাতের বিনিয়োগ। এ সময়ে ডেটা সেন্টার খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ।
এই বিনিয়োগের ফলে উন্নত চিপ, সার্ভার, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা, শীতলীকরণ প্রযুক্তি এবং নির্মাণ খাতে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগও বেড়েছে।
তবে ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় জনমত তৈরি হচ্ছে। পরিবেশদূষণ, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার, পানির সংকট, শব্দদূষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে এসব প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন অনেকে।
ঋণের বোঝা বাড়াচ্ছে নতুন ঝুঁকি
এআই খাতে বিনিয়োগের বড় একটি অংশ ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হচ্ছে। ফলে সুদের হার বাড়তে থাকায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন অর্থ সংগ্রহ ও পুরোনো ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষক আলেক্সান্দ্রে বারাদেজের মতে, শেয়ারবাজারে দরপতন এবং ঋণবাজারে উচ্চ সুদের হার—দুই পরিস্থিতি একসঙ্গে চলতে থাকায় এআই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সময়টি বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে অর্থ দিতে অনীহা দেখাতে পারেন। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে, তারাও নতুন ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তবে প্যারিসভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান স্টিলগারের জ্যাক-অরেলিয়েন মার্সিরো মনে করেন, ডেটা সেন্টার নির্মাণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁর মতে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পগুলো বাদ পড়লে তা দীর্ঘমেয়াদে খাতটির জন্য ইতিবাচকও হতে পারে।
সাধারণ মানুষের সঞ্চয়েও পড়তে পারে প্রভাব
এআই খাতের শেয়ারবাজারে দীর্ঘস্থায়ী পতন হলে তার প্রভাব সাধারণ মার্কিন পরিবারগুলোর ওপরও পড়তে পারে। কারণ দেশটিতে অনেক মানুষ অবসরকালীন সঞ্চয় ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগের অর্থ শেয়ারবাজারে রাখেন।
অর্থনীতিবিদ কাভালিয়েরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর মোট সম্পদের প্রায় ৪৩ শতাংশ শেয়ারবাজারের সঙ্গে যুক্ত। ২০০০ সালে এই হার ছিল ৩৩ শতাংশ।
ফলে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হলে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও বিনিয়োগকারীদের সম্পদের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এতে তাদের কেনাকাটা ও ব্যয় করার সক্ষমতাও হ্রাস পেতে পারে।
বিশ্লেষক বারাদেজের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষ দেশটির মোট ভোক্তা ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করেন। শেয়ারবাজারে তাঁদের সম্পদের বড় অংশ বিনিয়োগ করা রয়েছে। ফলে বাজারে বড় ধস হলে তাদের ব্যয়ও কমতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অ্যানথ্রোপিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
এআই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বিশেষ নজরে রয়েছে চ্যাটবট ক্লডের নির্মাতা অ্যানথ্রোপিক। প্রতিষ্ঠানটি চলতি মাসে শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ২ লাখ কোটি ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলেও ধারণা করা হয়েছিল। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে, অ্যানথ্রোপিকের প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই তাদের আইপিও পরিকল্পনা আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষক বারাদেজের মতে, অ্যানথ্রোপিকের আইপিও এআই খাতের বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
এআই বিপ্লব কি থমকে যাচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখনো রয়েছে। তবে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত মুনাফা অর্জন করতে পারবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একদিকে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ও চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয়, ঋণের বোঝা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তুলছে।
ফলে এআই খাতে বিনিয়োগের গতি কমে গেলে তার প্রভাব প্রযুক্তি শিল্প থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান, শেয়ারবাজার এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









