চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন ‘দারুণ’। কিন্তু তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সবচেয়ে কঠিন বিরোধগুলোর কোনোটিরই বড় ধরনের সমাধান হয়নি। বরং বৈঠকজুড়ে কূটনীতির চেয়ে আনুষ্ঠানিকতা, অগ্রগতির চেয়ে প্রদর্শনই বেশি চোখে পড়েছে।
মে মাসে বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিন পিংয়ের বৈঠককে যদি ‘অচলাবস্থার সম্মেলন’ বলা হয়ে থাকে, তবে এ সপ্তাহের দ্বিতীয় দফার বৈঠককে আরও এক ধাপ এগিয়ে ‘কূটনীতির বদলে কূটনৈতিক বিনোদন’ বলা যায়। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বিরোধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান, ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং মানবাধিকার নিয়ে বড় কোনো সমঝোতা হয়নি। বরং সফরের অন্যতম আলোচিত খবর হয়ে উঠেছে—চীন আটলান্টার চিড়িয়াখানায় দুটি জায়ান্ট পান্ডা পাঠাবে।
শি জিনপিংয়ের আগমনে ট্রাম্পের আয়োজন ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীনা নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে নিজেই জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে যান—যা কয়েক দশকের প্রচলিত রীতির ব্যতিক্রম। এরপর শুরু হয় তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর। সি দেখলেন ট্রাম্পের নতুন হেলিপ্যাড, মেরিন ওয়ান হেলিকপ্টারও। দুই নেতা প্রায় ৯০ মিনিট বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে ট্রাম্প সেটিকে ‘দারুণ’ বলে বর্ণনা করেন। এমনকি তিনি জানান, সি ‘গ্রানাইটের প্রতি গভীর আগ্রহ’ দেখিয়েছেন।
তবে সফরের দৃশ্যপট যতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল, বাস্তব কূটনৈতিক ফলাফল ততটা নয়। বাইডেন প্রশাসনে চীনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা জুলিয়ান গেওয়ার্টজের মতে, ট্রাম্প শি জিন পিংয়ের প্রতি ‘অসাধারণ মাত্রায় সম্মান প্রদর্শন’ করেছেন। এই সফরের আগে প্রত্যাশা এমনিতেই খুব বেশি ছিল না। কিন্তু আলোচনার ফলাফল সেই সীমিত প্রত্যাশাকেও খুব বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।
দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বিরোধগুলোর একটি বাণিজ্য। গত বছর চীনা পণ্যের ওপর একের পর এক শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। সে সময় হোয়াইট হাউসের অভিযোগ ছিল, চীনের ‘অন্যায্য’ বাণিজ্যনীতি যুক্তরাষ্ট্রে ৩৭ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর পেছনে ভূমিকা রেখেছে এবং দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়েছে।

চীনা পণ্যের আমদানি কমানো এবং বেইজিংয়ের ওপর চাপ তৈরি করাই ছিল শুল্কনীতির অন্যতম লক্ষ্য।
কিছুটা সাফল্যও এসেছিল। ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়, যেখানে ২০২৪ সালে তা ছিল প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার। তবে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, এই পরিসংখ্যান পুরো চিত্র দেখায় না। চীনা পণ্যের একটি অংশ তৃতীয় কোনো দেশের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে। ফলে সরাসরি চীন থেকে আমদানির পরিমাণ কমলেও চীনা পণ্যের প্রবাহ পুরোপুরি থামেনি।
এদিকে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত গত বছর প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এই দ্বন্দ্বের গুরুত্বও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মিলে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪৩ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব তাদের দুই দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে ট্রাম্প ও সি একটি অস্থায়ী বাণিজ্যবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা থেকে শুরু করে চীনের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি—উভয় পক্ষের জন্যই এই বিরতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কিন্তু সেই বিরতির মেয়াদ নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। চীন চাইছিল, বিরতিটি ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত—অর্থাৎ ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত—বাড়ানো হোক।
বৃহস্পতিবার জানা গেল, শি জিন পিংয়ের এক দশকেরও বেশি সময় পর প্রথম রাষ্ট্রীয় যুক্তরাষ্ট্র সফরের ফল হলো মাত্র দুই মাসের মেয়াদ বৃদ্ধি। এশিয়া সোসাইটির জ্যেষ্ঠ ফেলো নিল থমাসের মতে, এই সিদ্ধান্ত দেখিয়েছে যে ‘জাঁকজমক ও আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এই সম্মেলনের জন্য খুব বেশি প্রস্তুতি ছিল না।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং আরও সরাসরি বলেছেন, সম্মেলনে বাস্তব বিষয়ের চেয়ে ‘প্রতীক ও আনুষ্ঠানিকতাই’ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে নানা বিষয়ে মৌলিক মতপার্থক্য এখনো এত গভীর যে বাণিজ্যবিরতির মাত্র দুই মাসের মেয়াদ বৃদ্ধি তারই প্রতিফলন।
চীনের হাতে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র রয়েছে—বিরল মাটি বা রেয়ার আর্থ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ। এসব খনিজ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও সামরিক সরবরাহব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীন যখন এগুলোর রপ্তানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ট্রাম্পের শুল্কনীতির চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা অনেকটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
গেওয়ার্টজের মতে, বেইজিংয়ের পাল্টা পদক্ষেপ ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের চীনের বিরুদ্ধে ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহে ‘গভীর প্রভাব’ ফেলেছে। বাণিজ্যবিরতি সামান্য বাড়ানো ছাড়া বৈঠকটি অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও বড় কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান, ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং মানবাধিকার—সবগুলোই আলোচনায় ছিল। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।
তাইওয়ান অবশ্য বরাবরের মতোই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
বেইজিং তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে এবং প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে, যদিও দ্বীপটির স্বাধীনতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না।
চীনা সূত্র অনুযায়ী, শি জিন পিং ট্রাম্পকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার ‘সঠিক অবস্থান’ বজায় রাখা।
এখানে শব্দের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র এত দিন বলেছে, তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে ‘সমর্থন করে না’। চীন চাইছে, ওয়াশিংটন আরও স্পষ্টভাবে বলুক—তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতার ‘বিরোধিতা করে’। এই পরিবর্তনটি বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে।
ট্রাম্প এ বিষয়ে তিনি শি জিন পিংয়ের সঙ্গে একমত হয়েছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট করেননি। একই সময়ে তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়ার বিষয়েও তিনি এখনো এগিয়ে যাননি। বেইজিং অবশ্য এই অস্ত্র বিক্রিই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাক, সেটি চায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও বড় কোনো সমঝোতা হয়নি। এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে সাম্প্রতিক সতর্কতার পরও ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তিনি বিষয়টিকে ‘যেভাবে আছে সেভাবেই’ রাখতে চান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের অবস্থানও একই। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। সিনেটের ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘উদ্দেশ্যের বদলে আড়ম্বর’ বেছে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এমন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনো উল্লেখযোগ্য চুক্তি ছাড়া সফর শেষ হয়েছে।
তবে এই সফরকে শুধু কী অর্জিত হলো, সেই হিসাব দিয়ে দেখলে চীনের দৃষ্টিকোণটি বোঝা কঠিন হতে পারে। চীনের জন্য কখনো কখনো বড় কোনো ঘোষণা না থাকাও একটি সাফল্য।
নিল থমাসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বেইজিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে সফরটি ‘খুব ভালো’ হয়েছে। শি জিন পিং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে বড় ধরনের সম্মান পেয়েছেন, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরের মর্যাদা পেয়েছেন এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই নেতাকে সমমর্যাদার বৈশ্বিক নেতা হিসেবে পাশাপাশি দেখানো হয়েছে।
এর বিনিময়ে চীনকে বড় কোনো ছাড় দিতে হয়নি। এটাই হয়তো এবারের বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
দুই দেশের সম্পর্কের মৌলিক বিরোধগুলো রয়ে গেছে। বাণিজ্যবিরতি সামান্য সময়ের জন্য বাড়ানো হয়েছে। তাইওয়ান নিয়ে অবস্থান বদলের কোনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। রেয়ার আর্থের প্রশ্নে চীনের চাপ বহাল আছে। এআই, মানবাধিকার এবং ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ নিয়েও বড় কোনো সমঝোতা হয়নি।
কিন্তু ক্যামেরার সামনে দুই নেতা পাশাপাশি দাঁড়িয়েছেন। লালগালিচা পাতা হয়েছে। হেলিকপ্টার দেখানো হয়েছে। পান্ডা পাঠানোর ঘোষণা এসেছে। কূটনীতির এই ছবিগুলো হয়তো সুন্দর। কিন্তু ছবির বাইরে যে কঠিন প্রশ্নগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোর উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
এ কারণেই এবারের ট্রাম্প–সি বৈঠকের সবচেয়ে বড় বার্তা হয়তো কোনো নতুন চুক্তি নয়। বরং এটি দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের গভীর দ্বন্দ্বগুলো এখনো অমীমাংসিত। আর সেই দ্বন্দ্বের মাঝেও বেইজিং দেখাতে পেরেছে—ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সম্মান আদায় করতে হলে সব সময় বড় কোনো ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
সূত্র: এ্যামি হকিংস, চীনা সিনিয়র প্রতিনিধি, গার্ডিয়ান


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









