চিনুয়া আচেবের ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৮ সালে—নাইজেরিয়ার স্বাধীনতার মাত্র দুই বছর আগে। উপন্যাসে একটি ইগবো লোককথা আছে। গল্পটি কচ্ছপের খোলস কেন ভাঙাচোরা, তার ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু আচেবের হাতে এই গল্প প্রকৃতির ব্যাখ্যা থেকে রাজনৈতিক রূপকে পরিণত হয়। একটি লোককথার ভেতর দিয়ে তিনি দেখান, ক্ষমতা কীভাবে ভাষা ও অস্ত্র—দুই শক্তিকেই ব্যবহার করে।
ক্ষুধার্ত কচ্ছপ তার চাতুর্য ও মিষ্টি কথায় পাখিদের সঙ্গে আকাশের ভোজে যাওয়ার সুযোগ পায়। প্রতিটি পাখি তাকে একটি করে পালক দেয়। কচ্ছপ প্রস্তাব করে, ভোজের সময় সবাই নতুন নামে পরিচিত হবে। নিজের নাম রাখে ‘তোমরা সবাই’। খাবার পরিবেশিত হলে এই শব্দের দ্ব্যর্থতা ব্যবহার করে সে সবার সেরা অংশ নিজের জন্য নিয়ে নেয়।পাখিরা প্রতারণাটি বুঝতে পারে । তারা নিজেদের পালক ফিরিয়ে নেয়। কচ্ছপ আকাশে আটকা পড়ে। টিয়া পাখিকে দিয়ে সে স্ত্রীকে বার্তা পাঠায়, যেন নিচে নরম কিছু বিছিয়ে রাখা হয়। কিন্তু টিয়া বার্তাটি বদলে দেয়। কচ্ছপ পড়ে যায় কোদাল, দা, বর্শা, বন্দুক ও কামানের ওপর। তার খোলস ভেঙে যায়। গ্রামের ওঝা টুকরোগুলো জোড়া লাগান। ইগবো লোককথা বলে, সেই থেকে কচ্ছপের খোলস আর মসৃণ নয়।
গল্পে কচ্ছপ কেবল একটি চতুর প্রাণী নয়। সে এমন এক ক্ষমতার প্রতীক, যে ভাষাকে নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র বানায় এবং অস্ত্রকে ক্ষমতার নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যবহার করে। পাখিরা তার অধীন থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত তারা বুঝতে না পারে যে প্রতিপক্ষের অস্ত্র ও ভাষাকেও নিজেদের মুক্তির কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। টিয়া পাখির পরিবর্তনটি তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে পাখি সাধারণত অন্যের কথা পুনরাবৃত্তি করে, সে এবার কথাকে নিজের উদ্দেশ্যে বদলে দেয়। নিপীড়িত মানুষ যখন শাসকের ভাষাকে কেবল পুনরাবৃত্তি না করে নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশের ভাষায় পরিণত করে, তখন ক্ষমতার একচেটিয়া অধিকার ভাঙতে শুরু করে। আচেবের সাহিত্য এই প্রশ্নটিই বৃহত্তর পরিসরে তোলে—কে ইতিহাস লেখে? কার ভাষায় ইতিহাস লেখা হয়? এবং কে সেই ইতিহাসের চরিত্র হয়ে থাকে?

‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ -এর শেষ দৃশ্য এ প্রশ্নের নির্মম উত্তর দেয়। ইউরোপীয় জেলা কমিশনার ওকনকোর জীবন নিয়ে একটি বই লিখতে চান। তার কাছে একজন মানুষের জীবন ও আত্মহত্যা বড়জোর একটি অধ্যায়ের উপাদান। বইটির নামও তিনি ঠিক করে ফেলেছেন—‘দ্য প্যাসিফিকেশন অব দ্য প্রিমিটিভ ট্রাইবস অব দ্য লোয়ার নাইজার’। একটি সমাজের জটিল ইতিহাসকে ‘বর্বর উপজাতিকে শান্ত করা’র প্রশাসনিক ভাষায় বন্দী করা হয়। আচেবের উপন্যাস সেই ভাষার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। কমিশনার যেখানে আফ্রিকান সমাজকে একটি বস্তু হিসেবে দেখেন, আচেবে সেখানে মানুষকে তার নিজস্ব ইতিহাস, দ্বন্দ্ব, সংস্কৃতি ও কণ্ঠসহ উপস্থিত করেন। এটি শুধু একটি উপন্যাসের কৌশল নয়; এটি ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে সংগ্রাম।
এই চিন্তাবীজ থেকে প্রতিরোধের সাহিত্যকে বুঝতে হবে। বিশ শতকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে যে সাহিত্য গড়ে উঠেছিল, তা কেবল সংগ্রামের ঘটনাবলি নথিবদ্ধ করেনি। এটি প্রশ্ন তুলেছে সেই জ্ঞানব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে ব্যবস্থা উপনিবেশিত মানুষকে ইতিহাসের কর্তা নয়, গবেষণার বিষয় হিসেবে দেখেছিল। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন সাহিত্যকে জাতীয় বিভাগে ভাগ করেছে—ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, আমেরিকান। তুলনামূলক সাহিত্যও বহু ক্ষেত্রে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকে কেন্দ্র করে নিজের পরিসর নির্মাণ করেছে। ফলে আফ্রিকা, আরব বিশ্ব, ক্যারিবীয় অঞ্চল, ভিয়েতনাম কিংবা লাতিন আমেরিকার সাহিত্য প্রান্তিক অবস্থানে থেকেছে।
এখানে প্রশ্নটি কেবল পাঠ্যসূচির নয়। সাহিত্য ব্যাখ্যার তত্ত্বও একটি নির্দিষ্ট ইতিহাস থেকে জন্ম নেয়। কাঠামোবাদ, উত্তর-কাঠামোবাদ, মনঃসমীক্ষণ কিংবা মার্কসবাদ—এসব তত্ত্ব কি সেইসব সমাজের সাহিত্যকে যথেষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, যাদের বাস্তবতা ইউরোপীয় আধিপত্যের অভিজ্ঞতায় গঠিত? নাকি প্রয়োজন তত্ত্বেরও পুনর্বিবেচনা—যেমন প্রয়োজন ইতিহাসের পুনর্লিখন? মরক্কোর লেখক আবদেলকেবির খাতিবি ‘মাগরেব প্লুরিয়েল গ্রন্থে ‘ডিকনস্ট্রাকশন’ ও ‘ডিকলোনাইজেশন’-এর মধ্যে সম্ভাব্য আদর্শগত সম্পর্কের কথা তুলেছিলেন। এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উপনিবেশমুক্তি শুধু ভূখণ্ডের ওপর থেকে বিদেশি পতাকা সরানোর নাম নয়। ক্ষমতার ভাষা, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও প্রতিনিধিত্বের কাঠামোও তার অংশ।
তাই প্রতিরোধের সাহিত্যকে শুধু সাহিত্যিক রূপ দিয়ে পড়লে তার রাজনৈতিক অর্থ হারিয়ে যায়। জানতে হয় লেখক কোথা থেকে কথা বলছেন, কার অভিজ্ঞতা বহন করছেন, কোন ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন এবং কার কাছে পৌঁছাতে চাইছেন। একটি কবিতা, উপন্যাস বা কারাগারের স্মৃতিকথা তখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক সংগ্রামের দলিল হয়ে উঠতে পারে।
ভাষার প্রশ্ন এখানে কেন্দ্রীয়। ইংরেজি, ফরাসি, পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ ছিল উপনিবেশিক ক্ষমতার ভাষা; আরবি, গিকুয়ু এবং বিভিন্ন স্থানীয় ভাষা ছিল মানুষের নিজস্ব স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের বাহক। স্বাধীনতার পর মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা ও গিনি-বিসাউ পর্তুগিজকে সরকারি ভাষা হিসেবে রেখে দেয়—বহু ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ এবং পর্তুগালের শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগ বজায় রাখার প্রয়োজনেও। আলজেরিয়ায় আবার আরবীকরণ হয়ে ওঠে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এখানে কোনো সহজ সমীকরণ নেই। ঔপনিবেশিক ভাষা কখনো আধিপত্যের মাধ্যম, আবার সেই ভাষাই প্রতিরোধের হাতিয়ার হতে পারে। আচেবের কচ্ছপ ও পাখির গল্পের মতোই, শাসকের ভাষাকে অধীন মানুষেরা নিজেদের অর্থে পুনর্গঠন করতে পারে। ভাষা তখন কেবল যোগাযোগ নয়—ক্ষমতার ক্ষেত্র।
প্রতিরোধের সাহিত্যকে এই কারণে প্রকাশনার রাজনীতির দিক থেকেও দেখতে হয়। বহু লেখা বইয়ের বাজারে পৌঁছায়নি। তা ছড়িয়েছে পুস্তিকা, সংবাদপত্র, টাইপ করা কপি, ক্যাসেট কিংবা ক্ষণস্থায়ী প্রকাশনায়। কোনো প্রকাশক ফিলিস্তিনি সাহিত্যকে ‘বাজারযোগ্য নয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন; কোনো সরকার ‘আপত্তিকর’ একটি গল্পের জন্য পুরো বই বাজেয়াপ্ত করতে পারে। ফলে প্রতিরোধের সাহিত্য একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ, বাজারের উদাসীনতা এবং সাংস্কৃতিক বিস্মৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে।
প্রতিরোধের সাহিত্য তাই কোনো এক দেশের সম্পত্তি নয়। এর অভিজ্ঞতা আলাদা, ইতিহাস আলাদা, ভাষা আলাদা; কিন্তু তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন প্রশ্ন আছে—নিজের জীবন ও ইতিহাসের অর্থ কে নির্ধারণ করবে?
প্রতিরোধের সাহিত্য তাই নিছক সাহিত্য নয়; এটি ইতিহাসের মালিকানা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। যে ক্ষমতা বন্দুক দিয়ে ভূখণ্ড দখল করে, প্রশাসন দিয়ে মানুষকে শাসন করে এবং ভাষা দিয়ে তাদের ইতিহাসের অর্থ নির্ধারণ করে, তার বিরুদ্ধে গল্প, কবিতা ও স্মৃতিও হয়ে উঠতে পারে প্রতিরোধের অস্ত্র। কারণ একটি জনগোষ্ঠীকে পরাজিত করার সবচেয়ে গভীর উপায় তার কণ্ঠকে অস্বীকার করা; আর মুক্তির শুরু সেই কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার মুহূর্তে। আচেবের কচ্ছপের গল্প থেকে ফিলিস্তিন, আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকার প্রতিরোধের সাহিত্য পর্যন্ত তাই একই সত্য ফিরে আসে—যে মানুষ নিজের গল্প নিজে বলতে শেখে, সে আর কেবল অন্যের ইতিহাসের চরিত্র হয়ে থাকে না। সে ইতিহাসের লেখক হয়ে ওঠে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন








