২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল গাজা উপত্যকায় হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার সতর্ক করেছিলেন, আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ ও জেরুজালেমে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের ‘আঞ্চলিক ধর্মীয় যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে। তিনি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও তাদের সশস্ত্র শাখাগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। তখনও কেউ জানত না, ১৮ মাস পর সেই প্রস্তুতি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার সঙ্গে যুক্ত হবে।
সিনওয়ার তখনই ৭ অক্টোবরের হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে ওই বক্তব্যে তিনি ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্ত করা এবং গাজার অবরোধ পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েলিদের উদ্দেশে দেওয়া আরেক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, তারা ‘বন্যার মতো’ আসবেন। তার ভাষায়, থাকবে অসংখ্য রকেট এবং যোদ্ধাদের একের পর এক ঢেউ।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সাংবাদিক শ্লোমি এলদার ও রুথ ইউভাল দাবি করেন, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ফাতাহর এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ইসরায়েলকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন সিনওয়ার। তাদের অনুসন্ধানের তথ্য পরে প্রকাশিত ‘হোস্টেজেস: ৮৪৩ ডেজ অব অ্যাব্যান্ডনমেন্ট’ বইয়েও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
লেখকদের দাবি, হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে একটি চুক্তি প্রায় প্রস্তুত ছিল। এতে বন্দিবিনিময় এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য শান্তির প্রস্তাবনা ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু চুক্তিটির অনুমোদন পিছিয়ে দেন। এরপর সিনওয়ার হামলার সিদ্ধান্ত নেন বলে ওই অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। এর আগে তিনি ইসরায়েল সরকারকে এমন প্রতিক্রিয়ার সতর্কতা দিয়েছিলেন, যা ‘ভূমিকম্প’ ঘটাবে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে আলোচনায় যুক্ত দলের সঙ্গে সিনওয়ারের যোগাযোগ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ইসরায়েলের শিন বেতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষায়, ‘তিনি আমাদের রাডার থেকে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।’
এর পরই ৭ অক্টোবর হামলা চালায় হামাস।
সিনওয়ারের মৃত্যু, গাজার ধ্বংস
হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজাজুড়ে বিমান হামলা ও অন্যান্য সামরিক অভিযান চালানো হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ইসমাইল হানিয়েহ নিহত হন।
হানিয়েহর উত্তরসূরি হিসেবে পরে সিনওয়ারকে বেছে নেয় হামাস। হামাসের এক সূত্রের ভাষায়, এই সিদ্ধান্ত ছিল সিনওয়ারের জনপ্রিয়তা এবং তার রাজনৈতিক পথের প্রতি সংগঠনের নেতৃত্বের আস্থার প্রকাশ। গাজায় হামাসের সশস্ত্র শাখা আল-কাসাম ব্রিগেড ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়। ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যেও তারা পাল্টা আক্রমণ চালায়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিনওয়ার নিহত হন। তার মৃত্যু হয় এমন এক সংঘর্ষে, যা ইসরায়েল আগে থেকে পরিকল্পনা করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার মৃত্যুর পরও গাজায় যুদ্ধ ও ধ্বংস চলতে থাকে। জাতিসংঘের কমিশনগুলো ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে ‘গণহত্যা’ শব্দ ব্যবহার করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার ৮২ শতাংশ ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার এবং পুনর্গঠনের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৭১ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিই গাজায় সিনওয়ারকে ঘিরে জনমত বদলের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পরও গাজার মানুষের মধ্যে সিনওয়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হামাসের সমর্থকদের মধ্যেও তার সিদ্ধান্তের সমালোচনা শোনা যাচ্ছে। ভিডিও, প্রত্যক্ষ বর্ণনা এবং স্থানীয় আলোচনায় এ নিয়ে ক্ষোভের কথা উঠে এসেছে। হামাসের এক সূত্র অবশ্য এই সমালোচনাকে অন্যায্য বলে মনে করেন। আশরাক আল-আওসাতকে তিনি বলেন, সিনওয়ারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় যে অপমান ও কঠোর সমালোচনা হয়েছে, তা ন্যায্য নয়। তার মতে, গাজায় দীর্ঘদিনের অবরোধ ও ইসরায়েলি হামলার বাস্তবতা সবাইকে অনুভব করানোর লক্ষ্যেই সিনওয়ার ওই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
কমেছে ৭ অক্টোবরের হামলার সমর্থন
ফিলিস্তিনি নীতি ও জনমত গবেষণা কেন্দ্রের জরিপগুলোতে ৭ অক্টোবরের হামলার প্রতি জনসমর্থন কমে আসার প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪ সালের মার্চের জরিপে পশ্চিম তীরে হামলার সমর্থন ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছিল। একই সময়ে গাজায় সমর্থন প্রায় ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছিল। ওই জরিপে সমর্থন বাড়ার একটি কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, অনেক ফিলিস্তিনি মনে করেন ৭ অক্টোবরের হামলা ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুকে আবার আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের জরিপে চিত্র বদলে যায়। পশ্চিম তীর ও গাজা মিলিয়ে হামলার প্রতি সমর্থন ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে যায়। গাজায় কমার হার ছিল ১৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। জুনের জরিপেও সেখানে সমর্থন ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছিল। ২০২৬ সালের আগস্টের জরিপে হামাসের প্রতি সমর্থন ২৪ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তা ছিল ৩৫ শতাংশ। পশ্চিম তীরে হামাসের সমর্থন ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৩২ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের আগস্টে ১৮ শতাংশে নেমেছে। গাজায়ও সমর্থন ৪১ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশ হয়েছে।
গত আগস্টে জেরুজালেম মিডিয়া ও যোগাযোগ কেন্দ্র এবং ফ্রিডরিখ এবার্ট ফাউন্ডেশনের যৌথ জরিপেও হামাসের প্রতি আস্থার পতনের চিত্র পাওয়া যায়। হামাসের ওপর আস্থা রাখা মানুষের হার ২০২২ সালের জুনের ১২ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
হামাসের ভেতরে কি প্রশ্ন উঠেছে?
৭ অক্টোবরের তিন বছর পর হামাসের চারটি সূত্র বলেছে, ওই হামলার কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা হয়নি। নেতাদের কেউ হামলার সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেননি। তাদের বক্তব্য, হামাসের অনেক নেতা হামলার বিষয়ে কিছু জানতেন না। কেউ কেউ কম-বেশি জানতেন। কিন্তু হামলার পর তাদের অবস্থানে পরিবর্তন আসেনি। গাজার বাইরে থাকা হামাসের আরেক সূত্র অবশ্য জানিয়েছেন, সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ব্যক্তিগত বৈঠকে মাঝেমধ্যে সমালোচনা হয়েছে। তবে তা হামলার মূল সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল না। আলোচনার পদ্ধতি, হামলার ব্যাপ্তি এবং ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া যথাযথভাবে অনুমান করতে না পারার মতো বিষয় নিয়ে মতভেদ ছিল।
ওই সূত্রের মতে, ধ্বংসের পরও ফিলিস্তিন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি বেড়েছে এবং ফিলিস্তিনের বিষয়টি আবার আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোস্তফা ইব্রাহিম অবশ্য স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, সিনওয়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে গাজায় এখনো প্রকাশ্য সমালোচনা ও ক্ষোভ রয়েছে। কারণ সিদ্ধান্তটির পর যে ধ্বংস, প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারানোর ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে গাজার মানুষকেই। ইব্রাহিম বলেন, গাজার বাইরে থাকা ফিলিস্তিনি বা অন্যরা সিনওয়ারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে পারেন। কিন্তু তারা গাজার মানুষের মতো ধ্বংস, হত্যাকাণ্ড, বাস্তুচ্যুতি ও ঘরবাড়ি হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি। গাজায় তাই সিনওয়ারকে নিয়ে আলোচনা এখন শুধু ৭ অক্টোবরের হামলার সিদ্ধান্তকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি। ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি, বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং যুদ্ধের দীর্ঘ ক্ষয়ক্ষতি—সবকিছু মিলিয়ে তার সিদ্ধান্তকে নতুন করে দেখছেন গাজার অনেক মানুষ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









