যুদ্ধ শিশুদের শৈশব কেড়ে নেয়। কখনো ধীরে, কখনো এক মুহূর্তে। গাজায় বড় হয়ে ওঠার স্বাভাবিক ছন্দ অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। ক্ষুধা, ঘরহারা জীবন, স্বজন হারানোর শোক আর আহত শরীর এখন তাদের বেড়ে ওঠার অংশ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। এর তিন বছর পরও সেই যুদ্ধের ক্ষত রয়ে গেছে। ২০২৬ সালের জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের অনেককে একাধিকবার ঘর ছাড়তে হয়েছে। গৃহহীন হয়েছে ১২ লাখের বেশি মানুষ।
এই বাস্তবতায় বেড়ে উঠছে গাজার শিশুরা। তাদের অনেকের স্কুল নেই, স্বাস্থ্যসেবা স্বাভাবিক নেই, নেই পরিচিত বাড়ি কিংবা নিরাপদ আশ্রয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি—অনেক শিশুই হারিয়েছে মা-বাবা, ভাইবোন কিংবা অন্য স্বজনকে।
ইউনিসেফের হিসাবে, গাজায় প্রায় ১৯ হাজার শিশু একা অথবা অনাথ হয়ে পড়েছে। তাদের কারও মা-বাবা নেই, কারও একজন অভিভাবক নিখোঁজ, আবার কেউ দুজনকেই হারিয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে এমন অনেক শিশুকে দেখা গেছে, যারা আহত অবস্থায় একাই সেখানে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সীমান্তবিহীন চিকিৎসক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ত্রাণকর্মীরা এসব শিশুকে বোঝাতে ‘ডব্লিউসিএনএসএফ’ শব্দটি ব্যবহার শুরু করেন। এর অর্থ—আহত শিশু, যার বেঁচে থাকা কোনো পরিবার নেই।
এসব শিশুর কেউ হাত-পা হারিয়েছে, কারও শরীরের বিভিন্ন অংশ চূর্ণ হয়েছে, কেউ গুরুতর দগ্ধ হয়েছে। তাদের অনেকেরই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ৫ হাজারের বেশি অঙ্গচ্ছেদ হয়েছে। তাদের প্রতি পাঁচজনের একজন শিশু। একই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রায় ৫৬ হাজার আহত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে।
সীমান্তবিহীন চিকিৎসক সংস্থার এক মুখপাত্র আরব নিউজকে বলেছেন, গাজায় ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ এমন আঘাত পেয়েছেন, যার প্রভাব তাদের জীবন বদলে দিতে পারে। শারীরিক ক্ষতই অবশ্য সব নয়। অনেক শিশুর জন্য আসল লড়াই শুরু হয় ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার পর। যুদ্ধের শব্দ, বিস্ফোরণ, ঘর হারানো এবং প্রিয়জনের মৃত্যু তাদের মনে এমন ভয় তৈরি করেছে, যা প্রতিদিনের জীবন থেকে আলাদা করা কঠিন।

২০২৬ সালের জুলাই মাসেই সীমান্তবিহীন চিকিৎসক সংস্থার দল সহিংসতায় আহত ৫৬৭ জনের চিকিৎসা দিয়েছে। তাদের মধ্যে বিস্ফোরণে আহত, দগ্ধ, গুলিবিদ্ধ এবং শারীরিক হামলায় আহত মানুষ ছিল। অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নের সময় ভূখণ্ডটির অর্ধেকের বেশি হাসপাতাল অকার্যকর ছিল। চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতিও মানবিক সহায়তার কাজকে কঠিন করে তুলেছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও সংকট থামেনি। গাজার অধিকাংশ মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো এবং পানি, পয়োনিষ্কাশন, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ তাদের প্রতিদিনের জীবনকে কঠিন করে রেখেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের হিসাবে, মূল্যায়ন করা ৯১ শতাংশ পরিবার মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার পানি-নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল।
এই পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে পড়ছে শিশুদের মনে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের মূল্যায়নে যুদ্ধ শুরুর পর গাজার শিশুদের মানসিক অবস্থার বড় ধরনের অবনতির কথা উঠে এসেছে। অনেক শিশুই যুদ্ধের বাইরে কোনো ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারছে না। বারবার বাস্তুচ্যুতি ও স্বজন হারানোর অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সংস্থাটি জানায়, শিশুরা লুকোচুরি খেলাকেও যুদ্ধের খেলায় পরিণত করছে। তারা একে অপরকে গুলি করার ভান করছে, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিনয় করছে, কেউ আবার মৃতের মতো পড়ে থাকছে। কেউ কেউ পুতুলের জানাজাও দিচ্ছে। আহত শিশু, স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন শিশু এবং যথাযথ যত্ন থেকে বঞ্চিত শিশুদের নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে ওয়ার চাইল্ড। ২০২৪ সালে ৫০৪টি পরিবারকে নিয়ে করা তাদের এক মূল্যায়নে এসব শিশুর গভীর মানসিক সংকটের চিত্র উঠে আসে।
অভিভাবকেরা জানিয়েছেন, অনেক শিশু আশপাশে যা ঘটছে তা মেনে নিতে পারছে না। তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মৃত্যুর অপেক্ষার মতো এক স্থায়ী ভয়। যে অনুভূতিকে ভাষায় বলা কঠিন, তা অনেক সময় শিশুর আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে।
১৪ বছরের সালমা তাদেরই একজন। বেঁচে থাকা স্বজনদের সঙ্গে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজা থেকে মিসরে পালিয়ে যেতে পেরেছে সে। কিন্তু গাজার যুদ্ধ তার সঙ্গে রয়ে গেছে। হঠাৎ কোনো জোরে শব্দ হলেই সালমা চমকে ওঠে। সে আরব নিউজকে বলেছে, শব্দ শুনলে তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, কখনো শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং হাত ঘেমে যায়। শান্ত থাকার অনুভূতিটা কেমন, সেটাই যেন সে ভুলে গেছে।
মিসরের স্কুলে সহপাঠীদের মধ্যেও নিজেকে আলাদা মনে হয় সালমার। আগে যে বিষয়গুলো তাকে হাসাত, এখন সেগুলো আর হাসায় না। সে ভয় পায়, সহপাঠীরা হয়তো তাকে বিষণ্ন মানুষ হিসেবে দেখে। সে বলেছে, স্বাভাবিক হতে চায়, আনন্দ করতে চায়। কিন্তু ভেতরের ভারটা সরাতে পারে না। তার ভয়—এই অবস্থাই হয়তো তার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকবে। যুদ্ধের আগের জীবন এখন তার কাছে দূরের কোনো স্বপ্নের মতো।

সালমার বাবা বলেন, পরিবারের মানসিক শান্তি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। মেয়েকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু মা ও ভাইবোন হারানোর শূন্যতা কী দিয়ে পূরণ করবেন—তার উত্তর তার কাছে নেই। যুদ্ধের ভয়াবহ দৃশ্য নিজের চোখে দেখা একটি শিশুর কাছে এসব বাস্তবতা বোঝার কথা ছিল না। তার ভাষায়, প্রতিটি দিনই সংগ্রামের। যে ভবনে তাদের পরিবার ছিল, সেটি ধসে পড়ার দিনই যেন তারা সবাই মারা গেছে। এখন তারা শুধু জীবিত, কিন্তু মনে হয় মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
গাজায় শিশুদের জন্য জরুরি শিক্ষা ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটির সমাজসেবা দল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৯৮ জন বাস্তুচ্যুত মানুষকে বিভিন্ন সেবা দিয়েছে। এর মধ্যে মানসিকভাবে তাৎক্ষণিক সহায়তাও রয়েছে।
গাজা সিটি ও খান ইউনিস এলাকায় সংস্থাটির স্বাস্থ্য দলও মানসিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মানসিক সহায়তাকারী ও তত্ত্বাবধায়করা রয়েছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে গাজায় যুদ্ধাহত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে কাজ করা মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জেমস গর্ডনের মতে, ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও অন্যদের সঙ্গে সংযোগের অনুভূতি ফিরে পেতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন সহায়ক মানুষ ও এমন কিছু বাস্তব উপায়, যা মানুষকে আবার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি দেয়।
গাজার শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রয়োজন আরও তীব্র। কারণ তাদের ট্রমা কোনো একক ঘটনার ফল নয়। বারবার বোমাবর্ষণ, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পালানো এবং নিরাপদ মনে হওয়া মানুষ ও জায়গাগুলো হারানোর মধ্য দিয়ে তাদের বেড়ে উঠতে হয়েছে। এই শিশুদের সামনে কাজটি অতীত ভুলে যাওয়া নয়। বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা আবার নিরাপদ বোধ করতে পারে এবং সেই নিরাপত্তার ভেতর দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে পারে। তাই তাদের জন্য শুধু মানসিক পরামর্শই যথেষ্ট নয়। দরকার রাতে ঘুমানোর জন্য একটি স্থির জায়গা, পাশে এমন বড় মানুষ যারা আশ্বস্ত করতে পারে, এমন স্কুল যেখানে আবার নিয়মিত দিনের ছন্দ ফিরবে এবং এমন নিরাপত্তা যেখানে শিশুরা খেলতে পারবে।
যুদ্ধের দীর্ঘ সময়ে যখন শৈশবের বড় একটি অংশ কেটে গেছে বেঁচে থাকার চেষ্টায়, তখন সুস্থ হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ হয়তো খুব সাধারণ কিছু—শিশুদের আবার একটি স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ কল্পনা করার সুযোগ দেওয়া। এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেটিকে তারা সত্যিই নিজেদের বলে ভাবতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









