ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার কি দেশকে স্বৈরশাসনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্ন তুলে ইউটিউবে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন ধ্রুব রাঠি। দুর্নীতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের ওপর চাপ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে তার বিশ্লেষণ অল্প সময়েই ব্যাপক দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়। মোদি সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই ইউটিউবারের জনপ্রিয়তা এখন ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় ধ্রুব রাঠির ভিডিওগুলো বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। ভারতের প্রায় ৯৭ কোটি ভোটারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও হয়ে ওঠে জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেখানে রাঠির বক্তব্য পৌঁছে যায় বহু মানুষের কাছে, যাদের কাছে প্রচলিত রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের তুলনায় তার ভিডিও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল।
তার মূল ইউটিউব চ্যানেলে গ্রাহকসংখ্যা ছিল দুই কোটির বেশি। তুলনায় ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের ইউটিউব চ্যানেলের গ্রাহক ছিল ৫০ লাখের কিছু বেশি। দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা রাহুল গান্ধীর গ্রাহকসংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ লাখ। অন্যদিকে মোদির নিজস্ব চ্যানেলে গ্রাহক ছিল প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ। অর্থাৎ, রাজনৈতিক নেতা না হয়েও রাঠি অনলাইন দর্শকের কাছে বড় একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
মোদির সমর্থন থেকে বিরোধিতা
ধ্রুব রাঠির রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় তার তরুণ বয়সে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় রাঠি উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে যন্ত্রকৌশলে পড়াশোনার জন্য জার্মানিতে গিয়েছিলেন। এর আগে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ভারতের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছিল। কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে সেই আন্দোলন এবং মোদির দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য বহু তরুণের মতো রাঠিকেও আকৃষ্ট করেছিল।
একসময় তিনি মোদির সমর্থক ছিলেন। কিন্তু ২০১৫ সালে দিল্লিতে দুর্নীতিবিরোধী একটি হেল্পলাইন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও আম আদমি পার্টির নেতৃত্বাধীন দিল্লি সরকারের বিরোধ তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে।
রাঠির ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি সরকারের মধ্যে ওই হেল্পলাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তাকে হতাশ করেছিল। তার মনে হয়েছিল, দুর্নীতি দূর করার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সরকারের কর্মকাণ্ডের মিল নেই।
একই সময়ে ভারতের কয়েকটি মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ পরিবেশনায় মোদি ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রতি পক্ষপাত দেখেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এর পর থেকেই রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে ইউটিউবে নিয়মিত বক্তব্য দেওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি সেল এবং রাজনৈতিক প্রচারে তথ্য ও অপতথ্যের ব্যবহার নিয়ে তার প্রথম রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী ভিডিও প্রকাশিত হয়। সম্পূর্ণ নিজের ফোনে ধারণ করা সেই ভিডিওর নির্মাণ ছিল সীমিত। পরবর্তী সময়ে গবেষণা, চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও উপস্থাপনায় যুক্ত হয় পেশাদারত্ব।
২০২০ সাল পর্যন্ত গবেষণা থেকে ভিডিও সম্পাদনা—প্রায় সব কাজ নিজেই করতেন রাঠি। পরে গবেষক, চিত্রনাট্যকার ও ভিডিও সম্পাদকদের নিয়ে দল গঠন করেন। তার দাবি, তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে এখন আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জনপ্রিয়তার রহস্য কোথায়
রাঠির জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত, তিনি সহজ হিন্দিতে জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় ব্যাখ্যা করেন। বিজেপির শক্তিশালী সমর্থনভিত্তির বড় অংশ উত্তর ভারতে, যেখানে হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যা বেশি। হরিয়ানা রাজ্য থেকে উঠে আসা রাঠি এই দর্শকদের কাছে পরিচিত ভাষায় নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, একসময় মোদির সমর্থক থাকার অভিজ্ঞতা তাকে এমন দর্শকের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে, যারা আগে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করলেও পরে তার সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
রাজনৈতিক ব্যঙ্গবিদ আকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, রাঠি এমন ভাষায় কথা বলেন, যা মোদির সমর্থক ও সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের কাছেও পৌঁছাতে পারে। তার বক্তব্যের লক্ষ্য দেশ বা ধর্মের বিরোধিতা নয়, বরং রাজনৈতিক নেতা ও দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের সমালোচনা।
রাঠির ভিডিওতে তথ্যচিত্র, গ্রাফিকস, অ্যানিমেশন ও পরিসংখ্যানের ব্যবহারও দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখে। তিনি দাবি করেন, আগের ভিডিওগুলোতে কখনো কখনো তথ্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত মতামত মিশে যেত। সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন তথ্য যাচাইয়ে বেশি সতর্ক হয়েছেন।
তবে তার কাজ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। বিরোধীদের বক্তব্য বেছে বেছে তুলে ধরা, তথ্যের নির্বাচিত ব্যবহার এবং বিরোধী নেতাদের অস্বস্তিকর বিষয় উপেক্ষা করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠেছে। রাঠি এসব সমালোচনার জবাবে নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হিসেবে দেখাতে চান না।
রাজনীতির বাইরে অন্য ধ্রুব
রাজনৈতিক ভিডিওর পাশাপাশি ভ্রমণ নিয়েও কাজ করেন রাঠি। তার আরেকটি চ্যানেল ‘ধ্রুব রাঠি ভ্লগস’-এ স্ত্রী জুলির সঙ্গে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, মঙ্গোলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল, সেশেলসের সমুদ্রসৈকত এবং দুবাইয়ের গভীরতম সুইমিং পুল নিয়ে তার ভিডিও রয়েছে।
রাজনৈতিক ভিডিওতে যেমন কঠিন বিষয় ব্যাখ্যা করেন, ভ্রমণ ভিডিওতে তেমনই সহজ ও হালকা উপস্থাপনা দেখা যায়। কখনো রাজনৈতিক ব্যঙ্গেও এই ভঙ্গি ব্যবহার করেন তিনি। মোদি সরকার ইউক্রেনে আটকে পড়া ভারতীয় শিক্ষার্থীদের উদ্ধার নিয়ে প্রচার চালালে বিজ্ঞাপনের বক্তব্য অনুকরণ করে ‘যুদ্ধ থামিয়ে দিলেন মোদিজি, বাবা’ অর্থে ব্যঙ্গাত্মক বাক্য ব্যবহার করেছিলেন রাঠি। সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয়।
সমালোচনা, হুমকি ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন
মোদি সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে রাঠি ব্যক্তিগত আক্রমণ ও হুমকির মুখে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। তার দাবি, তাকে ও তার স্ত্রীকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করে অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। তিনি নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি পান এবং তার স্ত্রী অনলাইনে ধর্ষণের হুমকি পেয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে ভারতে নিজের ও পরিবারের অবস্থান প্রকাশ করতে চান না তিনি।
ভারতে সরকারবিরোধী অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের ওপর বিধিনিষেধ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’-এর সম্পাদক সীমা চিশতি মনে করেন, সমালোচকদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইন ব্যবহারের ফলে অন্যদের মধ্যেও আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু রাঠির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ভারতে যথেষ্ট মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। তার মতে, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়মিত সমালোচনা করা হলেও মানুষ এসব বক্তব্যের বাস্তবতা বুঝতে পারে।
রাঠি নিজেও স্বীকার করেন, বিজেপির বিশাল প্রচারব্যবস্থার তুলনায় তার একার প্রভাব সীমিত। তাই অন্য ছোট নির্মাতাদের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করেন তিনি। তার মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক আলোচনা ছড়িয়ে দেওয়াও জরুরি।
রাঠির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলেও তার জনপ্রিয়তা ভারতের গণমাধ্যম ও রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের বাইরে ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্ম কতটা জনমত গঠন করতে পারে? আর সেই জনমত গণতন্ত্রের পক্ষে নতুন কণ্ঠ তৈরি করবে, নাকি রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়াবে?
রাঠির বক্তব্য স্পষ্ট—এখন কথা বলার সময়। তার আশঙ্কা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দুর্বল হতে থাকলে নীরব থাকার মূল্য আরও বড় হয়ে উঠতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









