সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার কখনো শুধু একজন লেখকের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া নয়; কখনো তা সাহিত্যের প্রচলিত সীমানাকেও নতুন করে প্রশ্ন করা। অ্যান কারসনের নোবেলজয়ী হওয়ার খবর তেমনই এক মুহূর্ত। কবিতা, অনুবাদ, প্রাচীন গ্রিক-রোমান সাহিত্য, গদ্য, নাটক—বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যিক রীতিকে তিনি এমনভাবে মিলিয়েছেন, যেন সাহিত্যের জন্য আলাদা আলাদা ঘর বানানোই এক ধরনের ভুল। তাঁর লেখায় বুদ্ধি ও অনুভূতি পাশাপাশি হাঁটে; অদ্ভুতের সঙ্গে মিশে থাকে গভীর মানবিক সত্য।
কারসনের নোবেল ঘোষণার পর তাই শুধু পাঠকেরাই নয়, বিশ্বের খ্যাতিমান লেখকেরাও তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। মার্গারেট অ্যাটউড, এমিলি উইলসন, ওশান ভুয়ং ও বুকার-মনোনীত লেখক রেবেকা পেরি—প্রত্যেকের কথায় উঠে এসেছে কারসনের স্বাতন্ত্র্য, তাঁর কঠোর বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান এবং সাহিত্যের প্রচলিত ছক ভেঙে নতুন পথ তৈরির ক্ষমতা।
মার্গারেট অ্যাটউড
মার্গারেট অ্যাটউডের কাছে কারসনের লেখা বহু দেশের কবিদের দীর্ঘদিনের প্রশংসার বিষয়। নতুন পাঠকেরা কোথা থেকে শুরু করবেন—সে প্রশ্নের উত্তরে তিনি দুটি বইয়ের কথা বলেছেন: ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ এবং ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’। অ্যাটউডের ভাষায়, ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ সরাসরি, শরীরী, একই সঙ্গে মজার, রাগী ও বিষণ্ন। তারপর তার সংক্ষিপ্ত মন্তব্য: সামনে অনেক আনন্দ অপেক্ষা করছে। এই ‘আনন্দ’ আসলে কারসনের বই পড়ার আনন্দ—যেখানে কবিতা কখনো কেবল সুন্দর হওয়ার চেষ্টা করে না; বরং প্রশ্ন করে, আঘাত করে, হাসায় এবং পাঠককে নিজের অচেনা জায়গাগুলোর সামনে দাঁড় করায়।
এমিলি উইলসন
ক্লাসিক্যাল সাহিত্য ও অনুবাদের জগতের বিশিষ্ট লেখক এমিলি উইলসনের অভিনন্দনে নোবেল পুরস্কারের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে কারসনের সাহিত্যিক স্বাধীনতা।
তিনি মনে করেন, এই পুরস্কার একই সঙ্গে অনুবাদ, প্রাচীন সাহিত্য, কবিতা এবং সাহিত্যিক ও জ্ঞানশাস্ত্রের প্রচলিত সীমানা ভেঙে দেওয়ার জন্যও সুখবর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একজন অসাধারণ লেখক হতে হলে আগে থেকে তৈরি কোনো ছাঁচে নিজেকে ঢোকাতে হয় না। কারসনের নিজের লেখালেখিই তার প্রমাণ। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ঘরানার নিরাপদ পরিচয় গ্রহণ করেননি। কবিতা তার কাছে কবিতা, আবার একই সঙ্গে ইতিহাস, অনুবাদ, স্মৃতি, প্রেম, দর্শন কিংবা প্রাচীন গ্রিকের সঙ্গে বর্তমানের এক অদ্ভুত কথোপকথন।

ওশান ভুয়ং
কবি ওশান ভুয়ংয়ের প্রতিক্রিয়ায় রয়েছে আরও গভীর এক স্বস্তি। তার মতে, এমন অসাধারণ ক্ষমতা ও কঠোর বুদ্ধিবৃত্তিক নিষ্ঠার অধিকারী একজন লেখককে নোবেল কমিটি সম্মানিত করায় তিনি আশাবাদী হয়েছেন—বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন সাহিত্যিক সততা নানা দিক থেকে হুমকির মুখে।
ভুয়ংয়ের চোখে কারসনের কাজের কেন্দ্রে রয়েছে ‘অচেনা’ ও ‘রহস্য’। কয়েক দশক ধরে তিনি এই দুই জিনিসকে মানুষের সত্য আবিষ্কারের পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার লেখার রূপও কখনো স্থির নয়—এক বইয়ে যে নিয়ম, অন্য বইয়ে তা ভেঙে যায়। ফলে তার কাজ শুধু নিজের জন্য নতুন পথ তৈরি করেনি; পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদেরও নতুনভাবে ভাবার সম্মতি দিয়েছে। ভুয়ংয়ের কাছে কারসনের গুরুত্ব এখানেই। একজন বড় লেখক শুধু নিজের বই লেখেন না; তিনি অন্যদের লেখার সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেন। কারসন সেই কাজটি করেছেন। ভুয়ং বলেছেন, তার মতো একজন লেখকের উত্তরসূরি হয়ে লিখতে পারা নিজের সৌভাগ্য বলে মনে করেন।
রেবেকা পেরি
রেবেকা পেরির স্মৃতিতে কারসন আরও জীবন্ত। ২০১৩ সালে তিনি ও তার সময়ের প্রায় সব পরিচিত লেখক গিয়েছিলেন পোয়েট্রি সোসাইটির বার্ষিক বক্তৃতায় কারসনকে শুনতে। কারসন তাদের মুগ্ধ করেছিলেন—উদারতা, বুদ্ধিমত্তা ও তীক্ষ্ণতার পাশাপাশি তার উপস্থিতিতেও ছিল এক ধরনের দৃঢ়তা। কাউবয় বুট ও স্যুট পরা সেই নারী যেন নিজের চারপাশে সম্পূর্ণ মনোযোগ দাবি করছিলেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে এক ব্যক্তি দীর্ঘ, আত্মমগ্ন একটি প্রশ্ন করেছিলেন। কারসনের উত্তর ছিল মাত্র একটি শব্দ—‘না।’
এরপর সবাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছিল। হয়তো আরও ব্যাখ্যা আসবে। আসেনি।
পেরির কাছে এই ছোট্ট ঘটনাটিই কারসনের জাদুর একটি নিখুঁত উদাহরণ। তিনি একই সঙ্গে খেলাচ্ছলে থাকতে পারেন এবং সম্পূর্ণ গম্ভীরও হতে পারেন। যেখানে একটি শব্দ যথেষ্ট, সেখানে তিনি দশটি শব্দ খরচ করেন না।
পেরির নিজের লেখকজীবনে কারসনের বই প্রায় প্রয়োজনের মতো ফিরে এসেছে। ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ হাতে নিলে তিনি আবার কবিতার প্রেমে পড়েন। ‘ফ্লোট’-এর ছোট ছোট বইগুলো তাকে মনে করিয়ে দেয়—সাহিত্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অদ্ভুত হওয়ার সাহসও ভালো জিনিস। ‘দ্য গ্লাস এসে’ পড়াতে গিয়ে তিনি দেখেন, সাহিত্যিক ফর্মের সীমানা বলে আমরা যে ধারণাকে এত গুরুত্ব দিই, তা আসলে কতটা কৃত্রিম।
কারসন যেন তার লেখার মধ্য দিয়ে একটি সহজ কথা বলে গেছেন: সাহিত্যে ঝুঁকি নেওয়ার জায়গা থাকতে হবে। থাকতে হবে দৃষ্টির স্বাধীনতা। এমন লেখারও জায়গা থাকতে হবে, যা আপস করতে জানে না।
তার নোবেল তাই শুধু একজন কবির পুরস্কার নয়। এটি কবিতার জন্য, অনুবাদের জন্য, প্রাচীন সাহিত্যকে নতুন চোখে পড়ার জন্য এবং সাহিত্যকে কোনো নির্দিষ্ট ঘরে বন্দী না করার জন্যও এক ধরনের স্বীকৃতি।
কারসন নিজে হয়তো খুব বেশি শব্দে এই মুহূর্তকে ব্যাখ্যা করতেন না। তার লেখার মতোই হয়তো একটি শব্দই যথেষ্ট—‘আনন্দ।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









