ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে দেশটিকে ‘যন্ত্রণাদায়ক জবাব’ দেওয়া হবে বলে সোমবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুতি কর্মকর্তারা। বারবার হামলার মুখে থাকা সৌদি আরব গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওয়াশিংটনের সহায়তা চেয়েছে বলে খবর প্রকাশের পর এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হলো।
গত জুলাইয়ে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র হয়ে ওঠে। এখানে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। এর কয়েক মাস আগে শুরু হওয়া বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে গভীর সংকটে ফেলেছে।
হুতিরা দ্রুত সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, ট্যাংকার ও পরিবহনকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে। এর মধ্যে রিয়াদের বিমানবন্দরে ধারাবাহিক প্রাণঘাতী হামলাও রয়েছে। এসব হামলায় বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটি ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।
সানা থেকে এএফপি জানায়, সোমবার রাতে আবারও সৌদি রাজধানীর আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, তারা হুতিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে, হুতিরা আবারও বিমানবন্দরটিতে হামলা চালানোর দাবি করে।
পরে জোট জানায়, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে তারা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জোট জানায়, ‘সন্ত্রাসী হুতি মিলিশিয়াদের খামিস মুশাইত শহর লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে।’ শহরটিতে এর আগে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা হয়েছিল।
শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। এর আগে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে সহায়তা চাওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে খবর রয়েছে।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, ‘হুতিরা খুব খারাপ আচরণ করছে। তারা খুব খারাপ আচরণ করছে। এটা ভালো কিছু নয়।’
হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল বুখাইতি এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জড়ায়, তাহলে জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা কালক্ষেপণ করব না। বরং যুক্তরাষ্ট্র এবং এ অঞ্চলে তাদের সব স্বার্থকে লক্ষ্য করে দ্রুত ও যন্ত্রণাদায়ক জবাব দেওয়া হবে।’
তিনি সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত ‘সব কর্মকর্তা ও কর্মীকে এসব স্থাপনা থেকে দূরে থাকার’ সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘এগুলো এখন বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।’
শনিবার কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলাটি এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। এতে আরও কয়েক শ মানুষ আহত হন।
ট্রাম্প হামলাটিকে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা ‘বিবেচনা করা হবে’।
সোমবারও রিয়াদের উপকণ্ঠে বিস্তৃত বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
‘গুরুতর’ জবাবের ঘোষণা-
বুখাইতি বলেন, সৌদি আরবের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার উদ্দেশ্য যুবরাজকে এই বার্তা দেওয়া যে, ‘নিরাপদ অবস্থানে থেকে তিনি আর ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতে পারবেন না’।
সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী যুবরাজ আবদুল আজিজ বিন সালমান সোমবার রিয়াদে এক সম্মেলনে বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ‘আমাদের অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান, জনগণ ও সহনশীলতার পরীক্ষা নিয়েছে’।
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাবলি গুরুতর। আমাদের জবাবও সমানভাবে গুরুতর হতে হবে।’
সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রকাশিত শনিবারের হামলার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ধর্মীয় পোশাক পরা মুসলিম হজযাত্রীরা বিমানবন্দরের যাত্রী অপেক্ষাকক্ষে অপেক্ষা করছেন। হঠাৎ বিস্ফোরণে ভবনের ভেতর তাণ্ডব শুরু হয় এবং আগুনে জ্বলতে থাকা ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে।
সোমবারও রিয়াদে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল ইখবারিয়া জানায়, সামরিক জোট ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির জবাব দিচ্ছে।
সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে ‘শত্রুপক্ষের আকাশপথে হুমকি’ সম্পর্কে সতর্ক করে সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চ শব্দের অ্যালার্ট পাঠানো হয়। এর পরই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ঘোষণা আসে।
এই সতর্কবার্তার কারণে উজবেকিস্তানের নেফচি ফেরগানা ও সৌদি দল আল নাসরের মধ্যকার ফুটবল ম্যাচ শুরু হতে দেরি হয়। পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আল নাসরের হয়ে খেলেন।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রিয়াদে প্রথমবারের মতো মোবাইল ফোনে এ ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হলো। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাজধানী লক্ষ্য করে হামলার সময় কেন এ ধরনের বার্তা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
হুতিরা আরও দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে খামিস মুশাইত সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলাও চালিয়েছে।
বিমান চলাচল স্থগিত-
সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জানিয়েছে, দেশটিতে যেকোনো বিমানবন্দর ব্যবহারের আগে মার্কিন সরকারি কর্মীদের দূতাবাসের অনুমতি নিতে হবে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহার করতে চাইলে মার্কিন নাগরিকদের ‘চরম সতর্কতা’ অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে দূতাবাস।
দূতাবাস আরও জানায়, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাবলির ছবি তোলার কারণে মার্কিন নাগরিকদের আটক করা হয়েছে।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় বিমান সংস্থা ইতিহাদ এয়ারওয়েজ সোমবার ঘোষণা করেছে, আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত রিয়াদগামী ও রিয়াদ থেকে ছেড়ে যাওয়া সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে দাম্মাম ও জেদ্দাগামী ফ্লাইটও স্থগিত করা হয়েছে।
বাহরাইনের জাতীয় বিমান সংস্থা গালফ এয়ার জানিয়েছে, তারাও শনিবার পর্যন্ত রিয়াদের সব ফ্লাইট বাতিল করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান সংস্থা ডেল্টা জানিয়েছে, ২৩ অক্টোবর আটলান্টা থেকে রিয়াদে সরাসরি ফ্লাইট চালুর যে পরিকল্পনা ছিল, তা পিছিয়ে দেওয়া হবে।
সামরিক সরঞ্জামে বিপুল অর্থ ব্যয় করা সত্ত্বেও বিশাল আয়তনের মরুভূমিপ্রধান সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও পরিবহন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের হামলা সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেন, কিছু ক্ষেত্রে সফলতা থাকলেও ‘সৌদি আরব এত বড় দেশ যে, তাদের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা কার্যত অসম্ভব’।
২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব একটি আন্তর্জাতিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে, যারা ইয়েমেনের সরকারকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। এ সহায়তার মধ্যে ইয়েমেনের আকাশসীমা এবং হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানী সানার বিমানবন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও রয়েছে।
জুনো বলেন, হুতিরা এখন ‘সৌদি আরব তাদের সঙ্গে যা করে, সৌদি আরবের সঙ্গেও তা-ই করতে চায়’।
দীর্ঘদিন ধরে চলা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ দরিদ্র দেশটিতে গভীর মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক সৌদি আরবে ‘বারবার হামলার ঘটনায় গভীরভাবে ক্ষুব্ধ’ বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি উভয় পক্ষকে সংঘাত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘লড়াই অব্যাহত থাকলে কেবল আরও দুর্ভোগ বাড়বে, যার শেষ কোথায় তা দেখা যাচ্ছে না।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









