ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান রণক্ষেত্র। একদিকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা, অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনপুষ্ট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার। দুই পক্ষের লড়াইয়ে শহরটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাইজের দক্ষিণে এডেন শহরের সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান সড়কটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুতিরা। এতে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে তাইজ। শহর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন বহু মানুষ। একই সঙ্গে খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। চার বছরের যুদ্ধবিরতির অবসানের পর চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। সেই সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তাইজের নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
তাইজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
তাইজ শুধু ইয়েমেনের একটি বড় শহর নয়। এটি দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে হুতিবিরোধী শক্তির অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। শহরটির আনুমানিক জনসংখ্যা ছয় লাখ। ২০১৫ সালের শুরু থেকে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইয়েমেন সরকারের সংঘাতের সামনের সারিতে রয়েছে তাইজ। দীর্ঘদিন ধরে শহরটি হুতিদের বিরোধিতার প্রতীক হয়ে আছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও তাইজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরটি দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। এর একদিকে রয়েছে এডেন, যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অবস্থান। অন্যদিকে রয়েছে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চল। বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে এই প্রণালির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাইজের নিয়ন্ত্রণ হারালে বাব আল-মান্দেবের আশপাশে হুতিদের বিরুদ্ধে সরকারের সামরিক অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে এডেনের দিকে হুতিদের অগ্রসর হওয়ার পথও তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তাইজের পতন হলে সেটি শুধু সামরিক পরাজয় হবে না। সৌদি সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেন সরকার ও তার মিত্রদের জন্য এটি হবে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও প্রতীকী ধাক্কা।
তাইজের আশপাশে যুদ্ধের পরিস্থিতি কী?
বহু বছর ধরেই তাইজ কার্যত হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার মধ্যে সরকারের একটি বিচ্ছিন্ন অবস্থান ধরে রেখেছে। শহরটির উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমের বিস্তীর্ণ এলাকা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে শহর এবং আশপাশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সরকারের হাতে রয়েছে। শহরের দক্ষিণে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জাবাল সাবার পাহাড়। এই পাহাড়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে এডেনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়কটি। পাহাড়ি ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে যাওয়া প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর হুতিরা জাবাল সাবারের দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে সড়কটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। আল-তুরবাহ ও মুদিরিয়াত আল-মিসরাখ এলাকার কিছু অংশসহ সড়কের কয়েকটি জায়গা এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে অক্টোবরের শুরু থেকেই তাইজ অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। শহরের আশপাশে সরকারি বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণও করছে হুতিরা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার সহায়তায় সরকারি বাহিনী হুতিদের পিছু হটিয়ে সড়কটি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছে। কিন্তু অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পরিস্থিতি সরকারের অনুকূলে আসেনি। বরং তাইজের আশপাশে আরও কিছু এলাকা হারিয়েছে সরকারি বাহিনী।

কেন হুতিবিরোধী প্রতিরোধের কেন্দ্রে তাইজ?
তাইজের রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই উত্তর ইয়েমেনের শাসকদের সঙ্গে টানাপোড়েনে ভরা। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় শহরটি সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের শাসক আলি আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা হারান।
ধর্মীয় পরিচয়ের দিক থেকেও তাইজের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। হুতিরা শিয়া ইসলামের জায়দি মতাদর্শ অনুসরণ করে। অন্যদিকে তাইজের অধিকাংশ বাসিন্দা সুন্নি মুসলিম। তবে শহরটির হুতিবিরোধিতাকে শুধু ধর্মীয় পার্থক্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, ক্ষমতার লড়াই এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা। ২০১৪ সালে সালেহ ও হুতিরা জোট বেঁধে রাজধানী সানা দখল করে। এর মধ্য দিয়ে আরব বসন্তের পর শুরু হওয়া রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে। সে সময় ইয়েমেনে একটি ফেডারেল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছিল। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে সালেহের অনুগত সেনারা তাইজের বিভিন্ন অবস্থান দখল করলে শহরজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, সালেহ ও হুতিরা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে।
এরপর শুরু হয় ভয়াবহ সংঘর্ষ। স্থানীয় যোদ্ধা ও সরকারের পক্ষ নেওয়া সেনা ইউনিটের সঙ্গে হুতি এবং সালেহের অনুগত বাহিনীর লড়াই ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। দীর্ঘ অবরোধে তাইজের মানুষ গোলাবর্ষণ, স্নাইপারের গুলি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকটের মধ্যে দিন কাটান। পরে সরকারি বাহিনী শহর থেকে হুতি ও তাদের মিত্রদের হটিয়ে এডেনের সঙ্গে স্থলপথে যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। ২০১৫ সালজুড়ে এবং ২০১৬ সালের একাংশে শহরটিতে তীব্র লড়াই চলে। অবরোধের বিভিন্ন পর্যায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত গড়ায়। সেই ইতিহাসের কারণে তাইজ আজও হুতিবিরোধী প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। শহরটি দখল করা হুতিদের জন্য সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিজয়ও হবে।
অবরোধে মানবিক সংকট কতটা ভয়াবহ?
তাইজে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে তাইজ প্রদেশে অন্তত ১ লাখ ২১ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের অনেকে শহরের বাইরের গ্রামীণ এলাকা থেকে পালিয়ে গেছেন। ইয়েমেন সরকারের সূত্র বলছে, সর্বশেষ লড়াইয়ে শহর ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছেন। এডেনের সঙ্গে প্রধান সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাইজে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে।
জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কথা জানিয়েছে বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থা। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) অক্টোবরের মাঝামাঝি সতর্ক করে বলেছে, শহরে গমের আটার মজুত প্রায় শেষ হয়ে আসছে। খাদ্যসংকটের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ইয়েমেনে যেসব শিশুকে পরীক্ষা করা হয়েছে, তাদের প্রতি তিনজনে একজন অপুষ্টিতে ভুগছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কলেরা, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি। অবরোধ দীর্ঘ হলে এসব রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এরপর কী ঘটতে পারে?
তাইজের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে সরকারি বাহিনী সড়কটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারে কি না, তার ওপর। সৌদি বিমান হামলার সহায়তা নিয়ে তারা হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তবে সড়কটি আবার খুলে দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অন্যদিকে হুতিরা শুধু তাইজ অবরুদ্ধ রাখতেই চাইছে না; শহরের দিকে আরও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে তাদের হামলা বেড়েছে। একই সঙ্গে আগের তুলনায় তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সংগঠন আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে তাইজে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। আবার হুতিরা সরাসরি শহরটি দখলের অভিযানও শুরু করতে পারে। তবে তাইজের স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের হুতিবিরোধী অবস্থানের কারণে এমন অভিযান সহজ হবে না। শহর দখলের চেষ্টা হলে প্রতিরোধ তীব্র হতে পারে এবং তা দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
তাইজের লড়াই তাই কেবল একটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ নয়। এর ফল নির্ধারণ করতে পারে দক্ষিণ ইয়েমেনে সরকারের সামরিক অবস্থান, বাব আল-মান্দেবের আশপাশের কৌশলগত ভারসাম্য এবং দেশটির গৃহযুদ্ধের পরবর্তী গতিপথ। সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে সাধারণ মানুষকে, যাঁরা আবারও অবরোধ, বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকটের মধ্যে আটকে পড়েছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









