ইসলামি নীতিমালা মেনে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম শরিয়াহসম্মত তহবিলগুলোর একটি। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের মধ্যেই সেই তহবিল এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনেছে, যাদের সঙ্গে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ও প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থার যোগসূত্র রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এইচএসবিসির ইসলামি তহবিল এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনতে ব্যয় করেছে ১৩ কোটি ডলারেরও বেশি।
এখানে প্রশ্ন শুধু বিনিয়োগের নয়। প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় নৈতিকতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংগৃহীত অর্থ এমন প্রতিষ্ঠানের হাতে পৌঁছাতে পারে কি না, যাদের পণ্য ও প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক এইচএসবিসি পরিচালিত ইসলামিক গ্লোবাল ইকুইটি ইনডেক্স ফান্ডের সম্পদের পরিমাণ ৮০০ কোটি ডলারের বেশি। এই তহবিলের বিনিয়োগকারীদের অধিকাংশই মুসলমান বলে ধারণা করা হয়। ইসলামি আর্থিক নীতিমালা অনুসারে প্রতিষ্ঠান বাছাই করার কথা তহবিলটির। এইচএসবিসির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তাদের লক্ষ্য শুধু বিনিয়োগ থেকে মুনাফা অর্জন নয়; সমাজের জন্যও ইতিবাচক ফল তৈরি করা। অস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবা থেকে উল্লেখযোগ্য আয় করে, এমন প্রতিষ্ঠান বাদ দেওয়ার কথাও তাদের শরিয়াহ নীতিমালায় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই নীতির প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অস্ত্র ও যুদ্ধপ্রযুক্তির সঙ্গে যাদের যোগসূত্র
তহবিলটির বিনিয়োগের তালিকায় রয়েছে অন্তত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির টেকনোলজিসের শেয়ার কিনতে এইচএসবিসি ব্যয় করেছে ৩ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণা দেয়। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে প্যালান্টিরের সহযোগিতা বেড়েছে। প্রতিবেদনে যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়।
আরেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান আরটিএক্স-এর শেয়ার কিনতে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেথিয়ন ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করে। ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান রাফায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে তারা আয়রন ডোম প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষেপণাস্ত্রের উপাদান ও ইন্টারসেপ্টর তৈরি করে। ডেভিডস স্লিং নামের আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরিতেও তাদের অংশীদারত্ব রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা অ্যানালগ ডিভাইসেসের শেয়ার কিনতে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৩ লাখ ডলার। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ডিচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির একটি সহযোগী সংস্থা ২০২৪ সালে ফিলিপাইনের কারখানা থেকে ইসরায়েলের অস্ত্র প্রস্তুতকারক এলবিট সিস্টেমসের কাছে ইলেকট্রনিক উপাদান পাঠিয়েছিল।
হানিওয়েল ইন্টারন্যাশনাল-এর শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়েছে ১ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। প্রতিষ্ঠানটি সামরিক অস্ত্রে ব্যবহৃত সেন্সর ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়ক প্রযুক্তি তৈরি করে। আল জাজিরার আগের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুনে গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরের একটি জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলে ইসরায়েলি হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের একটি পরিমাপক যন্ত্র হানিওয়েলের তৈরি ছিল। ওই হামলায় প্রায় ৪০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন।
তালিকার পঞ্চম প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ রোলস-রয়েস হোল্ডিংস। এর শেয়ার কিনতে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। প্রতিষ্ঠানটি সামরিক বিমান ও সাঁজোয়া যানের ইঞ্জিন তৈরি করে। এর জার্মান সহযোগী প্রতিষ্ঠান এমটিইউ অ্যারো ইঞ্জিন ইসরায়েলি সামরিক যান, এমনকি মারকাভা ট্যাংকের জন্যও শক্তি উৎপাদনব্যবস্থা সরবরাহ করেছে।
শরিয়াহর সনদ, নৈতিকতার প্রশ্ন
এইচএসবিসি বলছে, তাদের তহবিলের বিনিয়োগ তদারক করেন দুই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি পণ্ডিতের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন শরিয়াহ কমিটি। তাদের দায়িত্ব হলো বিনিয়োগ ইসলামি নীতিমালা মেনে চলছে কি না, তা নিশ্চিত করা। কিন্তু ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সংজ্ঞা নির্ধারণে বিভিন্ন সূচক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোথাও প্রতিরক্ষা খাতের প্রতিষ্ঠান সরাসরি বাদ দেওয়া হয়, কোথাও আবার প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত প্রধান ব্যবসার ধরন বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও অর্থায়নবিষয়ক অধ্যাপক মুহাম্মদ ইব্রাহিমের মতে, এখানেই বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হতে পারে, যদিও তার তৈরি উপাদান শেষ পর্যন্ত অস্ত্রব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়। প্রচলিত যাচাইপদ্ধতি সাধারণত পণ্য কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে কিংবা সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে তা বেসামরিক মানুষের ক্ষতিতে ভূমিকা রাখছে কি না, তা খতিয়ে দেখে না।

সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ে শিক্ষক ওয়াহিউ জাতমিকোও এইচএসবিসির বিনিয়োগনীতি, স্বচ্ছতা ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের পরিচয় কেবল একটি লেবেল হতে পারে না; এর সঙ্গে নৈতিক দায়িত্বও জড়িত।
ইসলামি নীতিতে মানুষের জীবন রক্ষা ও ন্যায়বিচার গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কেবল প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার শ্রেণি কিংবা আর্থিক অনুপাত যাচাই করে সেই নৈতিক লক্ষ্য পূরণ করা যায় না। ইব্রাহিমের প্রস্তাব, অস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক চুক্তিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ যাচাই করতে হবে; পাশাপাশি পণ্যটির চূড়ান্ত ব্যবহার কোথায় হচ্ছে, সেটিও অনুসন্ধান করতে হবে।
এইচএসবিসির বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন; কোনো বিনিয়োগ কাগজে-কলমে শরিয়াহসম্মত হলেই কি তা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়? যে মুসলমানেরা হালাল পেনশন বা সঞ্চয় প্রকল্পে অর্থ রাখেন, তারা যুক্তিসংগতভাবেই আশা করতে পারেন, তাদের অর্থ এমন প্রতিষ্ঠানে যাবে না, যাদের বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষের ক্ষতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
নৈতিকতার দাবি যদি বিনিয়োগের বিজ্ঞাপনে থাকে, তবে সেই নৈতিকতার দায়ও বিনিয়োগকারীর অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বহন করতে হবে। শরিয়াহর সনদ আর নৈতিক দায়িত্ব এক বিষয় নয়। এইচএসবিসিকে ঘিরে বিতর্কটি ইসলামি অর্থব্যবস্থার সামনে সেই কঠিন প্রশ্নই তুলে ধরেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









